সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা আধুনিক করতে আসছে ই-জিপি ২.০
প্রকাশ : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নিজস্ব প্রতিবেদক

দেশের সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে আরও আধুনিক, প্রযুক্তিনির্ভর ও নাগরিকবান্ধব করতে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ২.০ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এজন্য একটি রোডম্যাপও তৈরি করা হয়েছে। একই সঙ্গে সরকারি ক্রয় আইন ও বিধিমালা সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটির (বিপিপিএ) প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আবু সাঈদ মো. কামরুজ্জামান এ তথ্য জানিয়েছেন। কামরুজ্জামান বলেন, ২০০১ সালে সংস্কার কার্যক্রম হিসেবে যাত্রা শুরু করা সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা এখন দেশের ডিজিটাল সুশাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ খাতে পরিণত হয়েছে। এ খাতে সংস্কার এখনো চলমান।
তিনি জানান, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার সংস্কার শুরু হয় ২০০৩ সালের সরকারি ক্রয় প্রবিধানের মাধ্যমে। পরে ২০০৬ সালে সরকারি ক্রয় আইন এবং ২০০৮ সালে সরকারি ক্রয় বিধিমালা প্রণয়ন করা হয়। সর্বশেষ ২০২৫ সালের সরকারি ক্রয় বিধিমালা এবং সরকারি ক্রয় আইন সংশোধনের মাধ্যমে এ প্রক্রিয়া আরো এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
২০২৩ সালে বাংলাদেশ পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিটকে (সিপিটিইউ) একটি স্বায়ত্তশাসিত নিয়ন্ত্রক সংস্থায় রূপান্তর করা হয়। এর ফলে সংস্থাটির দায়িত্ব ও কার্যপরিধিও বেড়েছে। বিপিপিএ প্রধান বলেন, সুষ্ঠু প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করা, নতুন উদ্যোক্তাদের উৎসাহিত করা এবং সরকারি ক্রয়ব্যবস্থাকে আরো আধুনিক করতে সরকার একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। এই কমিটি সরকারি ক্রয় আইন ও সরকারি ক্রয় বিধিমালা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় সংশোধনের সুপারিশ করবে। এসব সংস্কার বাস্তবায়নকে বিপিপিএ সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
সরকারি ক্রয়ের পরিধি গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানান কামরুজ্জামান। তার ভাষ্য, ২০০৩ সালে সরকারি ক্রয়ের বার্ষিক বাজার ছিল প্রায় ৩০০ কোটি মার্কিন ডলার। ২০১০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার কোটি ডলারে। বর্তমানে এর পরিমাণ প্রায় ৩ হাজার কোটি ডলারে পৌঁছেছে। তিনি বলেন, জাতীয় বাজেট ও বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আকার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সরকারি ক্রয়ের পরিমাণও বাড়বে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, উন্নত প্রযুক্তি এবং দক্ষ জনবল গড়ে তোলা প্রয়োজন।
এ লক্ষ্য সামনে রেখে বিপিপিএ সম্প্রতি তিনটি অংশীজন পরামর্শ কর্মশালার আয়োজন করেছে। এসব কর্মশালায় ই-জিপি ব্যবস্থার উন্নয়ন, বাধ্যতামূলক ই-জিপির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন এবং বিপিপিএ’র প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।
সরকারি প্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন সহযোগী, বেসরকারি খাত, শিক্ষাবিদ ও ক্রয় বিশেষজ্ঞদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এসব কর্মশালা থেকে গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ পাওয়া গেছে বলে জানান বিপিপিএ প্রধান। টেকসই ক্রয়ব্যবস্থা নিয়ে তিনি বলেন, সরকারি ক্রয়কে শুধু ব্যয় সাশ্রয়, দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। এটিকে দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত, সামাজিক ও অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টির একটি কার্যকর হাতিয়ার হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
তার মতে, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় টেকসই উন্নয়নের নীতি অন্তর্ভুক্ত করা, পরিবেশবান্ধব ও জলবায়ুসহনশীল ক্রয়ব্যবস্থার প্রসার, উদ্ভাবনকে উৎসাহিত করা, স্থানীয় শিল্পকে সহায়তা দেওয়া, ডিজিটাল ক্রয়ব্যবস্থা সম্প্রসারণ এবং পুরো প্রক্রিয়ায় অর্থের সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। এসডিজির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিপিপিএ সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাবে বলেও জানান তিনি।
সরকারি ক্রয়ব্যবস্থার ডিজিটাল রূপান্তরের অগ্রগতি তুলে ধরে কামরুজ্জামান বলেন, ২০১০ সালে একটি সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে গড়ে প্রায় ১০০ দিন লাগত। বর্তমানে তা কমে ৫৪ দিনে নেমে এসেছে। ই-জিপি চালুর আগে মূল দরপত্রের মেয়াদের মধ্যে মাত্র ১২ শতাংশ চুক্তি স্বাক্ষরিত হতো। বর্তমানে এ হার ৯৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে।
এ ছাড়া চুক্তি প্রদানসংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের হার ১৫ শতাংশ থেকে বেড়ে শতভাগে পৌঁছেছে। একইভাবে দরপত্র বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের হারও ২০ শতাংশ থেকে বেড়ে শতভাগে উন্নীত হয়েছে। বিপিপিএ প্রধান বলেন, এসব পরিবর্তনের ফলে সরকারি ক্রয়ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, দক্ষতা, জবাবদিহি ও প্রতিযোগিতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
