কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্য ৬০ হাজার কোটি টাকা

প্রকাশ : ১৮ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  নিজস্ব প্রতিবেদক

চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে কৃষি ও পল্লি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ৬০ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। গত অর্থবছরে এ খাতে ঋণ বিতরণের লক্ষ্য ছিল ৩৯ হাজার কোটি টাকা। সে হিসাবে এবার লক্ষ্যমাত্রা বেড়েছে ৫৩ দশমিক ৮৫ শতাংশ।

কৃষি উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ মানুষের আয় বাড়ানোর পাশাপাশি এ খাতে পর্যাপ্ত ঋণপ্রবাহ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে এক অনুষ্ঠানে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কৃষি ও পল্লি ঋণনীতি ও কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।

নতুন নীতিমালায় রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ও বিশেষায়িত ব্যাংকগুলোর জন্য ২০ হাজার ৪৯৫ কোটি টাকা এবং বেসরকারি ও বিদেশি বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য ৩৯ হাজার ৫০৫ কোটি টাকা ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে নতুন নীতিমালার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক, উপ-নির্বাহী পরিচালক ও পরিচালকসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তফসিলি ব্যাংকগুলোর প্রতিনিধিরাও অনুষ্ঠানে অংশ নেন।

কৃষি ঋণকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও কৃষকবান্ধব করতে নতুন নীতিমালায় বেশ কিছু উদ্যোগ যুক্ত করা হয়েছে। প্রকৃত কৃষক শনাক্ত করতে স্থানীয় কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, মৎস্য কর্মকর্তা ও প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তাদের নথি অথবা সরকার প্রদত্ত কৃষক কার্ডের তথ্য ব্যবহারের সুযোগ রাখা হয়েছে।

নীতিমালায় ফসল ও ফসলসংশ্লিষ্ট খাতে কৃষি ঋণের পাশাপাশি মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেও ঋণ দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে। একই সঙ্গে এসব ঋণের আওতায় কৃষক দলের সদস্যসংখ্যার সীমাও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে জামানত ছাড়াই সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঋণ দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে নারী ও প্রান্তিক কৃষকদের ঋণপ্রাপ্তি সহজ করতে ব্যক্তিগত, সামাজিক ও দলগত গ্যারান্টির মতো বিকল্প নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিবেচনার জন্য ব্যাংকগুলোকে পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

কৃষি ঋণগ্রহীতাদের পাসবই বা অনুরূপ নথি সংরক্ষণের বাধ্যবাধকতা শিথিল করা হয়েছে। চুক্তিভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থার আওতায় ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের পূর্বানুমোদন নেওয়ার প্রক্রিয়াও সহজ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কৃষি উন্নয়ন সাধারণ তহবিলের (বিবিএডিসিএফ) পরিচালনাগত নির্দেশিকাও সংশোধন করা হয়েছে। এর ফলে কৃষি অর্থায়নে আরও নমনীয়তা আসবে বলে মনে করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

নতুন নীতিমালায় ব্যক্তি বা দলগতভাবে মাছ চাষ ও প্রাণিসম্পদ খাতে যুক্ত কৃষক ও উদ্যোক্তাদের ঋণ দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি মধু উৎপাদন, মাশরুম চাষ, লবণসহিষ্ণু ফসল উৎপাদন এবং কৃষির নতুন ও সম্ভাবনাময় বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে সহায়তার জন্যও বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।

নীতিমালায় ১০ হাজার কোটি টাকা ও ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন কর্মসূচির বিধান অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ-সংক্রান্ত নীতিগত বিষয়গুলোও নীতিমালার সারসংক্ষেপে যুক্ত করা হয়েছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় কৃষিঋণগ্রহীতাদের জন্য বীমা সুবিধা চালুর বিষয়টিও নতুন নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। ব্যাংক ও গ্রাহকের সম্পর্ক এবং ঋণের শর্তের ভিত্তিতে এ সুবিধা দেওয়া হবে।

এ ছাড়া নিমপাতা, ছাই, মিশ্র শস্য, ধানের কুড়া, পাটকাঠি, গাছের পাতা, কলার খোসা ও ডিমের খোসার মতো উপকরণ দিয়ে উৎপাদিত জৈব সারের জন্য অর্থায়নের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে ফসল উৎপাদন, প্রয়োজনীয় নথিপত্র ও ঋণ পরিশোধের বিষয়েও নির্দেশনা যুক্ত করা হয়েছে।

মরিচ, বিভিন্ন ধরনের সবজি, কলা, পেঁপে, আম, লেবু, পেয়ারা ও লিচুর মতো ফসলের ক্ষেত্রে ঋণ বিতরণ, ফসল কাটার সময় নির্ধারণ এবং ফসল সংগ্রহের সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঋণ পরিশোধের সময়সীমা নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে।

অনুষ্ঠানে কৃষি ও পল্লি ঋণ কর্মসূচির তদারকি জোরদার এবং নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে ওয়েবভিত্তিক কৃষিঋণ ব্যবস্থাপনা তথ্যব্যবস্থা (এগ্রি-ক্রেডিট এমআইএস) সফটওয়্যারও আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গ্রামীণ এলাকার টেকসই উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং প্রান্তিক ও দরিদ্র মানুষের আয় বাড়ানোর সরকারি লক্ষ্য সামনে রেখে নতুন এ নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আশা, কৃষি ও পল্লি খাতে সময়মতো এবং পর্যাপ্ত ঋণ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে দেশের কৃষি উৎপাদন ও সরবরাহ বাড়বে, মূল্যস্ফীতির চাপ কমবে এবং টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত হবে।