বাজেট ২০২৬-২৭
নিত্য পণ্যে কর ছাড়, অস্ত্র ও বিলাসী গাড়িতে বাড়তি কর
প্রকাশ : ১৫ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড়ের পরিকল্পনা করছে সরকার। চাল, ডাল, তেল, চিনি, আটা, ময়দা, পেঁয়াজ এবং বিভিন্ন মসলার মতো পণ্যে বিদ্যমান ১ শতাংশ উৎস কর বাতিল করা, নিত্যপণ্যের ওপর বিদ্যমান ১ শতাংশ টার্নওভার কর যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। অন্যদিকে আগ্নেয়াস্ত্র, বিশেষ করে পিস্তল, রিভলভার বা শটগান মালিকদের কাছ থেকে বাড়তি কর নেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার। সেজন্য আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স নবায়নে কর দ্বিগুণ করার প্রস্তাব দিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। পাশাপাশি বিলাসবহুল জীবনযাপনের ওপর বাড়তি কর চাপানোর পরিকল্পনা করেছে সরকার। যার মধ্যে রয়েছে বিলাসবহুল প্রাইভেটকার, জিপ এবং হেলিকপ্টার বা বিমানের ওপর বাড়তি আয়কর আরোপ ও পরিবেশবান্ধব হলেও বিলাসবহুল বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
এছাড়া প্রথমবারের মতো ব্যাটারিচালিত রিকশাকে করের আওতায় আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রস্তাবনার সূত্রে জানা যায়, ব্যাটারিচালিত রিকশাকে সিটি কর্পোরেশন এলাকায় বছরে ৫ হাজার টাকা এবং পৌরসভা এলাকায় ২ হাজার টাকা কর নির্ধারণ করা হতে পারে। যদিও ব্যাটারিচালিত রিকশার সংখ্যা ও বসানো কর আদায় করাই বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে বাজেট সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
এ বিষয়ে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন একজন কর্মকর্তা বলেন, আগামী বাজেটে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিয়ে যা যা করণীয় এনবিআর তা করছে। আমাদের লক্ষ্য উচ্চবিত্ত। যাদের আসলে সামর্থ রয়েছে। সে কারণে গাড়ি ও আগ্নেয়াস্ত্রের মতো পণ্যে বাড়তি নজর দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে সাধারণ মানুষকে স্বস্তি দিতে নিত্য প্রয়োজনীয় পণ্যে কর ছাড় অব্যাহত থাকবে। ব্যাটারিচালিত রিকশা যাতে একটি নীতিমালা ও সিস্টেমে আসে সে কারণে বাজেটে এমন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। রাস্তার আতঙ্ক এই বাহনকে নিয়মের মধ্যে সরকার আনতে চায়। কর আদায়ের মাধ্যমে এর যাত্রা শুরু হোক এটা চাই। সিটি কর্পোরেশ বা পৌরসভাকে বড় দায়িত্ব নিতে হবে।
এনবিআর সূত্রে জানা যায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ডলার সংকট, আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার অস্থিরতার কারণে দেশের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে চাপ অব্যাহত রয়েছে। এতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে সীমিত আয়ের মানুষ ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণি। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল, চিনি, পেঁয়াজ ও মসলার মতো দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বাড়তে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ভোক্তা পর্যায়ে কিছুটা স্বস্তি দিতে করনীতিতে পরিবর্তনের পথে হাঁটছে সরকার। নিত্যপণ্যের ওপর বিদ্যমান ১ শতাংশ উৎস কর প্রত্যাহার এবং ১ শতাংশ টার্নওভার কর কমিয়ে আনার প্রস্তাব করেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, আমদানি ও সরবরাহ পর্যায়ে করের চাপ কমানো গেলে ব্যবসায়ীদের ব্যয় কিছুটা হ্রাস পাবে, যার প্রভাব খুচরা বাজারেও পড়তে পারে। তবে শুধু কর কমালেই বাজারে তাৎক্ষণিক বড় প্রভাব নাও পড়তে পারে। কারণ নিত্যপণ্যের দামে করের পাশাপাশি পরিবহন