ঢাকা বুধবার, ২৭ মে ২০২৬, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মানবজাতির কর্ণধার

আল্লাহর কুদরতের অনন্য নিদর্শন আদম (আ.)। আল্লাহতায়ালা তাকে দিয়েছেন আশরাফুল মাখলুকাতের মর্যাদা। ফেরেশতাদের সেজদার নির্দেশ দিয়ে জিন ও ফেরেশতাদের ওপর তাকে করেছেন শ্রেষ্ঠ। আদম (আ.)-এর সৃষ্টির নানা দিক নিয়ে লিখেছেন মুহাম্মদ আনিসুর রহমান রিজভি
মানবজাতির কর্ণধার

আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করার জন্য ফেরেশতাদের মাধ্যমে পৃথিবী থেকে মাটি নিয়ে আসা হলো। এরপর আদেশ করা হলো, সে মাটিকে (বর্তমান) খানায়ে কাবায় রাখা হোক। ফেরেশতাদের আদেশ দেওয়া হলো, যেন বিভিন্ন পানি দ্বারা সেই মাটিকে খামির করা হয়। ফলে সেই মাটির ওপর চল্লিশ দিন পর্যন্ত বৃষ্টি হতে লাগল। ঊনচল্লিশ দিন পর্যন্ত দুঃখ-চিন্তার বারিপাত হলো, আর মাত্র একদিন আনন্দের বারিপাত হলো। এ কারণেই মানুষের জীবনে সুখের চেয়ে দুঃখ-কষ্ট বেশি। এরপর ওই খামিরকে বিভিন্ন ধরনের বাতাস দ্বারা ভালোভাবে শুকানো হলো। অতঃপর ফেরেশতাদের আদেশ দেওয়া হলো, যেন পরিশোধিত মাটিকে মক্কা এবং তায়েফের মধ্যবর্তী ওয়াদিয়ে নোমানে আরাফাতের পাহাড়ের কাছে রাখা হয়। তারপর আল্লাহ নিজ কুদরতি হাতে সেই মাটি থেকে আদম (আ.)-এর শরীর তৈরি করে আকৃতি প্রদান করলেন। অতঃপর রুহকে আদেশ দেওয়া হলো; যেন সেই শরীরে প্রবিষ্ট হয়ে যায়। রুহ শরীরে প্রবেশ করতে চাইলে দেখল, ভেতরে অন্ধকার এবং সংকীর্ণ। ফলে রুহ ভেতরে প্রবেশ করা থেকে বিরত রইল। তখন নুরে মুহাম্মদ (সা.) দ্বারা সেই শরীর আলোকিত করা হলো। অর্থাৎ নুরে মুহাম্মদি (সা.)-কে আদম (আ.)-এর কপালে আমানত রাখা হলো। তখন রুহ ধীরে ধীরে ভেতরে প্রবেশ করতে লাগল। (তাফসিরে নাইমি : ১/২৫৩)।

হাওয়া (আ.)-এর সৃষ্টি

আদম (আ.)-কে বর্তমান কাবা শরিফের অবস্থানস্থলে জুমার দিন সৃষ্টি করা হয়। এরপর তিনি পৃথিবীতে একাকী চলাফেরা করতেন। পৃথিবীর প্রত্যেক প্রাণীকে ভিন্ন জাতি দেখে ভয় পেয়ে যেতেন। প্রার্থনা করলেন, যদি স্বজাতি থাকত, তবে তাদের সঙ্গে সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব হতো। পরবর্তী জুমার দিন তিনি ঘুমাচ্ছিলেন। এ সময় ফেরেশতারা তার বাম পাঁজর কেটে তা থেকে মুহূর্তের মধ্যে অত্যন্ত সুশ্রী নারী হাওয়া (আ.)-কে সৃষ্টি করলেন। তারপর তার কাটাস্থান জোড়া লাগিয়ে দেওয়া হলো। তিনি জাগ্রত হয়ে হাওয়া (আ.)-কে বসা অবস্থায় দেখে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কে?’ অদৃশ থেকে উত্তর এলো, ‘আমার বান্দি। তোমার ভয় দূর করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে।’ আদম (আ.) তার দিকে হাত বাড়াতে চাইলেন। হুকুম হলো, ‘হে আদম! আগে তার মোহর আদায় করো, তারপর হাত লাগাবে।’ আদম (আ.) আরজ করলেন, ‘হে আমার রব! এর মোহর কী?’ বলা হলো, ‘আমার শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ওপর দশবার দুরুদ শরিফ পাঠ করো।’ এভাবে ফেরেশতাদের সাক্ষ্যের মাধ্যমে আদম (আ.) এর সঙ্গে হাওয়া (আ.)-এর বিয়ে সম্পন্ন হলো। (তাফসিরে নাইমি : ২৭৭)।

