নবীজির সাহসিকতার গল্প

মিযান বিন রমজান

প্রকাশ : ২৪ নভেম্বর ২০২২, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বীরত্ব ও সাহসিকতায় নবীজি (সা.)-এর অবস্থান অবিদিত নয়। তাঁর তেজস্বিতা, অসীম সাহস ও শৌর্য-বীর্য সর্বজনবিদিত। কখনও কখনও এমন কঠিন পরিস্থিতি সামাল দিয়েছেন, যখন শত বীর-বাহাদুরও পালিয়ে যায়; কিন্তু তিনি ছিলেন অটল অবিচল। কঠিন থেকে কঠিনতর বিপদের মুখোমুখি হয়েও পিঠ দেখাননি কখনও। ইসলামের শুরু সময়ে গোটা মক্কাবাসী এমনকি নিজের রক্তের আত্মীয়স্বজনও তাঁর বিরোধিতা করেছিল। তখনও তিনি এককভাবে ইসলাম প্রচারে ব্রত ছিলেন। এমন কোনো বীর-বাহাদুর নেই, যার পলানোর দুয়েকটি ঘটনা নেই; কিন্তু রাব্বুল আলামিন নবীজি (সা.)-কে হেফাজত করেছেন। (আশ শিফা লিল কাজি ইয়াজ : ১/১৪৮)।

নবীজির মাধ্যমে আত্মরক্ষার চেষ্টা

আলী (রা.) বলেন, ‘যখন যুদ্ধক্ষেত্র প্রচণ্ড আকার ধারণ করত, একদল আরেক দলের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত, তখন আমরা নবীজি (সা.)-এর মাধ্যমে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতাম। কারণ, তিনি শত্রুর সবচেয়ে কাছে অবস্থান করতেন।’ (মুসনাদে আহমদ : ১/১৫৬)। আলী (রা.) আরও বলেন, ‘বদরের দিন নবীজি (সা.) শত্রুর খুব কাছে চলে যেতেন। আমরা পেছন থেকে তার মাধ্যমে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতাম। সেদিন তার চেয়ে বীর যোদ্ধা আর কেউ ছিল না।’ (মুসনাদে আহমদ : ১/৮৬)। আনাস (রা.) বলেন, ‘নবীজি (সা.) মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুন্দর, সবচেয়ে বেশি দানশীল এবং সবার চেয়ে বড় বাহাদুর ছিলেন।’ (বোখারি : ৩০৪০, মুসলিম : ২৩০৭)। বারা ইবনে আজেব (রা.) বলেন, ‘যখন যুদ্ধ প্রচণ্ড আকার ধারণ করত, তখন আমরা নবীজি (সা.)-এর মাধ্যমে আত্মরক্ষার চেষ্টা করতাম। আমাদের বীরযোদ্ধা অর্থাৎ নবীজি (সা.) যুদ্ধের মুখোমুখি হতেন।’ (মুসলিম : ১৭৭৬)।

বীরবিক্রমে কাফেরদের মোকাবিলা

যুদ্ধক্ষেত্রে নবীজি (সা.)-এর বীরত্ব বর্ণনার জন্য হুনাইনের যুদ্ধের ঘটনাটি আরও বেশি উল্লেখযোগ্য। সালমা বিন আকওয়া (রা.) বলেন, হুনাইনের দিন প্রথম অবস্থায় প্রবল আক্রমণের মুখে যখন অনেক সাহাবি যুদ্ধের ময়দান থেকে পিছু হটছেন, তখন আমিও পরাজিত হয়ে ফিরে যাচ্ছিলাম। আমার দুটি কাপড় ছিল। একটি নিচে পরেছি, অপরটি গায়ে জড়ানো। এ সময়ে নিচের কাপড় ঢিল হয়ে গেলে উভয় কাপড় এক হাতে ধরে আতঙ্কিত অবস্থায় নবীজি (সা.)-এর পাশ দিয়ে ছুটেছিলাম। নবীজি (সা.) আমাকে দেখে বললেন, ‘ইবনুল আকওয়া! ভয় পেয়েছ?’ যখন তারা নবীজি (সা.)-কে ঘিরে ফেলল, তিনি তার খচ্চর থেকে নামলেন।’ (মুসলিম : ১৭৭৭)। আব্বাস (রা.) হুনাইন যুদ্ধের আরেকটি দৃশ্যপট তুলে ধরে বলেন, ‘কাফের এবং মুসলমানরা পরস্পরের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। এক সময় মুসলমানরা পিছু হটছিলেন। নবীজি (সা.) তখন কাফেরদের দিকে তার খচ্চর হাঁকাচ্ছিলেন। আমি তার খচ্চরের লাগাম টেনে ধরেছিলাম।’ (মুসলিম : ১৭৭৫)।

হুনাইনের যুদ্ধে সাহসী উচ্চারণ

এক ব্যক্তি বারা ইবনে আজেব (রা.)-কে জিজ্ঞেস করেন, ‘হে আবু উমারা! হুনাইনের যুদ্ধের দিন আপনারা পালিয়েছিলেন?’ তিনি বললেন, না। আল্লাহর কসম! নবীজি (সা.) পলায়ন করেননি। সেদিন নবীজি (সা.)-কে আমি দেখলাম, তার সাদা খচ্চরের ওপর বসে আছেন। আর আবু সুফিয়ান ইবনে হারেস খচ্চরের লাগাম ধরে আছেন। নবীজি (সা.) তখন বলছিলেন, ‘আমি নবী; মিথ্যাবাদী নই। আমি আবদুল মুত্তালিবের সন্তান।’ (বোখারি : ২৮৬৪, মুসলিম : ১৭৭৬)। সেদিন যুদ্ধ পরিস্থিতি কতটা সঙ্গীণ ছিল, তা ইবনে আকওয়ার বর্ণনায় স্পষ্ট। পরিস্থিতির তীব্রতায় তিনি পরিধেয় কাপড় হাতে নিয়ে ছুটছিলেন। অথচ নবীজি (সা.) সেদিন মাটিতে নেমে যুদ্ধ করেননি। কখনও শত্রুদের দিকে দ্রুত অগ্রসর হচ্ছিলেন। তিনি দ্রুত এগিয়ে যাবেন এ ভয়ে আব্বাস (রা.) তার খচ্চরের লাগাম টেনে ধরছিলেন। পরিস্থিতি এত ভয়াবহ থাকার পরও নবীজি (সা.) বিন্দুমাত্র বিচলিত হননি। তখন তিনি আওয়াজ তুলে বলছিলেন, ‘আমি নবী; মিথ্যাবাদী নই।’

যাপিত জীবনে সাহসিকতা

যুদ্ধ ছাড়া যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় নবীজি (সা.)-এর অতুলনীয় সাহসিকতার প্রমাণ পাওয়া যায় বিভিন্ন হাদিসে। আনাস (রা.) বলেন, এক রাতে কোথাও থেকে একটা ভয়ংকর আওয়াজ এলো। এতে সবাই ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। এমন সময় নবীজি (সা.) আবু তালহা (রা.)-এর ঘোড়া নিয়ে জোরে আওয়াজ তুলে বললেন, ‘তোমরা ভয় পেয়ো না, তোমরা ভয় পেয়ো না।’ নবীজি (সা.)-এর গলায় একটা তরবারি ঝুলানো ছিল। অথচ তখন সবাই ভয়ে কাঁপছিল, আর নবীজি (সা.) একা বেরিয়ে সবকিছু পর্যবেক্ষণ করেন। (বোখারি : ৩০৪০, মুসলিম : ২৩০৭)।

কাপুরুষতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা

সাহসিকতা ও বীরত্ব মোমিনের স্বভাবজাত ভূষণ। মোমিন আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করে না। সত্যবচনে মোমিন কখনও পিছপা হয় না। মোমিন সর্বদা ন্যায়ের পক্ষে থাকবে, ন্যায়ের কথা বলবে, এটাই ইসলামের শিক্ষা। নবীজি (সা.) তার সাহাবিদের এ শিক্ষাই দিয়েছেন। ওবাদা ইবনে সামেত (রা.) সূত্রে বর্ণিত; নবীজি (সা.) বলেন, ‘যেখানেই থাক না কেন, সত্যের ওপর দৃঢ় থাকবে।’ কিংবা বলেছেন, ‘সত্য কথা বলবে এবং আল্লাহর কাজে কোনো নিন্দুকের নিন্দার ভয় করবে না।’ (বোখারি : ৭২০০)। কৃপণতা, ভীরুতা, কাপুরুষতা নবীজি (সা.) কখনও পছন্দ করতেন না। এগুলো ঈমানকে ত্রুটিযুক্ত করে। মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। ভীরু, কাপুরুষ ও কৃপণ মানসিকতা দ্বারা সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়, জমিনে আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত দেওয়াও সম্ভব নয়। এ কারণে নবীজি (সা.) সর্বদা এ ত্রুটিগুলো থেকে মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাইতেন। নবীজি (সা.) পাঁচটি জিনিস থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করার নির্দেশ দিতেন। তিনি নিজে এগুলো থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাইতেন। তিনি বলতেন, ‘হে আল্লাহ! আমি কৃপণতা থেকে আপনার আশ্রয় চাইছি। আমি কাপুরুষতা থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি অবহেলিত বার্ধক্যে উপনীত হওয়া থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি। আমি দুনিয়ার ফেতনা অর্থাৎ দাজ্জালের ফেতনা থেকেও আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি এবং আমি কবরের শাস্তি থেকে আপনার আশ্রয় প্রার্থনা করছি।’ (বোখারি : ৬৩৬৫)।

শক্তিবান হওয়ার প্রেরণা

নবীজি (সা.) বলেন, ‘শক্তিবান মোমিন ব্যক্তি দুর্বল মোমিনের তুলনায় উত্তম এবং আল্লাহর কাছে অধিক প্রিয়। অবশ্য উভয়ের মধ্যে কল্যাণ আছে। তোমাদের জন্য উপকারী প্রতিটি উত্তম কাজের প্রতি আগ্রহী হও এবং অলস বা গাফেল হয়ো না। কোনো কাজ তোমাকে পরাভূত করলে তুমি বলো, আল্লাহ নির্ধারণ করেছেন এবং নিজ মর্জিমাফিক করে রেখেছেন। ‘যদি’ শব্দ সম্পর্কে সাবধান থাক। কেননা, ‘যদি’ শয়তানের কর্মের পথ উন্মুক্ত করে।’ (সুনানে ইবনে মাজাহ : ৪১৬৮)।

সাহসিকতার প্রতিদান জান্নাত

বদর যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল মদিনা থেকে বেশ দূরে বদর প্রান্তরে। বদর যুদ্ধ এত দূরে সংঘটিত হওয়ার পরও নবীজি (সা.) মুসলমান শিশু-কিশোরদের যুদ্ধ দেখার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত থাকার অনুমতি দিয়েছিলেন। সেখানে উপস্থিত শিশুদের মাঝে একজন ছিলেন হারেস ইবনে সোরাকা (রা.)। তিনি লক্ষ্যচ্যুত একটি তীরের আঘাতে শাহাদতবরণ করেন। সন্তানের মৃত্যুর সংবাদে তার মা নবীজি (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে বলেন, ‘হে আল্লাহর নবী! আমার ছেলে হারিসের শেষ ঠিকানা কোথায়? যদি তার ঠিকানা জান্নাত হয়, তাহলে আমি সবর করব। আর যদি অন্য কোথাও হয়, তাহলে আমি কেঁদে কেঁদে শেষ হয়ে যাব।’ নবীজি (সা.) বললেন, ‘শোন হারেসের মা! জান্নাতের অনেক স্তর রয়েছে। তোমার ছেলে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর ফেরদৌসে আছে।’ (বোখারি : ২৮০৯)।