ঢাকা বুধবার, ১৩ মে ২০২৬, ৩০ বৈশাখ ১৪৩৩ | বেটা ভার্সন

মদিনা শরিফের জুমার খুতবা

দয়া ও ক্ষমাশীলতার উজ্জ্বল আদর্শ মুহাম্মদ (সা.)

শায়খ ড. আহমদ বিন আলি আল হুজাইফি
দয়া ও ক্ষমাশীলতার উজ্জ্বল আদর্শ মুহাম্মদ (সা.)

আ মাদের নবী হজরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামণ্ডএর জীবনচরিত ও তাঁর মহৎ চরিত্র সাধারণ কোনো ঘটনা বা অতীতের কোনো ইতিহাস নয়, মুসলমানের জীবনে যার কোনো প্রভাব নেই। আল্লাহতায়ালা আমাদের নবীকে অনুসরণ করার জন্য এক অনুপম আদর্শ করেছেন। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা আল্লাহকে ও আখেরাতকে ভয় করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে তাদের জন্যে রাসুলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।’ (সুরা আহযাব : ২১)। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন মানুষ ছিলেন। এ সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘বল, ‘আমি তো তোমাদের মতো একজন মানুষই, আমার প্রতি প্রত্যাদেশ হয়, তোমাদের ইলাহ একমাত্র ইলাহ।’ (সুরা কাহফ : ১১০)। অবশ্য মহান আল্লাহ তাঁর চরিত্রকে পূর্ণতা দান করেছেন ও তাঁর গুণাবলিকে মহিমান্বিত করেছেন। তাঁকে মানবীয় পরিপূর্ণতার ও উচ্চ নৈতিকতার উদাহরণ হিসেবে গড়ে তুলেছেন। এরপর আল্লাহ তাঁকে ঐশ্বরিক বার্তা ও আইন দিয়ে আলো প্রদান করেছেন, যার মাধ্যমে তিনি পৃথিবীকে আলোকিত করেছে। মহাগ্রন্থ আল-কোরআনে এসেছে, ‘আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর জ্যোতি, তাঁর জ্যোতির উপমা যেন একটি দীপাধার; যার মধ্যে আছে এক প্রদীপ, প্রদীপটি একটি কাচের আবরণের মধ্যে স্থাপিত, কাচের আবরণটি উজ্জ্বল নক্ষত্রসদৃশ; এটা প্রজ্বলিত করা হয় পূতঃপবিত্র জায়তুন বৃক্ষের তেল দিয়ে যা প্রাচ্যের নয়, প্রতীচ্যেরও নয়, অগ্নি একে স্পর্শ না করলেও যেন এর তেল উজ্জ্বল আলো বিলিয়ে যাচ্ছে; জ্যোতির ওপর জ্যোতি! আল্লাহ যাকে ইচ্ছা পথনির্দেশ করেন তাঁর জ্যোতির দিকে।’ (সুরা নূর : ৩৫)।

সুন্নাহ, ইতিহাস ও সিরাতের বইগুলো আমাদের জানান দেয় যে, বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমগ্র বিশ্বের জন্য এক চলমান দয়ার ভান্ডার ছিলেন। তিনি ছিলেন দয়া, করুণা, ক্ষমাশীলতা, উত্তম চরিত্র ও কোমলতার এক অনন্য প্রবাহ। তাঁর হৃদয়ে কোনো কঠোরতা ছিল না এবং তাঁর জিহ্বায় কোনো অপ্রীতিকর কথা ছিল না। তিনি ছিলেন না কঠোর, না রূঢ়; তাঁর মুখে ছিল না কোনো বিরক্তি বা মুখভঙ্গিতে ছিল না কোনো রূঢ়তা। হজরত আতা ইবনে ইয়াসার (রহ.) বলেন, আমি হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আস (রা)-এর সাথে সাক্ষাৎ করে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম, তাওরাতে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর গুণাবলি বর্ণিত ছিল? তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ’ আল্লাহর শপথ, তিনি তাওরাতে এমনভাবেই বর্ণিত হয়েছেন, যেমন কিছু অংশে কোরআনে তাঁর গুণাবলি বর্ণিত হয়েছে: হে নবী, নিশ্চয়ই আমরা আপনাকে সাক্ষী, সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী হিসেবে প্রেরণ করেছি, নিরক্ষরদের জন্য আশ্রয় হিসেবে প্রেরণ করেছি। আপনি আমার বান্দা ও আমার রাসুল। আমি আপনার নাম রেখেছি ‘আল-মুতাওয়াক্কিল’। তিনি কঠোর নন, রূঢ় নন, বাজারে উচ্চৈঃস্বরে কথা বলেন না, মন্দের প্রতিদানে মন্দ করেন না; বরং ক্ষমা ও দয়া করেন। আল্লাহ তাঁকে ততক্ষণ পর্যন্ত পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নিবেন না, যতক্ষণ না তাঁর মাধ্যমে বাঁকা ধর্মকে সোজা করেন, যেন মানুষ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে এবং এর মাধ্যমে অন্ধ চোখকে উন্মুক্ত করেন, বধিরকে শোনান ও আবৃত হৃদয়কে উন্মুক্ত করেন।’ বোখারি : ২১২৫)।

তাঁর উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ চরিত্র ও মহৎ গুণাবলি ছিল তাঁর নবুয়তের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ এবং তাঁর দাওয়াতের সত্যতার পরিচায়ক। তাঁর মধ্যে মানবজাতির বিভিন্ন গুণ এমনভাবে সন্নিবেশিত হয়েছিল, যেমন একটি উপত্যকায় প্রবাহিত পানির ধারা একত্র হয়। তাঁর উজ্জ্বল চেহারা ও প্রফুল্ল মুখমণ্ডল সত্যের প্রকাশক ছিল। তাঁর মধ্যে সত্যের প্রমাণগুলো ঝলমল করত। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে সালাম (রা.) বলেন, ‘যখন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদিনায় আগমন করেন তখন লোকজন তাঁর দিকে ছুটে যায় এবং লোকে বলাবলি করে- আল্লাহর রাসুল আগমন করেছেন। আমিও তাঁকে দেখতে যাই। যখন আমি তাঁর মুখমণ্ডল দেখলাম তখন বুঝলাম, তা কোনো মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। তিনি প্রথমে যা বললেন, ‘হে মানুষ সকল, সালামের প্রসার ঘটাও, খাদ্য বিতরণ করো, আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখো এবং যখন মানুষ ঘুমিয়ে থাকে, তখন রাতে নামাজ আদায় করো, তাহলে নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (তিরমিজি : ২৪৮৫)। তিনি ছিলেন এমন করুণাময় ও দয়াশীল, যার মুখমণ্ডল ছিল এমনই আলোক উজ্জ্বল যেন তাঁর কপালে তারকারাজি ঝলমল করছে।

ঈমানদার ভাইয়েরা! এই উম্মতের ওপর আল্লাহর অন্যতম বড় অনুগ্রহ হলো, আল্লাহতায়ালা আমাদের জন্য তাকে (শেষনবী মুহাম্মদ) সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নবী হিসেবে প্রেরণ করেছেন, যাঁর সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘অবশ্যই তোমাদের মধ্য হতেই তোমাদের নিকট এক রাসুল এসেছে। তোমাদের যা বিপন্ন করে তা তার জন্যে কষ্টদায়ক। সে তোমাদের মঙ্গলকামী, মোমেনদের প্রতি সে দয়ার্দ্র ও পরম দয়ালু।’ (সুরা তওবা : ১২৮)। তিনি এমন এক নবী যিনি নিজের উম্মতের কষ্ট সহ্য করতে পারেন না এবং তাঁদের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভালোবাসেন। হজরত আবু মুসা (রা.) বলেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন আল্লাহ তাঁর বান্দাদের কোনো উম্মতের ওপর রহমত করতে চান, তখন তিনি তাদের নবীকে তাদের আগে তুলে নেন, এবং তাকে তাদের জন্য অগ্রদূত ও পূর্বসূরি হিসেবে তৈরি করেন।’ (মুসলিমস : ৫৮৫৯)। হজরত আবু হুরাইরা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একবার কবরস্থানে গিয়ে বললেন, ‘মোমেনদের আবাসভূমি! তোমাদের ওপর সালাম। ইনশাআল্লাহ আমরা তোমাদের সঙ্গে সংযুক্ত হব। আমি আশা করতাম, যদি আমরা আমাদের ভাইদের দেখতে পেতাম।’ সাহাবিগণ বললেন, ‘হে আল্লাহর রাসুল! আমরা কি আপনার ভাই নই?’ তিনি বললেন, ‘তোমরা আমার সাহাবি। আমার ভাই তারা, যারা এখনও আসেনি।’ (মুসলিম : ৪৭২)। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি ভালোবাসায়, সম্মান ও গভীর আকাঙ্ক্ষায় আমাদের হৃদয় ভরে ওঠা উচিত এবং আমাদের জিহ্বা তাঁর প্রতি অধিক পরিমাণে দরুদ ও সালাম পাঠে ব্যস্ত থাকা সমীচীন। সত্যিকারের ভালোবাসার নিদর্শন হলো প্রিয় ব্যক্তির আনুগত্যে দ্রুত সাড়া দেওয়া ও তার সন্তুষ্টি লাভের জন্য চেষ্টা করা। আল্লাহর প্রিয়ভাজন হজরত মুসা (আ.) তাঁর প্রভুর উদ্দেশে বলেছেন, ‘এই তো এরা আমার পশ্চাতে এবং হে আমার প্রতিপালক! আমি ত্বরায় তোমার নিকট এলাম, তুমি সন্তুষ্ট হবে এজন্যে।’ (সুরা তহা : ৮৪)। পূর্ণ ও সত্য ভালোবাসা তা-ই, যার প্রমাণ রয়েছে এবং যার নিদর্শন বাস্তবায়িত হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামণ্ডএর প্রতি ভালোবাসা ও আল্লাহর প্রতি ভালোবাসা হলো এমন এক গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যার মাধ্যমে মোমেন তাঁর প্রভুর নৈকট্য ও ভালোবাসা লাভ করে। আর আল্লাহর প্রতি ভালোবাসার প্রতিফলন হলো নবীর প্রতি ভালোবাসা। কারণ নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর প্রভুর কাছে সবচেয়ে উচ্চ মর্যাদার অধিকারী। যে কেউ তার প্রিয়কে সত্যিকার অর্থে ভালোবাসে, সে তার প্রিয়জন যা ভালোবাসে তাকেই ভালোবাসে, যা ঘৃণা করে তাকেই ঘৃণা করে। প্রকৃত ভালোবাসায় হৃদয়ে প্রচণ্ড আকাঙ্ক্ষা, জিহ্বায় বারংবার উচ্চারণ ও সম্মানবোধে পূর্ণতা থাকে। আর যে ভালোবাসার প্রভাব দৈনন্দিন জীবনে নেই এবং যা শুধু বাহ্যিকতায় সীমাবদ্ধ, তা অসম্পূর্ণ। সুতরাং যার ভালোবাসা এমন অবস্থায় রয়েছে, তার জন্য উচিত হলো বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামণ্ডএর প্রতি তার ভালোবাসার ঘাটতি পূরণ করা। কেননা, সত্যিকারের ভালোবাসা হলো প্রিয়জনের নিকটে পৌঁছানোর এক বিস্তৃত দরজা ও উচ্চ মর্যাদায় পৌঁছানোর শক্তিশালী মাধ্যম। হজরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বলেন, এক ব্যক্তি মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামণ্ডএর কাছে এসে বললেন, 'কেয়ামত কবে হবে? তিনি বললেন, তোমার জন্য আক্ষেপ, তুমি এর জন্য কী প্রস্তুতি গ্রহণ করেছ? সে জবাব দিল, আমি তার জন্য কোনো প্রস্তুতি গ্রহণ করিনি, তবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলকে ভালোবাসি। তিনি বললেন, তুমি যাকে ভালোবাস, কেয়ামতের দিন তুমি তাঁর সঙ্গেই থাকবে। আমরা বললাম, আমাদের জন্যও কি এরূপ? তিনি বললেন, হ্যাঁ। এতে আমরা সে দিন অতিশয় আনন্দিত হলাম।' (বোখারি : ৬১৬৭)। মোমেনগণ! আল্লাহ আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে স্রষ্টার সমস্ত সৃষ্টির মধ্য থেকে বেছে নিয়েছেন ও শ্রেষ্ঠ গুণাবলি দিয়ে তাঁকে সুসজ্জিত করেছেন। তাঁকে নবীদের মালার মুক্তারূপে মনোনীত করেছেন, যাতে তিনি তাঁর দ্বীন পৌঁছে দেন ও ঐশ্বরিক শিক্ষার মাধ্যমে মানবতাকে পুনর্গঠন করেন এবং মানুষকে তার নৈতিক পূর্ণতার উচ্চ স্তরে উন্নীত করেন। কেননা, তাঁর নবুয়ত ও রিসালতের আগের যুগে মানবজাতি ছিল অজ্ঞতা, অন্যায়, অন্ধকার ও পৌত্তলিকতার মধ্যে নিমজ্জিত। তাই এই বার্তা সারা পৃথিবীতে সূর্যের আলো যেমন ছড়িয়ে পড়ে, তেমনিভাবে ছড়িয়ে পড়েছে ও দিন-রাত্রির মতো সর্বত্র প্রবেশ করেছে। তা পৃথিবীকে পূর্ণ করেছে করুণা, ন্যায়বিচার, সভ্যতা, জ্ঞান ও মানবতার আলোয়। সুতরাং, প্রতিটি মুসলমানের উচিত মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে তার আদর্শরূপে গ্রহণ করা। যথাযথভাবে তাকে অনুসরণ করে সত্যিকারের ভালোবাসা অর্জন করা। জেনে রেখো, ইসলাম জীবনের সুরক্ষা ও আত্মার রক্ষাকে অন্যতম মহান লক্ষ্য হিসেবে স্থাপন করেছে। সুতরাং মুসলিমদের প্রতি নির্দেশনা হলো স্বাস্থ্য ও শরিয়তের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা, যার মধ্যে অন্যতম হলো প্রতিষেধক গ্রহণ। বিশেষত হারামাইন শরিফাইনে হজ, ওমরাহ ও জিয়ারতের মৌসুমে যেন নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে পারে। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, তিনি যেন সকল মুসলমানকে সব ধরনের অনিষ্ট থেকে সুরক্ষিত রাখেন।

(২৯ শে রবিউস সানি ১৪৪৬ হিজরি মোতাবেক ১ নভেম্বর ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দ তারিখে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন- মাওলানা আবদুল কাইয়ুম শেখ)

আরও পড়ুন -
  • সর্বশেষ
  • সর্বাধিক পঠিত