ব্যয়, বাজার সিন্ডিকেট, মজুতদারি, আমদানি নির্ভরতা এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতার মতো বিষয়ও বড় ভূমিকা রাখে। সে কারণে কর ছাড়ের সুবিধা ভোক্তা পর্যায়ে পৌঁছাতে বাজার তদারকির ওপর জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। অন্যদিকে বর্তমানে ব্যক্তিগত পিস্তল, রিভলভার বা শটগানের লাইসেন্স নবায়নে কোনো অগ্রিম আয়কর দিতে হয় না। তবে আগামী বাজেটে অস্ত্রভেদে লাইসেন্স নবায়নে ৩০ হাজার থেকে ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অগ্রিম আয়কর বসানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। বর্তমান পিস্তল বা রিভলভারের জন্য ২০ হাজার এবং শটগান বা রাইফেলের জন্য ১০ হাজার টাকা ফি দিতে হয়। এছাড়া সব নবায়ন ফি’র সঙ্গে ১৫ শতাংশ ভ্যাট এবং ১০ শতাংশ উৎসে কর দিতে হয়। আর ব্যক্তিগত বা বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আমদানি করা রিভলভার, পিস্তল বা শটগানের ওপর সাধারণত ২৫ শতাংশ আমদানি শুল্ক রয়েছে। এছাড়া সম্পূরক শুল্ক এবং অগ্রিম আয়কর মিলিয়ে আমদানি করা অস্ত্রের দামের বড় একটি অংশ সরকারি কোষাগারে জমা দিতে হয়।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, দেশে মোট প্রায় ৫৩ হাজার ৭০২টি বৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স রয়েছে। এরমধ্যে-ব্যক্তি পর্যায়ে ৪৮ হাজার ২৮৩টি, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের নামে ৪ হাজার ৮৫৪টি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে ৫৬৫টি আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। যদি ৫০ হাজার লাইসেন্সধারী গড়ে ২০ হাজার টাকা করে নবায়ন ফি এবং ভ্যাট ও অগ্রিম আয়কর প্রদান করেন, তবে শুধুমাত্র নবায়ন থেকেই বছরে প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ কোটি টাকার বেশি রাজস্ব আদায় সম্ভব। এর বাইরে নতুন লাইসেন্স ফি এবং মালিকদের দেওয়া ব্যক্তিগত আয়কর যুক্ত করলে এই অংক আরও কয়েকগুণ বৃদ্ধি পাবে। ২০২৫ সালের নতুন নীতিমালা অনুযায়ী এই ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছিল। যেমন, ব্যক্তি পর্যায়ে পিস্তল ও রিভলভারের লাইসেন্স ইস্যু ফি ৩০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৬০ হাজার টাকা করা হয়েছে। নবায়ন ফি ১০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা করা হয়েছে। আর রাইফেল ও শটগানের লাইসেন্স ইস্যু ফি ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ হাজার টাকা করা হয়েছে। নবায়ন ফি ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকা করা হয়েছে।
অস্ত্র ব্যবসায়ী ও মেরামতকারীদের লাইসেন্স ফি ২০ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪০ হাজার টাকা করা হয়েছে।আগ্নেয়াস্ত্রের মালিকদের জন্য সরকার মোটা অংকের আয়কর দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রেখেছে, যা পরোক্ষভাবে বড় অংকের রাজস্ব নিশ্চিত করে।
যেমন, পিস্তল বা রিভলভারের আবেদনকারীকে বিগত ৩ বছর ধরে বার্ষিক ন্যূনতম ৫ লাখ টাকা আয়কর দেওয়ার প্রমাণ দেখাতে হয়। যা আগে ছিল ৩ লাখ টাকা। আর শটগানের আবেদনকারীকে বার্ষিক ন্যূনতম ২ লাখ টাকা আয়কর দিতে হয়। যা আগে ছিল ১ লাখ টাকা। অন্যদিকে বিলাসবহুল প্রাইভেটকার, জিপ এবং হেলিকপ্টার বা বিমানের ওপর বাড়তি আয়কর আরোপ ও বিলাসবহুল বৈদ্যুতিক গাড়ির ওপর অগ্রিম আয়কর বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে মধ্যবিত্তদের জন্য গাড়ির দাম ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখার জন্য সিসি অনুসারে কর আগের মতোই রাখার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
