চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে লাখো কর্মসংস্থানের আশা

প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

চট্টগ্রামে কর্ণফুলী নদীর দক্ষিণ পাড়ে শিল্পায়নের যে স্বপ্ন দীর্ঘদিন ধরে লালিত হয়ে আসছিল, এবার তা বাস্তবে রূপ নিতে যাচ্ছে। প্রতীক্ষিত ‘বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক অঞ্চল (চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন)’-এর উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে আনোয়ারায় সূচিত হলো সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এক লাখেরও বেশি মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

গতকাল সোমবার প্রকল্পটির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে দেশের অন্যতম বৃহৎ বিদেশি বিনিয়োগভিত্তিক শিল্পাঞ্চল বাস্তবায়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হবে। এর মাধ্যমে এক দশকের বেশি সময় স্থবির হয়ে থাকা চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনের (সিইআইজেড) নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হলো।

২০১৪ সালে এ প্রকল্প নিয়ে সমঝোতা স্মারক সই করে বাংলাদেশ ও চীন। জমি অধিগ্রহণ সম্পন্ন হয় ২০১৬ সালে। তবে ডেভেলপার নিয়োগ, অর্থায়ন চূড়ান্তকরণ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রকল্পটির কাজ শুরু হয়নি। গত ২২ থেকে ২৬ জুন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের পর প্রকল্পটিতে নতুন গতি আসে। সফরে দুই দেশের মধ্যে বিনিয়োগ-সংক্রান্ত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সই হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ২৫ জুন বেজা ও চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনের (সিআরবিসি) মধ্যে অর্থনৈতিক অঞ্চলটির ডেভেলপার চুক্তি হয়।

এর আগে গত ১৬ জুন জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটির অনুমোদন দেওয়া হয়। কর্ণফুলী নদীর মোহনায় আনোয়ারার বেলচূড়া এলাকায় প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠবে এ অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চল।

কর্ণফুলী টানেল, চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর এবং শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ভৌগোলিক নৈকট্যের কারণে আনোয়ারা এখন দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম কৌশলগত শিল্প হাব হওয়ার পথে। প্রকল্পটি শুধু একটি শিল্পাঞ্চল নয়, এটি এ অঞ্চলের কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং জীবনযাত্রার মান বদলে দেওয়ার চাবিকাঠি।

বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) জানিয়েছে, আনোয়ারা উপজেলার কর্ণফুলী নদীর পূর্ব তীরে প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থাপনায় এ অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলা হচ্ছে। প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি অধিগ্রহণ এরই মধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

কর্ণফুলী টানেল থেকে মাত্র চার কিলোমিটার দূরে অবস্থিত প্রকল্পটির অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং চীনের এক্সিম ব্যাংকের প্রেফারেন্সিয়াল বায়ার্স ক্রেডিট (পিবিসি) ঋণ থেকে আসবে ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা। প্রকল্পটির বাস্তবায়নকাল নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ২০৩১ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত।

এ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত হবে এক হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি লিংক সড়ক, এক হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ প্রধান সড়ক, ২০ হাজার ৩০৪ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার পানি সংরক্ষণাগার, ৪.২৪ এমএমসিএফডি ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস ট্রান্সমিশন লাইন ও ডিস্ট্রিক্ট রেগুলেটিং স্টেশন, ২৫ এমএলডি ক্ষমতাসম্পন্ন সেন্ট্রাল ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি), ২০ হাজার ডেডওয়েট টন ধারণক্ষমতার বহুমুখী জেটি, দৈনিক ৬০ টন সক্ষমতার সলিড ওয়েস্ট কালেকশন স্টেশন, প্রায় ১২ কিলোমিটার বাউন্ডারি ওয়াল এবং দুটি ৩৩/১১ কেভি সাবস্টেশন।

বেজার তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে এক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং প্রায় ৫০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক প্রত্যক্ষ বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে। এর মাধ্যমে চট্টগ্রাম অঞ্চলে কেমিক্যাল, অটোমোবাইল অ্যাসেম্বলি, গার্মেন্টস, ওষুধসহ বিভিন্ন উৎপাদনমুখী আধুনিক শিল্প ও লজিস্টিক হাব গড়ে উঠবে, যা দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে সরকার প্রত্যাশা করছে।

সোমবার দুপুরে আনোয়ারার বেলচূড়া এলাকায় এ উন্নয়নকাজের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, নির্মাণাধীন চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোনে (সিইআইজেড) শেষ পর্যন্ত ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিনিয়োগ হবে বলে করা হচ্ছে। তিনি বলেন, এ প্রকল্প শুধু আনোয়ারা নয়, পুরো চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে এবং শিল্পায়নের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত করার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে, আজকের এ বিনিয়োগ সেই লক্ষ্য অর্জনের পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

তিনি বলেন, আমরা ১ কোটি কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য নিয়েছি। এ অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১ লাখেরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। বর্তমানে ৫০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের কথা বলা হলেও অবকাঠামোসহ সব বিনিয়োগ মিলিয়ে শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলে ১ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ হবে।

তিনি আরও বলেন, পুরো চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। এখানে গড়ে উঠবে শক্তিশালী সাপ্লাই চেইন, বিভিন্ন সেবাখাত। কর্মীদের জন্য আবাসনের ব্যবস্থাও থাকবে।

আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মাধ্যমে শুধু শিল্পকারখানাই নয়, আবাসন, পরিবহন, লজিস্টিকস, সেবাখাত এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্যও নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে দক্ষিণ চট্টগ্রামের সামগ্রিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নতুন গতি আসবে।

পুঁজিবাজারকে সম্পূর্ণরূপে পুনর্গঠন করা হচ্ছে জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, আমি চাই চীনা বিনিয়োগকারীরা বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হোক।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, ভূমি ও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ কর্পোরেশনের (সিআরবিসি) প্রেসিডেন্ট, বেজা’র নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন, সিইআইজেডের চেয়ারম্যান ওয়াং বেনচিয়ান, সংসদ সদস্য সরওয়ার জামাল নিজাম, চিটাগাং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক।