ঢাকা ২০ জুলাই ২০২৪, ৫ শ্রাবণ ১৪৩১ | বেটা ভার্সন

যেমন ছিলেন প্রিয় নবীজি (সা.)

মুফতি ইবরাহীম আল খলীল
যেমন ছিলেন প্রিয় নবীজি (সা.)

আমাদের নবীজি হজরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শুধু শেষ নবী এবং সর্বোত্তম ব্যক্তিত্বই নন। বরং তিনি সারা বিশ্বের সব মানুষের জন্য সর্বকালের আদর্শ, মুক্তিদূত ও পথপ্রদর্শক। মানবতার সর্বোত্তম জীবনাদর্শের প্রতিচ্ছবি। তার আদর্শ শুধু এক ক্ষেত্রে নয়, জীবনে চলার প্রতিটি ক্ষেত্রে তার আদর্শের সামগ্রিকতা স্বীকৃত। দৈনন্দিন জীবনে ভালো ব্যবহার। আদর্শ পরিবার গঠন। দরিদ্র ও অসহায়দের সঙ্গে হৃদ্যতা প্রদর্শন। বিচার কার্যে ইনসাফ। জিহাদ ও যুদ্ধের ময়দানে দুর্দমনীয় বীরত্ব। অন্যায় ও জুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। ন্যায়পরাণতা ও ক্ষমা প্রদর্শনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তসহ সব ধরনের শ্রেষ্ঠ গুণের অধিকারী তিনি। তার আচার-আচরণ চালচলন অত্যন্ত সৎ, নমনীয় ও কোমল ছিল। তিনি জীবনে কোনো মুসলমান কিংবা কাফেরের সঙ্গেও কটাক্ষপূর্ণ ও হীন আচরণ করেননি। মহান আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে এরশাদ করেন, আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রে অধিষ্ঠিত। (সুরা কলাম : আয়াত ৪)।

সারাবিশ্বেই চলছে আজ মুসলমানদের ওপর সীমাহীন শোষণ ও নিপীড়ন। সর্বত্র চলছে অশান্তির আগুন। তাই নতুন করে শান্তিময় বিশ্ব গড়ে তুলতে এবং সর্বত্র ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আদর্শের বিকল্প নেই। আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে অন্যত্র তার নবী সম্পর্কে বলেন, ‘যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের আশা রাখে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে, তাদের জন্য রাসুলল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মাঝে রয়েছে উত্তম আদর্শ। (সুরা আহযাব : আয়াত ২১)। তিনি সকল কালে, সকল দেশে সকল মানুষের জন্য সমান কার্যকর ও কল্যাণময়। অনেকে মনে করেন, বর্তমানের আধুনিক যুগে তথাকথিত সুশীল সমাজে তিনি কীভাবে আদর্শ হবেন? আমরা বলব, আপনারা নবীজির সীরাত এবং তার জীবনাচার মনোযোগের সঙ্গে পড়েন। সবকিছুই পেয়ে যাবেন। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত একজন মানুষের চাল-চলন ও উঠাবসা থেকে নিয়ে শুরু করে জীবনের সব দিক ও বিষয় তার মাঝে পাবেন। মানবতার সকল সমস্যার সমাধান তিনি দিয়ে গেছেন। আমাদের শুধু জানার অভাব। তার জীবনী যারা মনোযোগের সঙ্গে অধ্যয়ন করেছে এবং তার আদর্শকে জীবনের সকল ক্ষেত্রে লালন করেছে ও তাকে সফলতার মানদ- হিসেবে মেনেছে, তারাই সফলতার শীর্ষে আরোহণ করেছে। বার্নাডশ, মরিস বুকাইলি, উইলিয়াম পিকথল, লিওটলস্টয়, পণ্ডিত নেহেরুসহ অসংখ্য বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী ও মনীষী তার জীবনী অধ্যয়ন করে তার আদর্শের শ্রেষ্ঠত্ব ও মানবতার মুক্তির জন্য এই আদর্শের উপযোগিতা সম্পর্কে দ্ব্যর্থহীন মন্তব্য করে নিজেরা ধন্য হয়েছেন।

নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নাতি হজরত হাসান (রা.) বলেন, আমি নবীজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাথীদের সঙ্গে তার আচরণ সম্পর্কে আমার পিতাকে জিজ্ঞাসা করলাম, উত্তরে তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাস্যোজ্জল চেহারাসম্পন্ন, অমায়িক চরিত্রের অধিকারী ও বিনয়ী ছিলেন। কঠোর ছিলেন না। তার কাছে আগত ব্যক্তি নিরাশ ও হতাশ হতো না। তিনি নিজের মধ্য হতে তিনটি জিনিস পরিত্যাগ করেছিলেন, এক. রিয়া বা আত্মপ্রকাশ। দুই. অতিরঞ্জন। তিন. অনর্থক কার্যকলাপ। আর মানুষের জন্য তিনি তিনটি জিনিসকে পরিত্যাগ করেন, এক. তিনি কাউকে নিন্দা করতেন না। দুই. কাউকে দোষারোপ করতেন না। তিন. সওয়াবের প্রত্যাশা ব্যতীত কোনো কথাই বলতেন না। যখন তিনি কথা বলতেন, শ্রবণকারীরা এমনভাবে কান পেতে শুনত, যেন তাদের মাথায় পাখি বসে আছে। অতঃপর যখন তিনি কথা শেষ করতেন, তখন তারা কথা বলত। তারা তার সামনে কখনো ঝগড়া বা কথা কাটাকাটি করত না। তার নিকট কেউ কথা বলা আরম্ভ করলে তারা তার কথা শেষ হওয়া পর্যন্ত চুপ থাকত। তার উপস্থিতিতে তাদেরই কথা বলার অধিকার থাকত, যারা প্রথম কথা বলা শুরু করত। লোকেরা যাতে হাসে তিনিও তাতে হাসতেন। মানুষ যাতে আশ্চর্য হয়, তিনিও তাতে আশ্চর্য হতেন এবং বলতেন, যখন তোমরা কোনো অভাবীকে তার প্রয়োজনীয় কিছু প্রার্থনা করতে দেখো তার প্রার্থনায় তাকে সাহায্য করো। তিনি মাত্রাতিরিক্ত প্রশংসা পছন্দ করতেন না। কারো কথা বলার সময় তার কথার মাঝে বাধা দিতেন না। হ্যাঁ, তবে সীমা অতিক্রম করলে তাকে হয়তো আদেশ বা নিষেধ করতেন। (তিরমিযী শরীফ)। তিনি মানবজাতিকে বলে গেছেন, প্রকৃত মুসলিম তো সে ব্যক্তি, যার হাত ও কথার অনিষ্ট হতে অন্য মুসলিম নিরাপদে থাকে। আর প্রকৃত মুহাজির তো সে ব্যক্তি, যে আল্লাহতায়ালা কর্তৃক নিষেধকৃত বস্তুকে ছেড়ে দেয়। (সহিহ বোখারি : ১০)। নবীজি বলতেন, তোমরা মুশরিকদের বিরুদ্ধে জান, মাল ও কথার দ্বারা যুদ্ধ করো। (সুনানে আবু দাউদ)। আমি অভিসম্পাতকারী রূপে প্রেরিত হয়নি। বরং আমি দয়ালুরূপে প্রেরিত হয়েছি। (সহিহ মুসলিম : ২৫৯৯)। যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার স্থাপন করে মৃত্যুবরণ করল, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে (সহি বোখারি : ৪৪৫৭)।

রাসুল (সা.) এভাবে বিভিন্ন সময় নানান বিষয়ে সতর্ক ও উৎসাহমূলক কথা বলে উম্মতকে একটি সুন্দর ও শান্তির পথ দেখিয়েছেন। যা অনুসরণ করলে উম্মত সোনার মানুষে পরিণত হয়। আজকে যদি আমাদের সমাজে অন্যায়, অবিচার ও জুলুমণ্ডনিপীড়ন দূর করতে হয়, তাহলে আমাদের ফিরে যেতে হবে নববী আদর্শের দিকে। ফিরিয়ে আনতে হবে সাহাবায়ে-কেরামের সেই সোনালি যুগ। যে যুগে রাজা-প্রজার তফাৎ উঠিয়ে দিয়ে ন্যায় ও ইনসাফের ভিত্তি স্থাপন করা হয়েছিল। তাই আসুন, আমরা আমাদের ব্যক্তি জীবন, পারিবারিক জীবন, সামাজিক জীবন, রাষ্ট্রীয় জীবন ও আন্তর্জাতিক জীবনসহ জীবনের সব ক্ষেত্রে নববী-আদর্শের অনুসরণ করি। তাহলে আমরা আমাদের সফলতা খুঁজে পাব এবং এর মাধ্যমে দুনিয়া ও আখেরাতে মুক্তির ফয়সালা হবে। দুনিয়ার জীবন তো ক্ষণস্থায়ী। এখানে আমরা চিরদিন থাকব না। একদিন আমাকে চলে যেতেই হবে। কেউ হয়তো চলে যাবে খালি হাতে। কেউ সফলতার ঝুড়ি হাতে নিয়ে। তাই পরকালীন জীবনকে সুন্দর করার জন্য আমাদের রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখানো পথ এবং পদ্ধতিতেই চলতে হবে। তা ভিন্ন অন্য কোনো পথে চলার মাধ্যমে আমরা সফল হতে পারব না এবং পরকালেও মুক্তি পেতে পারব না। আমরা যদি পরকালের মুক্তি এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুপারিশের আশাবাদী হই, তাহলে অবশ্যই আমাদের কোরআন এবং হাদিস গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হবে এবং পরিপূর্ণ ইসলামকে মানতে হবে। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দেখানো পথেই আমাদের চলতে হবে। আল্লাহতায়ালা আমাদের সবাইকে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরিপূর্ণ অনুসারী হওয়ার তৌফিক দান করেন- আমিন।

লেখক: শিক্ষক, মাদ্রাসা আশরাফুল মাদারিস, তেজগাঁও ঢাকা।

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত