একটি খুন ও গাভি নিয়ে বনি ইসরাইলের বাড়াবাড়ি

রায়হান রাশেদ

প্রকাশ : ২২ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

বনি ইসরায়েলে ‘আমিল’ নামে এক ধনী লোক ছিল। তার সন্তান ছিল না। উত্তরাধিকারী ছিল এক ভাতিজা। ভাতিজা ছিল লোভী। সে দীর্ঘদিন চাচার মৃত্যুর অপেক্ষায় ছিল। চাচার মৃত্যু কামনা করছিল। কিন্তু তার কাঙ্ক্ষিত সময়ে চাচার মৃত্যু হচ্ছিল না। এক রাতে চাচা খুন হলো। গ্রামের অন্য পাড়ার এক লোকের দরজায় লাশ পাওয়া গেল। সকালে ওই লোকের ওপর হত্যার অপবাদ পড়ল। ভাতিজা মনে মনে বেশ সুখ পাচ্ছিল, চাচার সম্পদের সঙ্গে সঙ্গে ওই গ্রাম থেকে রক্তপণও উসুল করা যাবে। (তাফসিরে মারিফুল কোরআন, মাওলানা ইদরিস কান্ধলভি, অনুবাদ : মাওলানা মু. অছিউর রহমান, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২৯৪)।

ওই লোক হত্যার কথা অস্বীকার করল। পাড়ার লোকেরাও তার পক্ষ নিল। দুই দলের মধ্যে বিবাদ বেঁধে গেল। বিচার আসে মুসা (আ.)-এর কাছে। মুসা (আ.) ওই পাড়ার লোকদের জিজ্ঞেস করলেন। তারা শপথ করে বলল, ‘আল্লাহর কসম, আমরা হত্যা করেনি। হত্যাকারী সম্পর্কে কিছুই জানি না। হে আল্লাহর নবী, আপনি প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের জন্য আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করুন।’ (তাফসিরে ইবনে কাসির)।

আল্লাহর নির্দেশে মুসা (আ.) তাদের একটি গাভি জবাইয়ের কথা জানালেন। বললেন, জবাইকৃত গাভির গোশত নিহত ব্যক্তির দেহ স্পর্শ করলে নিহিত ব্যক্তি জীবিত হবে। বলে দেবে হত্যাকারীর নাম ও ঠিকানা।

তারা ব্যাপারটাকে ঠাট্টা মনে করল। বলল, গরু জবাই ও হত্যাকারীর খোঁজ পাওয়ার মাঝে সম্পর্ক কি?

মুসা (আ.) বললেন, আমি মূর্খদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই। এটা শুনে তারা বুঝল, এ বিধান আল্লাহর পক্ষ থেকে। এটি পালন করতেই হবে। তারা নবীর কথা মেনে নিল। তারা বলল, আপনি প্রতিপালকের কাছে আবেদন করুন, তিনি যেন গাভিটির রূপ বিশ্লেষণ করে দেন। মুসা নবী বললেন, ‘সাধারণ গরু- ভিন্ন কোনো জাতের নয়, এর আলাদা কোনো বিশেষণ নেই। অবশ্য বয়সের হিসাবে কিছুটা পার্থক্য হবে- বৃদ্ধও নয়, কুমারীও নয়- মধ্যবয়সের হবে। এবার কাজটি করো।’

তাদের দ্বিধা কাটে না। তারা জানতে চায়, গাভির রঙ কেমন হবে। মুসা নবী বললেন, হলুদ বর্ণের গরু, তার রঙ উজ্জ্বল গাঢ়- দর্শকদের আকর্ষণ করে, দেখতে ভালো লাগে। এরপরও তাদের সংশয় দূর হয় না। জানতে চায়, গরুর বেশিষ্ট্য কেমন, কোন প্রকারের গরু? আমাদের কাছে গরুর বিষয়টি এখনো পরিষ্কার নয়। আল্লাহ যেসব গুণের কথা বলেছেন, এমন অনেক গরু আছে। তাই এমন কিছু বলুন, যা দিয়ে আমরা সুনিশ্চিতভাবে বুঝতে পারব, আল্লাহ এ গরুটি জবাইয়ের কথা বলেছেন। আল্লাহ ইচ্ছা করলে আমরা অবশ্যই সঠিক গরুটি খুঁজে পাব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যদি তারা ইনশাআল্লাহ না বলত, তাহলে কখনোই তারা সঠিক সমাধানে পৌঁছতে পারত না। (তাফসিরে ইবনে আবি হাতেম, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২২৩)।

মুসা (আ.) এবার গরুর ব্যাপারে আরও বিস্তারিত বললেন। জানালেন, এ গরু পরিশ্রমী নয়- জমি কর্ষণ বা সেচ কাজে ব্যবহার হয়নি। সেটি ত্রুটিহীন ও নিখুঁত। তারা বলল, এবার আপনি সুস্পষ্ট ও বিস্তারিতভাবে বলেছেন। আমাদের সন্দেহ দূর হয়েছে। এমন গরু আমরা খুঁজে আনব। সুরা বাকারার ৬৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যায় তাফসিরবিদরা বলেছেন, শুরুতে তারা যেকোনো একটি গরু জবাই করলেই হয়ে যেত। তারা প্রশ্ন করে বিষয়টি জটিল করে তুলেছে। ফলে এত নিখুঁত বৈশিষ্ট্যের গাভি পাওয়া তাদের জন্য মুশকিল হয়ে গেল।

