নবীজির ক্ষমা
আবদুল্লাহ হাসান কাসেমি
প্রকাশ : ১৭ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

রাসুল (সা.) ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের মূর্ত প্রতীক। মানবীয় সব গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছিল তার চরিত্রে। তার মতো অনন্য, অসাধারণ সর্বব্যাপী চরিত্রের দৃষ্টান্ত মানবতার সুদীর্ঘ ইতিহাসে মেলা ভার। তবে তার জীবনে ও জীবনাচারে যে গুণটি সবচেয়ে বেশি মূর্ত, সমুজ্জ্বল ও বিস্তারিতরূপে আমাদের সামনে এসেছে, তা হচ্ছে ক্ষমা ও সহনশীলতা। আল্লাহতায়ালা তাকে এ গুণটির প্রকাশ ঘটানোর নির্দেশ দিয়েছেন। এরশাদ হচ্ছে, ‘আপনি তাদের ক্ষমা করুন এবং তাদের সঙ্গে ক্ষমাসুন্দর আচরণ করুন।’ (সুরা মায়িদা : ১৩)। আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘আপনি ক্ষমার আচরণ গ্রহণ করুন, ভালো কাজের আদেশ করুন এবং মূর্খদের এড়িয়ে চলুন।’ (সুরা আরাফ : ১৯৯)।
জাদুকরকে কিছু বললেন না
লাবিদ বিন আসাম নামক এক ইহুদি রাসুল (সা.)-এর ওপর জাদু করেছিল। এতে নবীজি (সা.) অসুস্থ হয়ে পড়েন। এ অবস্থায় কেটে যায় কয়েক দিন। এরপর জিবরাইল (আ.) এসে জানালেন, কে, কোথায়, কীভাবে জাদু করেছে? অসুস্থতার রহস্য উদ্ঘাটন হওয়ার পর নবীজি (সা.) লোক পাঠালেন। নির্দেশ মোতাবেক জাদুসামগ্রী তুলে আনা হলো। ফলে রাসুল (সা.) সুস্থতা বোধ করলেন; যেন বন্ধনমুক্ত হয়ে উঠলেন। কিন্তু তিনি এরপর কখনও ওই ইহুদির কথা বলেননি এবং তার চেহারাও দেখেননি। (সুনানে নাসাঈ : ৪০৮০)।
আমার সামনে এসো না
ওহিশ নামক এক গোলামের অপরাধ ছিল অমার্জনীয়। সে উহুদ যুদ্ধে হামজা (রা.)-কে বর্শার নির্মম আঘাতে শহীদ করেছিল। তাই রাসুল (সা.) মক্কা বিজয়ের দিন তাকে হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। রাসুল (সা.)-এর নির্দেশ পালনে প্রত্যেক মুসলমান ছিলেন যার পর না-ই আগ্রহী। তাই ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে ওহিশ তায়েফে পালিয়ে যায়। সেখানেই অবস্থান করতে থাকে। পরে তায়েফের প্রতিনিধি দলের সঙ্গে মদিনায় রাসুল (সা.)-এর কাছে আসে। উচ্চ স্বরে বলে, ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, আল্লাহ ছাড়া কোনো মাবুদ নেই, আর মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বান্দা ও রাসুল।’ নবীজি (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, তুমি কি ওহিশ?’ সে বলল, ‘জি।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘ঠিক আছে, বসো। আমাকে বলো, কীভাবে হামজাকে হত্যা করেছিলে?’ সে আদ্যোপান্ত ঘটনা শোনাল। হত্যাকারীর মুখে হামজা (রা.)-এর হত্যার মর্মান্তিক ঘটনা শুনলেন, তারপরও তাকে উদার চিত্তে ক্ষমা করে দিলেন। আর বললেন, ‘তুমি আমার সামনে এসো না।’ নবীজি (সা.)-এর এ নির্দেশও ছিল ওহিশের কল্যাণে। কারণ, নবীজি (সা.)-এর অসীম বদান্যতায় যদিও সে ইসলাম গ্রহণ করেছে, তারপরও সামনে এলে হয়তো তিনি কষ্ট পাবেন। আর এতে তার অকল্যাণ হতে পারে। (তাবাকাতে ইবনে সাদ : ২১৫)।
ক্ষমাসহ মুক্ত করে দিলেন
বদর যুদ্ধের পর উমায়ের ইবনে ওয়াহহাব ও সফওয়ান ইবনে উমাইয়া এ ব্যাপারে চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল যে, উমায়ের নবীজি (সা.)-এর শির- েদ করে আসবে। এতে উমায়ের মারা পড়লে সফওয়ান উমায়েরের যাবতীয় ঋণ পরিশোধ করার এবং পরিবারের দেখাশোনার দায়িত্বভার গ্রহণ করবে। সিদ্ধান্ত মোতাবেক উমায়ের তলোয়ার নিয়ে মদিনার পথে যাত্রা করে। মদিনায় পৌঁছে মসজিদের দুয়ারে গিয়ে নামে। ওমর (রা.) দেখামাত্র তাকে শক্তভাবে ধরে নবীজি (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হন। নবীজি (সা.) ওমর (রা.)-কে বললেন, ‘তাকে ছাড়ো।’ উমায়ের (রা.)-কে বললেন, ‘কাছে এসো।’ এরপর জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার এখানে আসার উদ্দেশ্য কী?’ উমায়ের উত্তর দিল, ‘আমার পুত্র আপনাদের হাতে বন্দি, তাকে মুক্ত করার উদ্দেশেই আমার এখানে আসা। সুতরাং অনুগ্রহপূর্বক তাকে মুক্তি দান করুন।’ নবীজি (সা.) প্রশ্ন করলেন, ‘আচ্ছা, তাহলে গর্দানে তলোয়ার লটকানো কেন?’ সে বলল, ‘তলোয়ার সব নিপাত যাক! তা কি আমাদের কোনো কাজে এসেছে?’ এক পর্যায়ে নবীজি (সা.) বললেন, ‘তোমার সব কথা অসত্য। তোমার আসল মতলব আমাকে হত্যা করা। কিন্তু আল্লাহ তা হতে দেবেন না।’ এ কথা শোনামাত্র উমায়ের বুঝতে পারল, আল্লাহতায়ালাই তাকে এসব জানিয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে উমায়ের ইসলাম গ্রহণ করে নিল। নবীজি (সা.) তাকে কোনো শাস্তি দিলেন না। এমনকি সামান্য ভর্ৎসনাও করলেন না। বরং সানন্দে তার ইসলাম গ্রহণকে স্বাগত জানালেন। আর তার বন্দি পুত্রকে মুক্ত করে দিলেন। (সিরাতে ইবনে হিশাম : ৫/৪৯৬-৪৯৭)।
চার মাস অবকাশ দেওয়া হলো
উমায়েরের ইসলাম গ্রহণে সাফওয়ান নিরাশ হয়ে পড়ল। শপথ করে বসল, কখনও সে উমায়েরের সঙ্গে কথা বলবে না। এভাবেই চলতে থাকল। অবশেষে অষ্টম হিজরিতে যখন মক্কা বিজয় হলো, তখন জীবন-মৃত্যুর প্রশ্নে মক্কা ছেড়ে পালিয়ে গেল সাফওয়ান। উমায়েরের আবেদনে নবীজি (সা.) তাকে নিরাপত্তা দিলেন। ফলে সে ফিরে এলো। নবীজি (সা.)-কে জিজ্ঞেস করল, ‘আপনি নাকি আমাকে নিরাপত্তা দান করেছেন?’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘হ্যাঁ; উমায়ের অসত্য বলেনি।’ সাফওয়ান বলল, ‘তাহলে চিন্তাভাবনার জন্য আমাকে আরও মাস দুই সুযোগ দিন।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘চার মাস সময় দেওয়া হলো।’ কিন্তু চার মাস অপেক্ষা করা লাগল না। এর আগেই নববি চরিত্রের স্নিগ্ধ পরশে তার চিন্তার জট খুলে গেল। ফলে সে স্বতঃস্ফূর্ত চিত্তে মুসলমান হয়ে গেল। (আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ৬/৫৮৬-৫৮৭)।
আরও ২০ সা বাড়িয়ে দাও
যায়েদ ইবনে সাওনা থেকে ৮০ স্বর্ণমুদ্রা নিয়ে নবীজি (সা.) এক বেদুইনকে তার গোত্রের মাঝে বণ্টন করে দেওয়ার জন্য দিয়েছিলেন। পাওনা পরিশোধের দু’তিন দিন আগে লোকটি এসে অত্যন্ত রৌদ্রমূর্তি ধারণ করে নবীজি (সা.)-এর জামা ও চাদর ধরে নির্মমভাবে টানতে থাকল। আর রুক্ষ স্বরে বলতে লাগল, ‘মুহাম্মদ! কী ব্যাপার, আমার পাওনা আদায় করছ না যে? আসলে আবদুল মুত্তালিব বংশের লোকগুলোই বুঝি এমন! ঋণ পরিশোধে দীর্ঘসূত্রতাই তাদের ধর্ম! টালবাহানা করাই তাদের চরিত্র!’ লোকটার এ আচরণ দেখে ওমর (রা.) বললেন, ‘হে আল্লাহর দুশমন! আল্লাহর রাসুলকে তুমি এসব কী বলছ? তার সঙ্গে এ কেমন নিষ্ঠুর আচরণ করছ? সেই সত্তার শপথ! যিনি মুহাম্মদকে সত্যসহ প্রেরণ করেছেন, যদি আল্লাহর শাস্তির ভয় না থাকত, তাহলে এখনই তোমার গর্দান উড়িয়ে দিতাম।’ নবীজি (সা.) সংযম ও নীরবতার সঙ্গে সবকিছু দেখছিলেন। ওমর (রা.)-এর কথা শেষ হলে মুখে স্নিগ্ধ হাসির রেখা ফুটিয়ে বললেন, ‘ওমর! এমনটা দরকার ছিল না। আমাকে উত্তমরূপে দেনা পরিশোধের কথা বলতে, আর তাকে উত্তমরূপে পাওনা তলব করার কথা বলতে। এটাই ইনসাফের দাবি। যাও, তার পাওনা পরিশোধ করে দাও এবং তার সঙ্গে বাড়িয়ে দাও আরও ২০ সা খেজুর।’ (মুসতাদরাকে হাকিম : ৩/৭০০)।
ক্ষমা নয়, চাদরও উপহার দিলেন
কাব বিন জুহায়ের নবীজি (সা.)-এর বিরুদ্ধে অশালীন কিছু নিন্দনীয় কবিতা তৈরি করেছিল। এ জঘন্য অপরাধের শাস্তিস্বরূপ তার খুন হালাল করে দেওয়া হয়েছিল; যেখানেই পাওয়া যাবে, তাকে হত্যা করা হবে। তায়েফ থেকে ফেরার পর তার ভাই তার কাছে পত্র লিখল, ‘দেখ, মক্কার যেসব কবি রাসুল (সা.)-কে নিয়ে নিন্দা-কবিতা গেয়ে কষ্ট দিয়েছে, তাদের তলোয়ারের লোকমা বানানো হয়েছে। জীবনের প্রতি সামান্যতমও যদি মায়া থাকে, তাহলে আল্লাহর নবীর শরণাপন্ন হও, নইলে পরিণতি হবে অশুভ।’ ভাইয়ের কথা শুনে সুযোগের অপেক্ষায় থেকে একদিন অতি সঙ্গোপনে কাব নবীজি (সা.)-এর খেদমতে হাজির হলো। উৎপন্নমতিত্বের সঙ্গে আবেগ-উদ্বেলিত কণ্ঠে কবিতা আবৃত্তি করতে থাকল। প্রিয়নবী (সা.) অত্যন্ত খুশি হলেন। আগের সব অপরাধ ক্ষমা করে কাছে টেনে নিলেন। এমনকি নিজের চাদর পর্যন্ত উপহারস্বরূপ খুলে দিলেন। (যাদুল মাআদ : ৩/৪০০-৪০৪)।
এবার কে বাঁচাবে আমার হাত থেকে?
গাজওয়ায়ে যাতুর রিকা থেকে ফেরার পথে নবীজি (সা.) সাহাবায়ে কেরামকে নিয়ে এক স্থানে যাত্রাবিরতি দেন। সাহাবায়ে কেরাম বিভিন্ন গাছের ছায়ায় শুয়ে পড়েন। নবীজি (সা.)-ও একটি গাছের নিচে শুয়ে পড়েন। এরই মধ্যে সুযোগসন্ধানী এক শত্রু নবীজি (সা.)-কে নিঃসঙ্গ দেখে এগিয়ে এলো। গাছের ডাল থেকে ঝুলন্ত তলোয়ার হাতে নিল। এরপর নবীজি (সা.)-কে সম্বোধন করে বলল, ‘বলো মুহাম্মদ! কে রক্ষা করবে তোমাকে আমার হাত থেকে?’ নবীজি (সা.) নির্ভীক কণ্ঠে বললেন, ‘আল্লাহ।’ প্রিয় নবী (সা.)-এর পবিত্র জবানে মহিমাময় এ নামটি শুনতে দেরি, শত্রুটির মনে যার পর না-ই ভয় ঢুকে গেল। তার গোটা শরীরে ভীতি কম্পন সৃষ্টি হলো। কাঁপতে কাঁপতে তার হাতের তলোয়ারটি মাটিতে পড়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে তলোয়ারটি তুলে নবীজি (সা.) জিজ্ঞেস করলেন, ‘বলো, এবার কে বাঁচাবে তোমাকে আমার হাত থেকে?’ শত্রুটি একেবার লাজবাব। কী উত্তর দেবে? তাই সে কোনো রকম ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় বলল, ‘সর্বোত্তম আচরণ করুন আমার সঙ্গে।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘তুমি কি এ কথার সাক্ষ্য দাও, আল্লাহ একমাত্র উপাস্য, আর আমি তাঁর রাসুল?’ সে উত্তর দিল, ‘না। তবে আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আপনার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরব না এবং যারা আপনার বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করবে, তাদেরও সঙ্গ দেব না।’ নবীজি (সা.) চাইলে মুহূর্তেই তার গর্দান উড়িয়ে দিতে পারতেন; কিন্তু তিনি লোকটিকে ক্ষমা করে দিলেন। (বোখারি : ৪১৮৯)।