জান্নাত থেকে অবতরণ

আল্লাহর নির্দেশে আদম (আ.)-কে সেজদা না করে শয়তান চিরস্থায়ী অভিশপ্ত ও জাহান্নামি হলো। আদম (আ.) ও বনি আদমের প্রতি তার ক্ষোভ, হিংসা ও শত্রুতা সৃষ্টি হলো। ফলে শয়তান আদম (আ.) ও বনি আদমকে বিপদগ্রস্ত করার সুযোগ সন্ধানে লিপ্ত থাকল। শয়তান সুকৌশলে প্রথমে হাওয়া (আ.)-কে নিষিদ্ধ বৃক্ষের ফল খাওয়াল। তারপর আদম (আ.)-কে খাওয়াল। ফলে তাদের শরীর থেকে জান্নাতি পোশাক খসে পড়ল। তারা বিবস্ত্র হয়ে গেলেন। লজ্জিত হয়ে ইঞ্জিন বৃক্ষের পাতা দিয়ে শরীর আবৃত করলেন। আওয়াজ এলো, ‘হে আদম ও হাওয়া! আমি কি তোমাদের এ বৃক্ষ থেকে নিষেধ করিনি? তোমাদের বলিনি, শয়তান তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু? তার প্রতারণায় প্রতারিত হয়ো না।’ তখন তারা অক্ষমতা প্রকাশ করলেন। লজ্জিত হলেন। ফেরেশতাদের প্রতি আদেশ করা হলো, যেন তাদেরকে পৃথিবীতে অবতীর্ণ করা হয়। সুতরাং আদম (আ.)-কে ভারতের চরণদ্বীপ শহরের লুদ নামক পর্বতে, আর হাওয়া (আ.)-কে আরব সাগরের তীর জেদ্দায় অবতীর্ণ করা হলো। (কাসাসুল আম্বিয়া : ৭৭)।

আজরাইল (আ.)-কে মৃত্যুদূতের দায়িত্ব

জিবরাইল (আ.), মিকাইল (আ.), ইসরাফিল (আ.) পৃথিবী থেকে মানব সৃষ্টির জন্য মাটি আনতে অক্ষম হলেন। আল্লাহতায়ালা আজরাইল (আ.)-কে মাটি আনতে পাঠালেন। তিনি আল্লাহর আদেশ পালনে মাটির কোনো কথা না শুনেই মাটি নিয়ে গেলেন। অর্থাৎ তিনি মাটি নিয়ে যেতে সক্ষম হলেন। আল্লাহতায়ালা আজরাইল (আ.)-এর বুদ্ধিমত্তা, যোগ্যতা এবং কঠিন হৃদয় দেখে বললেন, ‘হে আজরাইল! আজ তুমি মানবজাতির সৃষ্টিলগ্নে যেভাবে নিজের যোগ্যতা ও সক্ষমতার প্রমাণ দিলে, প্রাণিকুলের ধ্বংস তথা মৃত্যুর কাজেও তুমি একইভাবে নিজের যোগ্যতা ও সক্ষমতার প্রমাণ দিতে পারবে নিশ্চয়ই। সুতরাং আমি এখনই সে কাজটি তোমার জন্য নির্ধারণ করে দিলাম। সব প্রাণীর প্রাণ তুমিই কবজ করবে।’ (কাসাসুল আম্বিয়া : ২০-২১)।

মাটি থেকে ফোয়ারা

আল্লাহতায়ালা যখন আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করতে চাইলেন, তখন মাটিকে বললেন, ‘আমি তোমার থেকে এমন এক মাখলুক সৃষ্টি করব, যাদের মধ্যে যারা আমার অনুগত হবে, তাদের আমি জান্নাতে প্রবেশ করাব। আর যারা আমার অবাধ্য হবে, আমি তাদের জাহান্নামে নিক্ষেপ করব।’ তখন মাটি আরজ করল, ‘হে আল্লাহ! আমার থেকে সৃষ্ট মাখলুক জাহান্নামে যাবে?’ আল্লাহতায়ালা বললেন, ‘হ্যাঁ’। এ কথা শুনে মাটি এত বেশি কাঁদল যে, তার কান্নায় মাটিতেই নদী-নালা তথা পানির ফোয়ারা সৃষ্টি হলো, যা কেয়ামত পর্যন্ত প্রবাহিত হতে থাকবে। (সাবি আলাল জালালাইন : ১/৪)।

বিভিন্ন জায়গার মাটি দিয়ে আদম (আ.)-এর দেহ তৈরি

নবীজি (সা.) বলেন, আল্লাহতায়ালা আদম (আ.)-কে সমগ্র পৃথিবীর মাটি থেকে সংগৃহীত মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। আদম (আ.)-এর সন্তানরা মাটির গুণাবলি অনুযায়ী সৃষ্ট। কেউ কঠোর প্রকৃতির, কেউ শান্ত প্রকৃতির, কেউ মধ্যমপন্থি স্বভাবের। আবার কেউ শুভ্র, কেউ লাল এবং কেউ কালো বর্ণের। আবার কেউ এগুলোর মধ্যবর্তী বর্ণের সৃষ্ট। কেউ মন্দ, কেউ সৎ, আবার কেউ উভয় দোষ-গুণে সৃষ্ট। রাসুল (সা.) বলেন, আল্লাহতায়ালা আদি মানব আদম (আ.)-কে দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গার মাটি দ্বারা সৃষ্টি করেছেন। কাবা ঘরের মাটি দ্বারা মাথা, পাক-ভারতের মাটি দ্বারা পেট ও পৃষ্ঠদেশ, দুনিয়ার পূর্বে সীমান্তের মাটি দ্বারা দুই হাত এবং পশ্চিম সীমান্তের মাটি দ্বারা দুই পা সৃষ্টি করা হয়েছে। অন্য হাদিসে বর্ণিত আছে যে, তার মাথা মক্কা শরিফের মাটি দ্বারা, ঘাড় বাইতুল মুকাদ্দাসের মাটি দ্বারা, পেট ও পিট আদনের মাটি দ্বারা, হস্তদ্বয় পাক-ভারতের মাটি দ্বারা, পাদ্বয় দুনিয়ার পূর্ব সীমান্তের মাটি দ্বারা এবং অস্থি, চর্ম ও মাংস পশ্চিম সীমান্তের মাটি দ্বারা সৃষ্টি করা হয়েছে। এভাবে হজরত আদম (আ.)-এর দেহ তৈরি করে তা বেহেশতের একপাশে চল্লিশ বছর পর্যন্ত সংরক্ষিত ছিল। (মাওলানা তাহের সুরাটী, কাসাসুল আম্বিয়া, পৃষ্ঠা-২১)

আদম (আ.)-এর তওবা

ইবনে মনযর (রহ.) এর বর্ণনায় দোয়াটি এভাবে বর্ণিত আছে- হে প্রভু! আপনার বিশেষ প্রিয় বান্দা মুহাম্মদ (সা.)-এর যে সম্মান ও মর‌্যাদা আপনার কাছে রয়েছে, এর উসিলায় আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি। তখন আল্লাহর পক্ষ থেকে আওয়াজ এলো, হে আদম! তুমি ওই মহান ব্যক্তিকে কীভাবে চিনলে? আদম (আ.) সব ঘটনা বর্ণনা করলে আল্লাহতায়ালা বললেন, হে আদম! ওই মাহবুব বান্দা সর্বশেষ নবী এবং তোমার সন্তান। যদি তিনি না হতেন তবে তোমাকেও সৃষ্টি করতাম না। আদম (আ.)-এর তাওবা কবুলের দিনটি ছিল মহররমের দশ তারিখ আশুরা ও জুমার দিন। তিনি তওবার কালেমা পাওয়াতে খুশিতে উৎপল্ল হলেন। অজু করে বাইতুল্লাহর সম্মুখে দাঁড়িয়ে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন। অতঃপর ওই কালেমা দ্বারা দোয়া করলেন। তিনি জান্নাত থেকে অবতরণের সময় তার শরীর মোবারকের রং কালো হয়ে গিয়েছিল। তাওবা কবুল হওয়ার পর আদেশ হলো চাঁদের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখার। অতএব তিনি এই তিন দিন রোজা রাখলে প্রতিদিন এক-তৃতীয়াংশ করে শুভ্র হতে লাগলেন। এভাবে আগের মতো তার পুরো শরীর শুভ্র হয়ে গেল।

আলোকিত বাংলাদেশ
আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত