মসজিদে নববিতে জুমার খুতবা
দুনিয়া ও মানুষের দায়িত্ব
শায়খ ড. সালাহ বিন মুহাম্মাদ আল বুদাইর
প্রকাশ : ২৭ নভেম্বর ২০২৫, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা এমন এক দুনিয়ায় বাস করছি, যেখানে দুঃখ-কষ্ট, দুশ্চিন্তা ও শেষ হয়ে যাওয়ার প্রবাহ অবিরাম। এই জীবনে দুঃখ আমাদের পোড়ায়, বিপদে ভরপুর, নানা ঘটনা-দুর্ঘটনা ভারী ও কষ্টগুলো ধারালো। এখানে শান্তি নিরাপদ নয়, প্রতিশ্রুতি টেকে না, সম্পর্কের বন্ধন সহজেই ছিঁড়ে যায়। এই দুনিয়া মরীচিকার মতো ঝলসে ওঠে, মেঘের মতো চলে যায়, আর মানুষকে কল্পনার মতো ভুল ধারণায় ফেলে। এখানে স্থায়িত্ব নেই; আরামও টেকসই নয়; কষ্টেরা দূর হয় না; পরীক্ষা-বিপদ থামে না; সৌন্দর্য ম্লান হয়ে যায়; জীবন শেষ হয়ে যায়। মানুষ এখানে যাত্রী। কিছুক্ষণ থাকে, তারপর চলে যায়। এই দুনিয়া তোমাকে নিশানা বানায়, কখনও সুখ দিয়ে, কখনও দুঃখ দিয়ে। শেষে সবাইকে বিদায়ের ডাক দেয়। একসময় বাসস্থান হয় কবরে, সম্পদ হয় অন্যের উত্তরাধিকার। কবি বলেন, ‘সন্ধ্যায় দুনিয়া সন্তানদের ব্যস্ত রাখে, আর সকালে কাঁদো কাঁদো মানুষ রেখে যায়।’
এই দুনিয়ার সুখ প্রতারণা ও প্রতিশ্রুতিগুলো ছলনা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর পার্থিব জীবন ছলনাময় ভোগ ছাড়া কিছুই নয়।’ (সুরা আলে ইমরান : ১৮৫)। আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘পার্থিব জীবন তো ক্রীড়া-কৌতুক ছাড়া আর কিছুই নয়। আর যারা তাক্ওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্যে আখেরাতের আবাসই শ্রেয়; তোমরা কি অনুধাবন কর না?’ (সুরা আনআম : ৩২)।
এই নিচু দুনিয়া আসলে এক অস্থায়ী ছায়া ও স্বপ্নের মতো। মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর নিয়ম হলো, দুনিয়ার কোনো জিনিস যত উঁচুতে ওঠে, একসময় তা নিচে নামবেই।’ (বোখারি : ২৮৭২)।
এটা এমন এক ঘর যেখানে বিপদ এসে বদলে দেয়, দুঃখ এসে আঘাত করে, বিভিন্ন পরীক্ষায় জীবনকে কঠিন করে তোলে। মৃত্যু এখানে তলোয়ার তুলে দাঁড়িয়ে আছে। যাকে পায়, তাকেই নিয়ে যায়। আজ না হলে কাল সবাই মরবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, আমি তোমার আগেও কোনো মানুষকে অনন্ত জীবন দান করি নাই; সুতরাং তোমার মৃত্যু হলে এরা কি চিরজীবী হয়ে থাকবে? জীবমাত্রই মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করবে; আমি তোমাদের মন্দ ও ভালো দিয়ে বিশেষভাবে পরীক্ষা করে থাকি এবং আমারই কাছে তোমরা প্রত্যানীত হবে।’ (সুরা আম্বিয়া : ৩৪-৩৫)। কবি বলেন, ‘কোথায় তারা যারা আমাদের আগে ছিল? যারা ছিল সৌন্দর্য আর গৌরবে ভরা মানুষ? আমরা কত মানুষকে দেখেছি গতকাল ছিল জীবিত; কিন্তু আজ মৃত! আর খুব শিগগিরই মানুষ আমাদের নিয়েও এ কথা বলবে।’
কোথায় সেই বন্ধু যারা পাশে ছিল? কোথায় সেই সঙ্গীরা যারা বসত একসঙ্গে? মৃত্যু তাদের ছিনিয়ে নিয়েছে। একদিন আমাদেরও নেবে। হে গাফিল মানুষ! বাবা-মায়ের কবর দেখে কি শিক্ষা নাও না? ভাই-বোনের মৃত্যু কি তোমাকে ভাবায় না? কবরস্থানে দাঁড়িয়ে দেখো, কত মানুষ এখানে শুয়ে আছে; তারা চলে গেছে। আর তুমিও চিরকাল বাঁচবে না। মৃত্যু আসার আগে প্রস্তুতি নাও। শেষ মুহূর্ত আসার আগেই পরকালের জন্য পাথেয় জোগাড় করো। এই ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া যেন তোমাকে দেমাগে ভরিয়ে না দেয়; এর সাজসজ্জা, ভোগ-বিলাস যেন তোমাকে আত্মবিস্মৃত না করে; শয়তানের ধোঁকা থেকে বাঁচো।
হে পাপী মানুষ! নিজের অবস্থা নিয়ে ভাবো, শেষ পরিণতি নিয়ে চিন্তা করো; একদিন তোমার সময় শেষ হবে, শক্তি ক্ষয়ে যাবে, তোমার কাজের হিসাব খুলে ধরা হবে, আর পাল্লা যদি হালকা হয় তখন কী হবে? কবি বলেন, ‘তুমি কি পাপ করে আনন্দ পাও ও ভুলে যাও সেই দিন, যখন কপাল ধরে টেনে আনা হবে? ইচ্ছা করেই পাপ করো, পরোয়া করো না। অথচ জগতের প্রতিপালক তোমার সবই দেখছেন! কী তোমাকে প্রতারিত করল? কী তোমাকে গাফিল করল? কী তোমাকে তোমার প্রভুর অবাধ্য হতে সাহস দিল? কী তোমাকে এমন পথে ফেলল যেখানে তুমি হারাম করছো, পাপ জমাচ্ছো; যেন মহান আল্লাহ তোমাকে দেখছেন না?
হে মানুষ, তুমি খেলাধুলা, গাফিলতি ও অবাধ্যতায় ডুবে আছ। কতদিন এভাবে তোমার রবের আদেশ অমান্য করে প্রকাশ্যে তাঁর বিরোধিতা করবে? কতদিন নামাজ নষ্ট করবে ও জেদ দেখাবে? কতদিন পাপের পথে চলবে ও তাতে গর্ব করবে? হে নফসের নেশায় মগ্ন মানুষ, নিজের আনন্দে ডুবে থাকা মানুষ, যে তার মূল্যবান সময়কে অপচয় করছে, যে একান্তে আল্লাহকে ভয় করে না, আর কতদিন খারাপ কাজের করবে? আর কতদিন দরজা-জানালা বন্ধ করে গোপনে গোনাহ করবে? যে লোক একা হয়ে পাপ করে সে যেন ভয় করে সেই দিনের, যেদিন মাথার চুল পেকে যাবে ভয়ের তীব্রতায়। কবি বলেন, ‘হে ওই ব্যক্তি যে নিজের গোনাহ লুকিয়ে রাখো, লজ্জা করো না? অথচ আল্লাহ তোমাকে একান্তে দেখছেন! তোমাকে ধোঁকা দিয়েছে তাঁর ঢিল ও অবকাশ দেওয়া এবং তোমার গোনাহ ঢেকে রাখা। হে এমন ব্যক্তি যে পথভ্রষ্টতায় ঘুরে বেড়ায়, আল্লাহ তোমাকে সুযোগ দিয়েছেন, আর তুমি প্রকাশ্যে তাঁর অবাধ্য হলে! তবু তুমি তাঁর শাস্তিকে ভয় করলে না?’
আল্লাহ সেই মানুষকে দয়া করুন, যে দুনিয়াকে নেকির বাহন বানায়, যার মাধ্যমে জান্নাতের বাগানে পৌঁছে যায়, জাহান্নাম থেকে বাঁচে। ধন্য সেই বান্দা, যে নিজের কথা ভাবে, আপন কবরের জন্য প্রস্তুত হয়, মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেয়, তার বিশ্রামের জায়গা আগে থেকেই ঠিক করে রাখে, জীবন শেষ হবার আগেই, আমল বন্ধ হবার আগেই, চোখের পানি শুকিয়ে যাবার আগেই, তাওবা অগ্রহণযোগ্য হয়ে যাবার আগেই, আর মানুষ অন্ধকার, নির্জন কবরে ঢুকে যাবার আগেই, যেখানে আর কোনো নেকি বাড়ানো যায় না এবং গোনাহও কমানো যায় না। তাই ফিরে আসো আল্লাহর দিকে, দেরি করো না! তোমাদের রব অতীব ক্ষমাশীল, বারবার তওবা কবুলকারী।
তোমরা যতবার তওবা করবে, তিনি ততবারই ক্ষমা করবেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করতে চান।’ (সুরা নিসা : ২৭)। আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘তবে কি তারা আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করবে না ও তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে না? আল্লাহ তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা মায়েদা : ৭৪)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, ‘তারা নয়, যারা তওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে। আল্লাহ এদের পাপ পরিবর্তন করে দিবেন পুণ্য দিয়ে। আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা ফুরকান : ৭০)।
কোরআনে আরও এসেছে, ‘বল, ‘হে আমার বান্দাগণ, তোমরা যারা নিজেদের প্রতি অবিচার করেছ, আল্লাহর অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়ো না; আল্লাহ সমুদয় পাপ ক্ষমা করে দেবেন। তিনি তো ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ (সুরা জুমার : ৫৩)। আল্লাহতায়ালা আরও বলেন, ‘তিনিই তাঁর বান্দাদের তওবা কবুল করেন ও পাপ মোচন করেন এবং তোমরা যা কর তিনি তা জানেন।’ (সুরা শুরা : ২৫)। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কসম! তোমরা যদি গোনাহ না করতে, তাহলে আল্লাহ তোমাদের সরিয়ে এমন এক জাতি সৃষ্টি করতেন যারা গোনাহ করত, তারপর ক্ষমা চাইত। আর আল্লাহ তাদের ক্ষমা করতেন।’
(মুসলিম : ৬৮৫৮)। একটি হাদিসে কুদসিতে আল্লাহতায়ালা বলেছেন, ‘হে আদম সন্তান, যতক্ষণ আমাকে তুমি ডাকতে থাকবে এবং আমার ক্ষমা পাওয়ার আশায় থাকবে, তোমার গোনাহ যত অধিক হোক, তোমাকে আমি ক্ষমা করব, এতে কোন পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান, তোমার গোনাহর পরিমাণ যদি আসমানের কিনারা বা মেঘমালা পর্যন্তও পৌঁছে যায়, তারপর তুমি আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা কর, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দেব, এতে আমি পরওয়া করব না। হে আদম সন্তান! তুমি যদি সম্পূর্ণ পৃথিবী পরিমাণ গোনাহ নিয়েও আমার কাছে আস এবং আমার সঙ্গে কাউকে অংশীদার না করে থাক, তাহলে তোমার কাছে আমিও পৃথিবী পূর্ণ ক্ষমা নিয়ে হাজির হব।’ (তিরমিজি : ৩৫৪০)।
এটাই আল্লাহর দয়া, উদারতা ও ভালোবাসা; যদিও মানুষ গোনাহ করে, বাড়াবাড়ি করে তিনি তবু ডাকেন, ক্ষমা করতে চান, অপরাধ মাফ করে দেন। যে তাঁর দিকে ফিরে আসে আল্লাহ তার দিকে ফিরে আসেন। তাই হে মানুষ, পাপের অতীতকে নেকির ভবিষ্যৎ দিয়ে মুছে ফেলো। তওবা করো, দেরি করার আগে। কারণ মৃত্যু যখন সামনে এসে যাবে, আত্মা যখন গলায় উঠে যাবে, শরীর ঠান্ডা হয়ে যাবে তখন তওবা কবুল হবে না। তখন আর যাওয়ার জায়গা থাকবে না।
(৩০-০৫-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ২১-১১-২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস- আবদুল কাইয়ুম শেখ)
