পুরোনো বিতর্কিত মালিকদের ব্যাংকে ফেরার ধারা বাতিল

প্রকাশ : ১২ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  বাণিজ্য ডেস্ক

একীভূত হওয়া সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের পুরোনো ও বিতর্কিত পরিচালকদের ফেরার সুযোগ নতুন আইনে রেখেছিল বর্তমান সরকার। এ জন্য কিছুদিন আগে ব্যাংক রেজোল্যুশেন আইন সংসদের পাস করার সময় ১৮(ক) ধারা নামে নতুন ধারা যুক্ত করা হয়। তখন এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। গত সোমবার এ ধারা বাতিল করার সংশোধনী প্রস্তাব মন্ত্রিসভা বৈঠকে অনুমোদন দেওয়া হয়। বাতিলের কারণ হিসেবে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের পাঠানোর বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, শর্ত মেনে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আবেদন না করায় সরকার ধারাটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

১৮(ক) ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যাংক রেজোল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যাঁরা শেয়ারধারক ছিলেন, তারা চাইলে পরে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকেও এই সুযোগ দিতে পারবে।

জাতীয় সংসদে পাস হওয়ার পর এ নিয়ে তখন ব্যাপক সমালোচনা হয়। পরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বাজেট অধিবেশনে এই ধারা বাতিলের কথা জানিয়েছিলেন।

গত সোমবার আইনটির সংশোধনী সংক্রান্ত খসড়া অনুমোদন করেছে মন্ত্রিসভা। এখন চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য তা জাতীয় সংসদে উপস্থাপন করা হবে। সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভা বৈঠক হয়।

আর্থিক নানা অনিয়মের কারণে সংকটে পড়া পাঁচটি ইসলামি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক নামে একটি ব্যাংক করার উদ্যোগ নিয়েছিল বিগত অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারও সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত রেখেছে। ব্যাংক পাঁচটি হচ্ছে- এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের করা ব্যাংক রেজোল্যুশন (সংশোধন) আইনের আওতায় এই একীভূতকরণ কার্যক্রম চলছে।

গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নানা অনিয়মে দুর্বল হয়ে পড়ে ১০টির মতো ব্যাংক। এর মধ্য থেকে বেশি সমস্যাগ্রস্ত ৫টি ব্যাংককে একীভূত করতে গত বছরের ২৫ মে রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ জারি করে বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকার। বিএনপি সরকার গত ১০ এপ্রিল অন্তর্বর্তী সরকারের করা ব্যাংক রেজোল্যুশন অধ্যাদেশ আইনে পরিণত করে। আইনটি সংসদে পাসের আগে ১৮(ক) নামে একটি নতুন ধারা যুক্ত করা হয়। এই ধারায় বলা হয়, কোনো ব্যাংক রেজোল্যুশনের আওতায় যাওয়ার আগে যাঁরা শেয়ার ধারক ছিলেন, তারা চাইলে পরে আবার সেই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ ও দায় গ্রহণের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকে আবেদন করতে পারবেন। বাংলাদেশ ব্যাংক চাইলে অন্য কোনো উপযুক্ত ব্যক্তিকেও এই সুযোগ দিতে পারবে। অবশ্য এ জন্য আবেদনকারীকে সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বিভিন্ন শর্ত পূরণের অঙ্গীকার করতে হবে। তবে সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত ধারাটি বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয় সরকার।

মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের সোমবারের সভার পর এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সরকারের আর্থিক দায়ভার, গ্রাহকের স্বার্থ এবং ব্যাংকিং খাতের বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনায় আইনে নতুন ধারা ১৮(ক) সংযোজনপূর্বক বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হয় এবং উত্থাপিত আকারে ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬ পাস হয়। প্রচলিত রেজোল্যুশন টুলগুলোর পাশাপাশি একটি বাজারভিত্তিক বিকল্প ব্যবস্থা প্রচলন, রেজোল্যুশনের আওতাধীন ব্যাংককে সচল রেখে এর পুনর্গঠন, মূলধন-ঘাটতি ও তারল্য সংকট দূরীকরণ, আমানতকারী ও বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ সুরক্ষা এবং সরকারি আর্থিক সংশ্লেষ হ্রাসকরণের লক্ষ্যে ধারাটি সংযোজন করা হয়। ব্যাংক রেজোল্যুশন আইন, ২০২৬-এর ১৮(ক) ধারার সব শর্ত পরিপালনপূর্বক কোনো ব্যক্তি/প্রতিষ্ঠান আবেদন না করায় উক্ত ধারা বিলুপ্ত করে ‘ব্যাংক রেজোল্যুশন (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

জানতে চাইলে অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা সালেহউদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, আবেদন না পাওয়ায় ধারাটি বাতিল, সরকারের এমন জবাব সন্তোষজনক নয়। আমরা যে আইনটি তৈরি করেছিলাম, সেটিই যথাযথ ছিল। একীভূত করা ব্যাংকগুলো লুটপাট করেছেন সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের বিতর্কিত পরিচালকেরাই। তাদের ফেরত আনার সুযোগ দেওয়াটা কোনোভাবেই যথাযথ ও যৌক্তিক ছিল না। এসব ব্যাংকে কৌশলগত বিনিয়োগকারী আনতে হবে। সরকার এখন যে ব্যাখ্যা দিচ্ছে, তা সন্তোষজনক নয়।

সালেহউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, বৈশ্বিক নিরীক্ষকেরা এসব ব্যাংকের আর্থিক চিত্র বের করেছে। তাতে দেখা যায় এসব ব্যাংক একা চলতে পারবে না। এ জন্য একীভূত করার বিকল্প ছিল না।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের ভাইস চেয়ারম্যান ও ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের চেয়ারম্যান শরীফ জহির বলেন, ‘পুরোনো বিতর্কিত মালিকদের ফেরানো উদ্যোগটি কোনোভাবেই ভালো ছিল না। সেটা আমরা আগেই জানিয়েছিলাম। সাধারণ মানুষও ভালোভাবে নেয়নি।’ ধারাটি বাতিলের উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানান।

এদিকে যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করা হচ্ছে সেসব ব্যাংকের সম্মিলিত খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ১ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা, যা ব্যাংকগুলোর বিতরণ করা মোট ঋণের প্রায় ৭৯ শতাংশ। এসব ব্যাংকের মধ্যে সর্বোচ্চ খেলাপি ইউনিয়ন ব্যাংকের, ৯৮ শতাংশ। এ ছাড়া ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকের খেলাপির হার ৯৬, গ্লোবাল ইসলামীর ৯৫, সোশ্যাল ইসলামীর ৬২ ও এক্সিম ব্যাংকের ৪৮ শতাংশ। এই পাঁচ ব্যাংকের মধ্যে এক্সিম ব্যাংক ছিল নাসা গ্রুপ চেয়ারম্যান নজরুল ইসলাম মজুমদারের নিয়ন্ত্রণে। বাকি চারটি ব্যাংক ছিল এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণাধীন।