মসজিদে নববিতে জুমার খুতবা
ইখলাসশূন্য আমল গ্রহণযোগ্য নয়
শায়খ ড. আবদুল্লাহ বিন আবদুর রহমান আল বুআইজান
প্রকাশ : ২০ নভেম্বর ২০২৫, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আল্লাহতায়ালা সৎকর্ম কবুল করার জন্য একটি শর্ত নির্ধারণ করেছেন। সেই শর্ত ছাড়া কোনো আমল গ্রহণযোগ্য হয় না, আমলের উদ্দেশ্য পূরণ হয় না এবং সেই আমলের প্রতিদানও পাওয়া যায় না। এটি হৃদয়ের এক মহান কাজ- যার খবর শুধু অদৃশ্যের জ্ঞানী আল্লাহই জানেন। এটি আল্লাহর নৈকট্য অর্জনের সবচেয়ে উত্তম ও মূল্যবান উপায়। আর সেটি হলো ইখলাস বা নির্ভেজাল নিয়ত। তোমরা কি জানো ইখলাস কী? এটি হলো মুক্তি ও সফলতার মূলভিত্তি, জয়ের পথ ও সৎকর্মের প্রাণ। ইখলাস ছাড়া কোনো ইবাদত আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ইখলাস ছাড়া করা কাজ শুধু সময় ও শক্তির অপচয়। ইখলাস ছাড়া নামাজ-রোজা কোনো সওয়াব আনে না এবং দান-সদকাও কোনো মূল্য রাখে না।
ইখলাস হলো হৃদয়কে লৌকিকতা থেকে মুক্ত করা, নিজের নফসকে তার খেয়াল-খুশি থেকে পবিত্র করা ও মনকে স্বার্থ থেকে স্বচ্ছ রাখা। ইখলাস মানে হলো, শুধু আল্লাহর জন্য কাজ করা, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য নিয়তকে নির্ভেজাল রাখা; মানুষের প্রশংসা পাওয়ার আশা না করা, তাদের কাছ থেকে কোনো দুনিয়াবি লাভ বা স্বার্থ প্রত্যাশা না করা। বান্দার লক্ষ্য হবে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি। ইখলাস মানে হলো, যে কাজই করা হবে, তা শুধু এক আল্লাহর সন্তুষ্টির আশায়; তাঁর পুরস্কার পাওয়ার প্রত্যাশায় ও শাস্তিকে ভয় করে। তাতে দেখানো, শোনানো, নাম কামানো বা মানুষের মন জয়ের চেষ্টা থাকবে না।
একজন মুখলিস মানুষ তার ভালো কাজকে ঠিক তেমনই গোপন রাখে, যেমন সে নিজের গোনাহ গোপন রাখে। একা অবস্থায় যেভাবে ইবাদত করে, মানুষের সামনে থেকেও ঠিক সেভাবেই করে। মানুষের প্রশংসা বা সমালোচনা তার কাছে বড় নয়। তার দিনের ইবাদত যেমন, রাতের অন্ধকারের ইবাদতও তেমন। গোপন আর প্রকাশ্য কাজ তার কাছে এক। কারণ সে শুধু আল্লাহরই ইবাদত করে এবং তার কাজের লক্ষ্যও শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি। ইখলাস মানে হলো বিশ্বাস ও কাজে খাঁটি থাকা, হৃদয়কে শিরক, রিয়া, কপটতা ও খারাপ নিয়ত থেকে পরিষ্কার রাখা। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘বলো, আমার সালাত, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোনো শরিক নেই এবং আমি এরই জন্যে আদিষ্ট হয়েছি। আর আমিই প্রথম মুসলিম।’ (সুরা আনআম : ১৬২-১৬৩)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘আমি তোমার কাছে এই কিতাব সত্যসহ অবতীর্ণ করেছি। সুতরাং আল্লাহর ইবাদত কর তাঁর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে। জেনে রাখ, অবিমিশ্র আনুগত্য আল্লাহরই প্রাপ্য।’ (সুরা জুমার,: ২-৩)।
আল্লাহর কাছে আমলের মূল্য নির্ধারিত হয় ইখলাস অনুযায়ী। যে ব্যক্তি মানুষকে দেখানোর জন্য কাজ করে, সুনামের জন্য ইবাদত করে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাকে সবার সামনে অপমান করবেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে মানুষকে শোনানোর জন্য কাজ করে, আল্লাহ লোকদের বিষয়টি জানিয়ে কেয়ামতে তাকে অপমান করবেন; আর যে লোকম দেখানোর জন্য কাজ করে, আল্লাহ তার উদ্দেশ্য পরকালে প্রকাশ করে দেবেন।’ (বোখারি : ৬৪৯৯)।
ইখলাস হলো- আমল কবুল হওয়ার শর্ত ও সওয়াব পাওয়ার একমাত্র উপায়। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘তারা তো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধচিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে তাঁর ইবাদত করতে এবং সালাত কায়েম করতে ও জাকাত দিতে, এটাই সঠিক দীন।’ (সুরা বাইয়িনাহ : ৫)। অতএব, যখন কোনো কাজে ইখলাস থাকে না তখন তার সওয়াব নষ্ট হয়ে যায় ও আমলটি বাতিল হয়। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি শরিক থেকে সবচেয়ে স্বনির্ভর। যে ব্যক্তি কোনো আমলে আমার সাথে অন্য কাউকে শরিক করে, আমি তাকে ও তার শরিক করা কর্মকে পরিত্যাগ করি।’ (মুসলিম : ৭৩৬৫)। মহান আল্লাহ শুধুমাত্র সেই আমল গ্রহণ করেন যা তাঁর জন্য খাঁটি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শরিয়ত ও মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ইখলাস হলো- শয়তানের প্রতারণা থেকে শক্তিশালী ঢাল। এটি মানুষকে পথভ্রষ্ট হওয়া এবং অপমান ও ব্যর্থতা থেকে রক্ষা করে। এটি নিরাপত্তা ও মুক্তির অন্যতম কারণ। শয়তান আল্লাহর সম্মান ও শক্তির কসম করে বলেছিল, ‘আমি এদের সকলকেই পথভ্রষ্ট করব, তবে এদের মধ্যে আপনার একনিষ্ঠ বান্দাদের নয়।’ (সুরা সাদ : ৮২-৮৩)। ইউসুফ (আ.) সম্পর্কে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আমি তাকে মন্দ কর্ম ও অশ্লীলতা থেকে বিরত রাখবার জন্যে এভাবে নিদর্শন দেখিয়েছিলাম। সে তো ছিল আমার বিশুদ্ধচিত্ত বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত।’ (সুরা ইউসুফ : ২৪)।
ইখলাস ঈমানের মূলভিত্তি। এটি প্রতিটি আমলে অপরিহার্য। ইখলাস থাকলে মন সক্রিয় হয়, আলস্য দূর হয়, কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন হয়, পরিশ্রমে বরকত আসে, ফলাফল পাওয়া যায় এবং আমল স্থায়ী কল্যাণ বয়ে আনে। ইখলাসের কারণে সাধারণ কাজও ইবাদতে পরিণত হয়। এমনকি দুনিয়াবি কাজেও সওয়াব পাওয়া যায়। সাদ ইবন আবি ওয়াক্কাস (রা.) বলেন, আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির নিয়তে যা খরচ করবে তার প্রতিটিতেই সওয়াব পাবে, এমনকি স্ত্রীকে মুখে তুলে দেওয়া খাবারেও।’ (আদাবুল মুফরাদ : ৭৫৭)। অতএব, নিয়ত ছাড়া আমলে শুধু কষ্ট, সওয়াব নেই; ইখলাস ছাড়া নিয়ত শুধু দেখানো; আর ইখলাস থাকলেও যদি তা সুন্নাহ অনুযায়ী না হয়, তাহলে তা মূল্যহীন।
আল্লাহতায়ালা আমাদের চেহারা বা সম্পদ দেখেন না, বরং দেখেন আমাদের হৃদয় ও কর্ম। হৃদয় ঠিক হয় সত্যবাদিতা ও ইখলাসে, আর আমল ঠিক হয় শরিয়ত মানার মাধ্যমে। হৃদয় হলো দেহের রাজা। হৃদয় ঠিক হলে পুরো দেহ ঠিক থাকে, আর হৃদয় নষ্ট হলে সবকিছু নষ্ট হয়ে যায়। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘দেহের ভেতর একটি মাংসপি- আছে। এটি ঠিক হলে পুরো দেহ ঠিক হবে; এটি নষ্ট হলে পুরো দেহ নষ্ট হবে। আর সেটি হলো হৃদয়।’ (বোখারি : ৫২)।
হৃদয়ের সবচেয়ে উত্তম কাজ হলো ইখলাস। এটি বান্দা ও রবের মধ্যকার গোপন সম্পর্ক, ইবাদতের প্রাণ এবং আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি। ইখলাস অর্জন করা কঠিন। এটি সহজে কমে যায়, মানুষের নফস এটি চায় না। এটি ধরে রাখতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করা, আল্লাহকে গোপনে-প্রকাশ্যে ভয় করা ও নফসকে নিজের স্বার্থ থেকে মুক্ত রাখার প্রয়োজন হয়। ইখলাস আল্লাহর এক বিশেষ উপহার- যাকে তিনি ভালোবাসেন, তার হৃদয়ে এই আলো ঢেলে দেন। যে আল্লাহর জন্য খাঁটি হয়, আল্লাহ তাকে নিজের জন্য খাঁটি করে নেন। তাকে দয়া করেন, অন্তরে শান্তি ও তৃপ্তিম দেন। মহান আল্লাহ জানিয়েছেন যে, ইখলাস ওয়ালা বান্দাদের ওপর ইবলিসের কোনো ক্ষমতা নেই। তিনি বলেন, ‘আমি পৃথিবীতে মানুষের নিকট পাপকর্মকে অবশ্যই শোভন করে তুলব এবং আমি এদের সকলকেই বিপথগামী করব, তবে এদের মধ্যে আপনার নির্বাচিত বান্দাগণ ছাড়া।’ (সুরা হিজর : ৩৯-৪০)। আলোচ্য আয়াতের প্রতিপাদ্য হলো, যারা ইখলাসে নিরাপদ ও তাওহিদে দৃঢ়- শয়তান তাদেরকে পথভ্রষ্ট করতে পারে না। আল্লাহর নিয়ম হলো, তিনি মুখলিস বান্দাদের মানুষের হৃদয়ে সম্মান দেন, তাদের কাজ গ্রহণযোগ্য করেন, মানুষ তাদের ভালোবাসে। আর যে ব্যক্তি লোক দেখানোর জন্য আমল করে, সে অপমান ও ঘৃণার যোগ্য হয়ে যায়। সকল আমল নিয়তের ওপর নির্ভর করে। প্রত্যেকে তার নিয়ত অনুযায়ী ফল পায়। আল্লাহ শুধু তাকওয়াবানদের আমল গ্রহণ করেন।
অতএব, আল্লাহকে ভয় করুন, নিজের হিসাব নিজেই নিন, হৃদয় ও নিয়ত ঠিক করুন, আর সমস্ত কাজে ইখলাস রাখুন। বুদ্ধিমান সে যে নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং মৃত্যুর পরের জীবনের জন্য আমল করে। আর মূর্খ সে যে নফসের খেয়াল-খুশিতে চলে, আর শুধু আল্লাহর কাছ থেকে আশা করে; কিন্তু আমল করে না। ধন্য সেই ব্যক্তি যে আল্লাহর জন্য তার হৃদয়কে খাঁটি রাখে এবং নিজের কাজ শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্যই করে।
(২৩-০৫-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ১৪-১১-২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস - আবদুল কাইয়ুম শেখ)
