মোমিনদের গুণাবলি
আবদুর রহমান
প্রকাশ : ০১ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইসলামে সাফল্য বলতে শুধু ইহকালীন বৈষয়িক প্রাচুর্যকে বোঝায় না, বরং এটি ইহকাল ও পরকালের চূড়ান্ত মুক্তি ও কল্যাণকে নির্দেশ করে। পবিত্র কোরআন এই সাফল্য অর্জনের জন্য মোমিনদের সুনির্দিষ্ট গুণাবলি বর্ণনা করেছে, যা ঈমানের মৌখিক স্বীকৃতির পাশাপাশি সৎকর্ম (আমলে সালেহ) ও উন্নত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের গভীর সমন্বয়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়। এই গুণাবলিগুলো মোমিনকে দুনিয়ায় ‘হায়াতান তাইয়্যিবাহ’ (পবিত্র ও আনন্দময় জীবন) এবং পরকালে জান্নাতুল ফিরদাউসের উত্তরাধিকারী করে তোলে।
জান্নাতুল ফিরদাউসের ভিত্তি : কোরআন মোমিনদের জীবনের আধ্যাত্মিক ভিত্তিকে সংজ্ঞায়িত করেছে সুরা মুমিনুনে (আয়াত, ১-১১)- যেখানে জান্নাতের সর্বোচ্চ স্তর ফিরদাউস লাভের জন্য সাতটি মৌলিক গুণাবলিকে সাফল্যের প্রবেশপথ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘নিশ্চিতভাবেই সফলকাম হয়েছে মোমিনরা, যাদের জীবন এই সুনির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।’
এই গুণাবলির প্রথমেই স্থান দেওয়া হয়েছে সালাতে খুশুকে (বিনয় ও নম্রতা) । এটি ইবাদতের অভ্যন্তরীণ মানদ-, যা মোমিনের হৃদয়ে আল্লাহর মহত্ত্বের প্রতি সচেতনতা তৈরি করে। একবার এই অভ্যন্তরীণ শুদ্ধতা অর্জিত হলে মোমিন বাজে বা অনর্থক কথা-কাজ (লাঘব) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যা তার বাহ্যিক নৈতিকতা নিশ্চিত করে। এরপর আসে জাকাত বা পরিশুদ্ধি সম্পাদনের বিষয়টি। মক্কী যুগে নাজিল হওয়ায়, তাফসির অনুযায়ী এটি শুধু আর্থিক দান নয়, বরং আত্মিক, নৈতিক ও চারিত্রিক পরিশুদ্ধির (তাজকিয়া) প্রতি সর্বদা সক্রিয় থাকাকে বোঝায়। পরবর্তী গুণটি হলো লজ্জাস্থানের হেফাজত ও অবৈধ যৌনতা বর্জন, যা ব্যক্তিগত নৈতিকতার এক অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সামাজিক দায়িত্বের ক্ষেত্রে, মোমিনরা তাদের আমানতসমূহ এবং ওয়াদা চুক্তির রক্ষণাবেক্ষণ করে বিশ্বস্ততার সর্বোচ্চ মান প্রতিষ্ঠা করে। ইসলামের দৃষ্টিতে, আমানত শব্দটি অত্যন্ত ব্যাপক। এর মধ্যে শুধু অর্থ বা বস্তুগত সম্পদই নয়, বরং ক্ষমতা, দায়িত্ব ও অধিকারও অন্তর্ভুক্ত। যখন কোনো মোমিন তার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন, তখন তিনি কার্যত দেশের নেতৃত্ব ও ভবিষ্যতের জন্য তার সাক্ষ্য ও বিশ্বস্ততা আমানত হিসেবে তুলে ধরেন। একটি ভুল বা অসৎ নেতৃত্বকে ভোট দেওয়া মানে সেই পবিত্র আমানতের খেয়ানত করা, যা মুমিনের সাফল্যের মানদ-ের সম্পূর্ণ পরিপন্থি।
অবশেষে, এই সমস্ত নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দায়িত্ব পালনের পর মোমিন তার নামাজসমূহের সংরক্ষণ নিশ্চিত করে। এই ক্রমটি প্রকাশ করে যে, আধ্যাত্মিক সফলতা হলো একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া: অভ্যন্তরীণ মান নিশ্চিত করা, নৈতিক জীবনযাপন করা এবং অবশেষে ইবাদতের নিরবচ্ছিন্নতা রক্ষা করা।