এই ঘটনা সম্পর্কে তাফসিরে ইবনে কাসিরে বলা হয়েছে, ‘কোরবানি করার জন্য গাভি সম্পর্কে এত বিবরণ গ্রহণ করা সত্ত্বেও ইহুদিদের গাভি কোরবানি করার কোনো প্রকার ইচ্ছা ছিল না। কোরআনের এই অংশে ইহুদিদের তাদের আচরণের জন্য সমালোচনা করা হয়েছে। কেননা তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল তাদের অহেতুক একগুঁয়েমি ও অবাধ্যতাকে বজায় রাখা এবং এ কারণেই তারা গাভি কোরবানি করতে বিরত থাকার প্রয়াস চালিয়েছিল।’

তারা আল্লাহ বিশ্বাসী ও মা ভক্ত এক যুবকের কাছে বর্ণনাকৃত গাভিটি পেল। এমন গরু অন্য কারও কাছে ছিল না। যুবকের চাহিদা মতো গরুর চামড়াপূর্ণ স্বর্ণের দামে তারা কিনল। তাফসিরে ইবনে কাসির, হাফেজ ইমাদুদ্দিন ইবনে কাসির, অনুবাদ : ড. মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২৮৬)। তাফসিরে আবদ বিন হামিদে আছে, ওই সবগুণ বিশিষ্ট গরুটি এক সাধারণ বৃদ্ধার কাছে পাওয়া গেল। বৃদ্ধার কয়েকটি পিতৃহীন সন্তান ছিল। বৃদ্ধা ঘটনা জানতে পেরে খুব বেশি মূল্য চাইল গরুর। লোকেরা মুসা (আ.)-কে বলল, অমুক বৃদ্ধার কাছেই ওরকম গরু আছে। কিন্তু সে অত্যন্ত বেশি মূল্য চাচ্ছে। মুসা (আ.) বললেন, আল্লাহ তোমাদের ওপর হাল্কা করেছিলেন, কিন্তু তোমরা নিজেদের জীবনের ওপর ভারী করে নিয়েছ। সে যা চায়, তা দিয়ে কিনে নাও। (তাফসিরে ইবনে কাসির, হাফেজ ইমাদুদ্দিন ইবনে কাসির, অনুবাদ : ড. মুহাম্মদ মুজীবুর রহমান, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২৮৭)। তারা গাভিটি জবাই করল। আল্লাহর নির্দেশ মতো মাংসের একটি অংশ খুন হওয়া মানুষটির দেহে স্পর্শ করানো হলো। মৃত মানুষটি জীবিত হয়ে খুনির নাম বলে সটান পড়ে গিয়ে মারা গেল। (তাফসিরে মারিফুল কোরআন, মাওলানা ইদরিস কান্ধলভি, অনুবাদ : মাওলানা মু. অছিউর রহমান, খণ্ড : ১, পৃষ্ঠা : ২৯৭)।

দেখা গেল, যে মানুষটি বিচার নিয়ে গিয়েছিলেন, সেই ছিল প্রকৃত খুনি। পবিত্র কোরআনে ঘটনার বিবরণ এসেছে এভাবে- ‘স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন মুসা তার সম্প্রদায়কে বলেছিল, আল্লাহ তোমাদের একটি গরু জবাইয়ের আদেশ দিয়েছেন। তারা বলেছিল, তুমি কি আমাদের সঙ্গে ঠাট্টা করছ? মুসা বলল, আল্লাহর শরণাপন্ন হচ্ছি, যাতে আমি অজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত না হই। (অর্থাৎ, আমি বলছি যে, এটা কোনো বিদ্রূপ নয়।) তারা বলল, আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বল তা কীরূপ? মুসা বলল, আল্লাহ বলছেন, তা এমন গরু- যা বৃদ্ধও নয়, অল্পবয়স্কও নয়- মধ্যবয়সী। সুতরাং তোমরা যা আদিষ্ট হয়েছে তা করো। তারা বলল, আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বলো তার রং কী? মুসা বলল, আল্লাহ বলছেন, তা হলুদ বর্ণের গরু, তার রং উজ্জ্বল গাঢ়, যা দর্শকদেরকে আনন্দ দেয়। তারা বলল, আমাদের জন্য তোমার প্রতিপালককে স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিতে বলো তা কোন্টি? আমরা গরুটি সম্পর্কে সন্দেহে পতিত হয়েছি এবং আল্লাহ ইচ্ছা করলে নিশ্চয় আমরা দিশা পাব। মুসা বলল, তিনি বলছেন, তা এমন গরু যা জমি-চাষে ও খেতে পানি সেচের জন্য ব্যবহৃত হয়নি- সুস্থ, নিখুঁত। তারা বলল, “এখন তুমি সত্য এনেছ। যদিও তারা জবাই করতে উদ্যত ছিল না তবুও তারা ওটাকে জবাই করল। স্মরণ করো (সেই সময়ের কথা,) যখন তোমরা এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে এবং একে অন্যের প্রতি দোষারোপ করছিলে- তোমরা যা গোপন রাখছিলে আল্লাহ তা ব্যক্ত করছেন। আমি বললাম, এর (জবাইকৃত গরুর) কোনো অংশ দ্বারা ওকে (মৃত ব্যক্তিকে) আঘাত করো। (তাতেই নিহত ব্যক্তি জীবিত হয়ে তার হত্যাকারীর নাম বলে দেবে।) এইভাবে আল্লাহ মৃতকে জীবিত করেন এবং তাঁর নিদর্শন তোমাদেরকে দেখিয়ে থাকেন, যাতে তোমরা অনুধাবন করতে পারো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত : ৬৭-৭৩)।