প্রিন্ট সংস্করণ
০০:০০, ১১ আগস্ট, ২০২২
নবীজি (সা.)-এর সময়কার কথা। মুসলিম উম্মাহর চিরশত্রু ইহুদিদের তখনকার এক নেতা ছিল কাব ইবনে আশরাফ। জাতে ইহুদি না হলেও নিজের হীন কর্মগুণে কুখ্যাত এ লোকটি মদিনায় বসবাসরত বনু নজির নামক ইহুদি গোত্রের নেতা বনে যায়। প্রিয়নবী (সা.), ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি চরম ঘৃণা-বিদ্বেষ তার রক্ত-মাংসে মিশেছিল। ইহুদিদের সঙ্গে মহানবী (সা.)-এর কৌশলগত মিত্রতার চুক্তি থাকা সত্ত্বেও কুখ্যাত লোকটি মক্কার কাফেরদের সঙ্গে মিলে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করত। মুসলিম নারীদের নিয়ে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ কবিতা আবৃত্তি করত। বিশেষত প্রিয়নবী (সা.)-এর ব্যাপারে জঘন্যতম কটূক্তি ও তাকে গালিগালাজ করা তার অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল। তার নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে একবার রাসুল (সা.) বললেন, ‘কাব ইবনে আশরাফ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে কষ্ট দিয়েছে, তাকে শায়েস্তা করার জন্য কে প্রস্তুত আছে?’ বিশিষ্ট সাহাবি মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ইয়া রাসুলাল্লাহ! আপনি কি চান, আমি তাকে হত্যা করি?’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ।’
মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) বললেন, ‘তাহলে আমাকে আপনার ব্যাপারে (কৃত্রিমভাবে) বিরূপ কিছু বলার অনুমতি দিন।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘ঠিক আছে, বলো।’ এরপর মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) কাব বিন আশরাফের কাছে গিয়ে বললেন, ‘রাসুল (সা.) আমাদের কাছে সদকা চায় এবং সে আমাদের বহু কষ্টে নিপতিত করেছে। তাই (বাধ্য হয়ে) আমি আপনার কাছে কিছু ঋণের জন্য এসেছি।’ কাব বিন আশরাফ বলল, ‘আল্লাহর কসম! পরবর্তী সময়ে সে তোমাদেরকে আরও অতিষ্ঠ করে তুলবে।’ মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) বললেন, ‘আমরা তো এখন তাকে অনুসরণ করছি। পরিণতি কী দাঁড়ায়, তা না দেখে এখনই তার সঙ্গ ত্যাগ করা ভালো মনে করছি না। এখন আমি আপনার কাছে এক ওসাক (তৎকালীন আরবে প্রচলিত পরিমাপ বিশেষ) বা দুই ওসাক খাদ্য ধার চাই।’ কাব বিন আশরাফ বলল, ‘ধার তো পেয়ে যাবে, তবে কিছু বন্ধক রাখো।’ মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) বললেন, ‘বন্ধক হিসেবে কী চান?’ সে বলল, ‘তোমার স্ত্রীকে বন্ধক রাখো।’ মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) বললেন, ‘আপনি আরবের অন্যতম সুদর্শন পুরুষ, আপনার কাছে কী করে আমার স্ত্রীকে বন্ধক রাখব?’ সে বলল, ‘তাহলে তোমার পুত্র সন্তানদের বন্ধক রাখো।’ তিনি বললেন, ‘আমার পুত্র সন্তানদের আপনার কাছে বন্ধক রাখলে লোকেরা আজীবন বলাবলি করবে যে, মাত্র এক ওসাক বা দুই ওসাক খাদ্যের বিনিময়ে আমি সন্তানদের বন্ধক রেখেছি। এটা তো আমার জন্য অন্তত লজ্জাজনক হয়ে দাঁড়াবে। তবে আমি আপনার কাছে অস্ত্রশস্ত্র বন্ধক রাখতে পারি।’ সে বলল, ‘ঠিক আছে।’ অবশেষে তিনি (মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা) তাকে পুনরায় সাক্ষাৎ করার ওয়াদা করে চলে এলেন। এরপর এক রাতে মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) কাব বিন আশরাফের দুধভাই আবু নায়েলাকে সঙ্গে করে তার কাছে গেলেন। কাব তাদেরকে দুর্গের ভেতর ডেকে নিল। সে নিজে ওপরতলা থেকে নিচে নেমে আসার জন্য প্রস্তুত হলো। এ সময় তার স্ত্রী বলল, ‘এ অসময়ে তুমি কোথায় যাচ্ছ?’ সে বলল, ‘এই তো মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা এবং আমার ভাই আবু নায়েলা এসেছে, তাদের কাছে যাচ্ছি।’ তখন কাবের স্ত্রী বলল, ‘আমার তো মনে হয়, আমি এমন এক ডাক শুনছি, যা থেকে রক্ত ঝরে পড়ছে।’ কাব বিন আশরাফ বলল, ‘আরে, কী বলো! এ তো মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা এবং আমার দুধভাই আবু নায়েলা। তারা তো অপরিচিত কেউ নয়। তা ছাড়া সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিদের রাতের বেলা বর্শাবিদ্ধ করার জন্য ডাকলেও তাদের যাওয়া উচিত। মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) সঙ্গে আরও দুই-তিন সাহাবিকে নিয়ে গিয়েছিলেন। তারা হলেন আবু আবস ইবনে জাবর (রা.), হারিস ইবনে আওস (রা.) এবং আব্বদ ইবনে বিশর (রা.)। মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) তাদের বলেছিলেন, ‘যখন সে আসবে, তখন আমি কোনো বাহানায় তার মাথার চুল ধরে শুকতে থাকব। যখন তোমরা দেখবে, খুব শক্তভাবে আমি তার মাথা আঁকড়ে ধরেছি, তখনই তোমরা তরবারি দ্বারা তাকে আঘাত করবে।’ কাব চাদর জড়িয়ে নিচে নেমে এলো। তার শরীর থেকে সুঘ্রাণ বের হচ্ছিল। তখন মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) বললেন, ‘আজকের মতো এত চমৎকার সুগন্ধি আমি আর কখনও শুকিনি।’ কাব তখন সোৎসাহে বলে উঠল, ‘আমার কাছে আরবের সর্বাধিক সম্ভ্রান্ত, মর্যাদাসম্পন্ন এবং সুগন্ধী ব্যবহারকারী নারী আছে।’ মুহাম্মদ ইবনে মাসলামা (রা.) বললেন, ‘আমাকে আপনার মাথা শুকতে অনুমতি দেবেন কি?’ সে বলল, ‘হ্যাঁ, অবশ্যই।’ এরপর তিনি তার মাথা শুকলেন। তার সঙ্গীদেরও শুকালেন। তারপর তিনি পুনঃবার ঘ্রাণ নেওয়ার আবদার করলেন। কাব সম্মত হয়ে মাথা এগিয়ে দিল। এরপর তিনি তাকে কাবু করে ধরে সঙ্গীদের বললেন, ‘তোমরা তাকে হত্যা করো।’ তারা তার ঘাড়ে আঘাত করে তাকে হত্যা করে ফেলল। এরপর নবী (সা.)-এর কাছে এসে এ সংবাদ জানালেন। (বোখারি : ৪০৩৭, মুসলিম : ১৮০১)।