আল্লাহর নৈকট্যের প্রতীক : সুরা ফুরকানে (আয়াত, ৬৩-৭৭) মোমিনদের চরিত্রের সর্বোচ্চ পূর্ণতা বর্ণনা করা হয়েছে, যারা আল্লাহর বিশেষ নৈকট্যপ্রাপ্ত উপাধি ‘ইবাদুর রহমান’ (দয়াময়ের বান্দাগণ)-এ ভূষিত।
এই বারোটি গুণাবলি মুমিনের নৈতিক উৎকর্ষকে তুলে ধরে। ইবাদুর রহমানেরা নম্রভাবে পৃথিবীতে চলাফেরা করেন এবং অজ্ঞরা সম্বোধন করলে শান্তির কথা বলেন, যা তাদের সামাজিক ভদ্রতা ও বিনয় নির্দেশ করে। তাদের আধ্যাত্মিক জীবনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো তাহাজ্জুদ বা রবের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে রাত কাটানো এবং সর্বদা জাহান্নামের শাস্তি থেকে মুক্তি চেয়ে দোয়া করা। তাদের অর্থনৈতিক জীবন ব্যয়ে মধ্যপন্থা অবলম্বন দ্বারা চিহ্নিত, যেখানে অপচয় ও কার্পণ্য- উভয়ই বর্জিত।
এই বান্দাদের চরিত্র যে তিনটির ওপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত তা হলো- তিনটি মৌলিক পাপ বর্জন: শিরক, হত্যা ও ব্যভিচার (জিনা)। এই তিনটি পাপকে একত্রে উল্লেখ করার মাধ্যমে বোঝা যায় যে, এগুলো চরম নৈতিক ও তাত্ত্বিক বিচ্যুতি। এছাড়াও, তারা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয় না এবং অনর্থক বিষয়ের পাশ দিয়ে ভদ্রভাবে চলে যায়। তাদের বৌদ্ধিক গুণ হলো, তারা কোরআনের আয়াতসমূহের প্রতি বধির বা অন্ধের মতো আচরণ করে না। সর্বশেষে, তারা কেবল নিজেদের জন্য নয়, বরং স্ত্রী-সন্তানাদির জন্য চোখের শীতলতা কামনা করে এবং মুত্তাকিদের নেতা হওয়ার দোয়া করে।
ঈমানের গভীরতা ও নৈতিক সংশোধন : কোরআন মোমিনদের অন্যান্য উপাধির মাধ্যমে আরও বৈশিষ্ট্যযুক্ত করেছে। সুরা আনফালে (আয়াত, ২-৪) ‘আল-মোমিনুন হাক্কান’ (প্রকৃত মুমিন)-এর পাঁচটি গুণ বর্ণিত, যা ঈমানের অভ্যন্তরীণ সংবেদনশীলতা তুলে ধরে: আল্লাহকে স্মরণ করলে অন্তর কেঁপে ওঠে, কোরআন শ্রবণে ঈমান বৃদ্ধি পায় এবং তারা রবের ওপর ভরসা করে। এই অভ্যন্তরীণ অনুভূতিই তাদের সালাত কায়েম ও রিজিক থেকে ব্যয় করতে চালিত করে।
অন্যদিকে, সুরা আলে ইমরানে (আয়াত, ১৩৩-১৩৬)-‘আল-মুত্তাকিন’ (খোদাভীরুদের) পাঁচটি নৈতিক ও সংশোধনমূলক বৈশিষ্ট্য দেওয়া হয়েছে। তারা সচ্ছলতা ও অভাবের সময় ব্যয় করে, গোস্বা সংবরণ করে এবং মানুষকে ক্ষমা প্রদর্শন করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, গুনাহ হয়ে গেলে তারা অবিলম্বে তওবা করে এবং জেনেশুনে পাপের ওপর লেগে থাকে না, যা তাদের আত্মণ্ডসংশোধনমূলক প্রক্রিয়াকে নিশ্চিত করে।
কোরআনের এই গুণাবলির পূর্ণাঙ্গ চিত্রটি প্রমাণ করে যে, মোমিনের সাফল্য কোনো একক গুণের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং এটি আধ্যাত্মিক ভিত্তি (খুশু ও আল্লাহর ভয়), ব্যক্তিগত নৈতিকতা (পবিত্রতা ও লাঘব বর্জন) এবং সামাজিক দায়িত্ব (আমানত, ইনফাক ও ক্ষমা)- এই তিনটি স্তম্ভের সমন্বিত জীবনধারার ওপর প্রতিষ্ঠিত। হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) এই গুণাবলিকে আরও সহজ করে বলেছেন, ‘আল্লাহভীতি, সদাচার ও উত্তম চরিত্রই’ মানুষকে জান্নাতে প্রবেশে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করবে। এই কোরআনিক পথনির্দেশনাই মোমিনদের জন্য চূড়ান্ত বিজয় লাভের একমাত্র সুনিশ্চিত মানদ-।
