রপ্তানি আয়ের পাঁচ ভাগের এক ভাগ আনে বিদেশি ব্যাংকগুলো
প্রকাশ : ১০ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
বাণিজ্য ডেস্ক

দেশের পণ্য রপ্তানির প্রায় ১৯ শতাংশ সম্পন্ন হচ্ছে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। ফলে রপ্তানি আয়ের সমপরিমাণ অর্থ আনছে এসব ব্যাংক। অন্যদিকে আমদানির ১৩ শতাংশ হচ্ছে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে। এদিকে দেশের ব্যাংকগুলোর আমানতের বড় অংশ উচ্চ সুদের এবং তা স্থায়ী আমানত। বিদেশি ব্যাংকগুলোর স্থায়ী আমানতের হার ১৬ শতাংশ, দেশের ব্যাংকগুলোতে এমন আমানতই ৪৮ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে ৯টি বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংক তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এ ব্যাংকগুলোর অধীন দেশে ৭০টি শাখা এবং ৫টি উপশাখা রয়েছে। তবে আমদানি-রপ্তানি ব্যবসার বেশির ভাগ সম্পন্ন করছে বহুজাতিক ব্যাংক এইচএসবিসি ও স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ। অন্য বিদেশি সাতটি ব্যাংক হলো সিটি ব্যাংক এনএ, কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন, উরি ব্যাংক, স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া, হাবিব ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান ও ব্যাংক আলফালাহ।
জানা গেছে, দেশে কার্যক্রম পরিচালনা করা বিদেশি ব্যাংকগুলো সবচেয়ে কম সুদে আমানত পায় আর ঋণের সুদহার অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো। এ ছাড়া আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায় দক্ষতা ও বিস্তৃত ট্রেজারি কার্যক্রমের কারণে এসব ব্যাংক উচ্চ মুনাফা করে থাকে। তবে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মধ্যে অর্ধেক ভালো আয় করছে।
বিদেশি ব্যাংকগুলো সবচেয়ে কম সুদে আমানত পায়। ঋণের সুদহার অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকের মতো। এ ছাড়া আমদানি-রপ্তানি ব্যবসায় দক্ষতা ও বিস্তৃত ট্রেজারি কার্যক্রমের কারণে এসব ব্যাংক উচ্চ মুনাফা করে থাকে।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর বিস্তৃত শাখা নেটওয়ার্ক ও ভোক্তা কার্যক্রম না থাকলেও আমানতে ভালো অবস্থানে আছে। যদিও বিদায়ী বছরে আমানত বেড়েছে অল্পই। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের পরিমাণ ছিল ৮৭ হাজার ৪৭৭ কোটি টাকা, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা কিছুটা বেড়ে ৮৭ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকায় পৌঁছেছে। তবে পুরো ব্যাংকিং খাতের তুলনায় তাদের আমানতের অংশ কমেছে । ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে আমানতের বাজারে বিদেশি ব্যাংকগুলোর অংশ ছিল ৪ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যা কমে ৪ দশমিক ২ শতাংশে নেমে এসেছে।
বিদেশি ব্যাংকগুলোর আমানতের ধরনে বড় বৈচিত্র্য রয়েছে। দেশের ব্যাংকগুলোর আমানতের বড় অংশ উচ্চ সুদের ও স্থায়ী আমানতের। বিদেশি ব্যাংকগুলোর স্থায়ী আমানতের হার ১৬ শতাংশ, দেশের ব্যাংকগুলোতে এমন আমানত ৪৮ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকগুলোর মোট আমানতের ৩৯ শতাংশ আসে চলতি ও সঞ্চয়ী হিসাব থেকে। দেশের ব্যাংকগুলোর এমন আমানতের হার ২৯ শতাংশ। যা তুলনামূলক কম সুদের আমানত।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে রেসিডেন্ট ফরেন কারেন্সি ডিপোজিট (আরএফসিডি) ছিল ১৭ শতাংশ, দেশের ব্যাংকগুলোর তা মাত্র ২ শতাংশ। বিদেশি ব্যাংকগুলো মূলত করপোরেট ও প্রাতিষ্ঠানিক গ্রাহকদের ওপর বেশি নির্ভর করে। ফলে তাদের আমানত সংগ্রহের খরচ তুলনামূলকভাবে কম থাকে।
এদিকে ২০২৫ সালে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের ক্ষেত্রে সংকোচন দেখা গেছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে মোট ঋণের পরিমাণ ছিল ৫১ হাজার ৯৭০ কোটি টাকা, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা ১১ দশমিক ৩ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ১২২ কোটি টাকায়। এর ফলে পুরো ব্যাংকিং খাতে তাদের ঋণের অংশ ৩ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ২ দশমিক ৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
শিল্প খাতে ২০২৪ সালে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণের পরিমাণ ছিল ২২ হাজার ৭৮০ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে বেড়ে হয়েছে ২৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকা। এসব ব্যাংক মূলত রপ্তানিমুখী উৎপাদনশীল শিল্পে ঋণ দিয়ে থাকে।
কৃষি ও মৎস্য খাতে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ঋণ বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে এই খাতে ঋণ ছিল ৭২৬ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ১ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা হয়েছে। ২০২৪ সালে ব্যবসা ও বাণিজ্য খাতে ঋণ ছিল ১৫ হাজার ৬৮৯ কোটি টাকার, যা ২০২৫ সালে কমে ৯ হাজার ১১০ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
এদিকে বিদেশি ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের হার কিছুটা বেড়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণের হার ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে তা বেড়ে ৫ দশমিক ৯ শতাংশে পৌঁছেছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর এত খেলাপি ঋণ মূলত ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তানের জন্য। কারণ, ব্যাংকটির ৯০ শতাংশের বেশি ঋণ খেলাপি।
দেশের রপ্তানি ও আমদানি বাণিজ্যে বিদেশি ব্যাংকগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাসে (জুলাই-ডিসেম্বর) এসব ব্যাংকের ৩৭৩ কোটি ডলারের রপ্তানি বিল সংগ্রহ করেছিল। ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে ৪১২ কোটি ডলার হয়েছে। দেশের রপ্তানি আয়ে তাদের অংশ এখন ১৮ দশমিক ৮ শতাংশ।
আমদানির ক্ষেত্রেও তাদের অংশগ্রহণ বেড়েছে। ২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে তারা ৩৮৭ কোটি ডলারের আমদানি বিল পরিশোধ করেছিল। ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে ৪২৯ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। বর্তমানে দেশের মোট আমদানির ১৩ দশমিক ১ শতাংশ এ ব্যাংকগুলোর মাধ্যমে হয়। তবে রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয়ের ক্ষেত্রে তাদের অবদান মাত্র দশমিক ৩ শতাংশ।
২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়ে বিদেশি ব্যাংকের নিট মুনাফা ছিল ৩ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা, ২০২৫ সালের একই সময়ে তা বেড়ে হয়েছে ৩ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকা। এদিকে মুনাফা বিদেশে পাঠানোর পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৪ সালের শেষ ছয় মাসে মুনাফা ও আয় হিসেবে বিদেশে পাঠানো হয়েছিল ৫৭৭ কোটি টাকা। ২০২৫ সালের একই সময়ে এই অঙ্ক বেড়ে ১ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। তবে ডলার-সংকটের কারণে আগে তুলনামূলক কম মুনাফা ও আয় পাঠাতে পেরেছে বিদেশি ব্যাংকগুলো। ২০২৫ সালে আগের মুনাফা ও আয় পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।
এদিকে দেশের অর্থনীতির মন্দাবস্থার প্রভাব পড়েছে দেশের বহুজাতিক ব্যাংকগুলোর ঋণে। সব ব্যাংকের মুনাফা কমে গেছে। স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড বাংলাদেশ ২০২৫ সালে নিট মুনাফা করেছে ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকা। ২০২৪ সালে মুনাফা করেছিল ৩ হাজার ৩০০ কোটি টাকায়। এদিকে এইচএসবিসির নিট মুনাফা ২৩ শতাংশ কমে গেছে। ২০২৫ সালে ব্যাংকটির নিট মুনাফার পরিমাণ ছিল ৮২৩ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে এ মুনাফা ছিল ১ হাজার ৮৬ কোটি টাকা।
কমার্শিয়াল ব্যাংক অব সিলন ২০২৫ সালে মুনাফা করে ৫৭৬ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে যা ছিল ৬০০ কোটি টাকা। সিটি ব্যাংকএনএ বাংলাদেশ কার্যক্রমের মুনাফা গত বছর কমে দাঁড়িয়েছে ৩২৮ কোটি টাকা, যা ২০২৪ সালে ছিল ৩৮৪ কোটি টাকা। স্টেট ব্যাংক অব ইন্ডিয়া ২০২৪ সালে ২৩০ কোটি টাকা মুনাফা করলেও গত বছর কমে হয় ২০৭ কোটি টাকা। হাবিব ব্যাংক ২০২৫ সালে মুনাফা করে ১৮ কোটি টাকা, ২০২৪ সালে যা ছিল ২৪ কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ মোস্তফা কে মুজেরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিশ্বাস ও সেবার মানের কারণে কম সুদ পেলেও মানুষ বিদেশি ব্যাংকে যাচ্ছে। বৈশ্বিক সেবাকে দ্রুত ধারণ করায় ভালো করপোরেটরা এসব ব্যাংকের গ্রাহক। এ ছাড়া ধনী ও উচ্চ শ্রেণির মানুষ এসব ব্যাংকের আস্থাভাজন গ্রাহক।
এর ফলে এসব ব্যাংক উচ্চ মুনাফা করছে। পাশাপাশি অন্য ব্যাংকের এসএমই ও ক্ষুদ্র খাতেও এসব ব্যাংক অর্থায়ন করে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে বিদেশি ব্যাংকগুলো এ দেশে ভালো করছে। তাদের থেকে দেশি ব্যাংকগুলো অনেক সেবা ও কালচারকে গ্রহণ করছে।
