মসজিদে নববিতে জুমার খুতবা
দেহ ও মনের রোজা
শায়খ ড. সালাহ বিন মুহাম্মাদ আল বুদাইর
প্রকাশ : ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

উজ্জ্বল অতিথি ও সৌরভময় মাস। এর ফজিলত স্পষ্ট, কল্যাণে পরিপূর্ণ। তাই আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করো যে, তিনি তোমাদের এই মাস পর্যন্ত পৌঁছার সুযোগ দিয়েছেন। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো যে, তিনি তোমাদের জীবন বাড়িয়ে এই মাস পাওয়ার তৌফিক দিয়েছেন। কত মানুষ এই মাস পাওয়ার আশা করেছিল; কিন্তু পায়নি, কতজন তা পাওয়ার স্বপ্ন দেখেছিল কিন্তু আর জীবিত থাকেনি। রমজানের চাঁদ উদিত হয়েছে। কিন্তু আমাদের কত প্রিয় মানুষ আজ আর নেই! কত আপনজনকে আমরা কবরে শুইয়ে এসেছি! কত প্রিয়জনকে দাফন করেছি! তাই ভাই-বন্ধুদের বিদায় থেকে শিক্ষা নাও। তাদের চলে যাওয়া আমাদের জন্য উপদেশ, স্মরণ ও সতর্কবার্তা। দ্রুত তওবা করো, সৎকাজে এগিয়ে যাও- এর আগে যে, সময় আসবে যখন আর তওবা কবুল হবে না, ভুল সংশোধনের সুযোগ থাকবে না, আর কোনো সম্পদ দিয়ে নিজেকে রক্ষা করা যাবে না। এই মাসে তোমাদের আমল দিয়ে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করো। পরিশ্রম ও আন্তরিকতার মাধ্যমেই সফলতা আসে। দৃঢ়সংকল্প থাকলেই মানুষ এগিয়ে যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানে অন্য সময়ের চেয়ে বেশি ইবাদত করতেন।
রমজান কবুলিয়তের ও সৌভাগ্যের মাস। এটি মুক্তির ও দানের মাস। এটি উন্নতি ও মর্যাদা লাভের সময়। যদি তুমি সত্যিই চেষ্টা করতে চাও, তবে এটি চেষ্টা করার সময়। যদি ইবাদতের জন্য প্রস্তুত থাকো, তবে এটাই সেই সময়। কবুলিয়তের হাওয়া বইছে, কল্যাণের ধারা প্রবাহিত হচ্ছে, শয়তান পরাজিত, সৎকাজের দরজা খোলা তাদের জন্য যারা তা চায়। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজান এলে জান্নাতের দরজাগুলো খুলে দেওয়া হয়, জাহান্নামের দরজাগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং শয়তানদের শৃঙ্খলাবদ্ধ করা হয়।’ (মুসলিম : ২৩৮৫)। আল্লাহর রাসুল (সা.) আরও বলেন, ‘ রমজানের প্রথম রাত এলে শয়তান ও অবাধ্য জিনদের বন্দি করা হয়। জাহান্নামের দরজা বন্ধ করা হয়, কোনো দরজা খোলা থাকে না। জান্নাতের দরজা খুলে দেওয়া হয়- কোনো দরজা বন্ধ থাকে না। একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করে: ‘হে কল্যাণের অনুসন্ধানকারী, এগিয়ে এসো! হে অকল্যাণের অনুসন্ধানকারী, থেমে যাও!’ এবং আল্লাহ প্রত্যেক রাতে অনেক মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।’ (ইবনে মাজাহ : ১৬৪২)।
হে পাপের বন্দি, হে লজ্জার কারাবন্দি! এ মাসে বন্দিদের মুক্তি দেওয়া হয়, অপরাধীদের ক্ষমা করা হয়, গোনাহগারদের মাফ করা হয়। তাই সুযোগ গ্রহণ করো, সময় নষ্ট করো না। এমন হয়ো না যে, রমজান চলে গেল, আর তুমি কিছুই অর্জন করতে পারলে না। হে রোজাদার! তুমি পথের ধুলা, ময়দা ছাঁকানো, লালা গিলে ফেলা- এসব ছোটখাটো বিষয় রোজা ভাঙে কি না তা জানতে চাও; কিন্তু বড় বড় গোনাহ থেকে বাঁচার ব্যাপারে উদাসীন থাকো! বড় পাপ ও অশ্লীলতা থেকে নিজেকে বাঁচাও। তোমার মুসলিম ভাইয়ের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভক্ষণ করা থেকে বাঁচো। তার সম্মান নষ্ট করা, প্রতারণা করা, জুলুম করা ও ঠকানো থেকে দূরে থাকো। যে ব্যক্তি রমজানের দিনে খাওয়া-দাওয়া থেকে বিরত থাকে কিন্তু নিজের সন্তানদের অবহেলা করে, তাদের মায়ের কাছে ফেলে রাখে- না খোঁজ নেয়, না ভরণপোষণ দেয়, না মমতা দেখায়- সে কি সত্যিই রোজা রেখেছে?
যে মা নিজের সন্তানদের তাদের বাবার সঙ্গে দেখা করতে দেয় না, বরং অবাধ্যতা ও অসভ্যতার দিকে উৎসাহিত করে, সে কি রোজা রেখেছে? আর যে বাবা নিজের সন্তানদের তাদের মায়ের সঙ্গে দেখা করতে বাধা দেয়, অথচ মা-ই তাদের জীবনের প্রশান্তি, যার স্নেহ ও ভালোবাসা তাদের জীবনের প্রয়োজন, সে কি রোজা রেখেছে? যে স্বামী-স্ত্রীর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় রাখে- না স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করে, না তালাক দেয়- সে কি রোজা রেখেছে? আর যে ব্যক্তি বাবা-মায়ের অবাধ্য হয়, তাদের ছেড়ে দেয়, তাদের সেবা করতে বিরক্ত হয়, কিছু চাইলে কৃপণতা করে, উপদেশ দিলে রাগ করে, আশা করলে নিরাশ করে, ডাকলে এড়িয়ে যায়, যে শুধু কঠোর ভাষায় কথা বলে, ভয়ে ছাড়া কিছু দেয় না, আর সবকিছু ‘পরে করব’ বলে ফেলে রাখে, সে কি সত্যিই রোজা রেখেছে?
যে ব্যক্তি ফরজ নামাজ আদায় না করে ঘুমিয়ে থাকে, নামাজের সময় পার করে দেয়, যোহর ও আসর নামাজ সময় শেষ হওয়ার পরে পড়ে, আর রমজানের পুরো মাসজুড়ে এ অভ্যাস চালিয়ে যায়, সে কি সত্যিই রোজা রেখেছে? যে নিজের ভাই-বোনদের উত্তরাধিকার আত্মসাৎ করে, দুর্বল, এতিম ও গরিবদের অধিকার কেড়ে নেয়, ওয়াকফের সম্পদ দখল করে নেয় এবং প্রকৃত হকদারদের বঞ্চিত করে, সে কি রোজা রেখেছে? হ্যাঁ, সে এমন রোজা রেখেছে যা বাহ্যিকভাবে আদায় হয়ে যায় ও ফরজ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়। কিন্তু সেই রোজা মিথ্যা, পাপ ও জুলুমে কলুষিত; বড় বড় গোনাহর সঙ্গে জড়িত। এমনও হতে পারে, তার জুলুম ও অপরাধের গোনাহ তার রোজার সওয়াবকে ঢেকে ফেলবে।
তাই যারা রোজার সময় খাবার-দাবার থেকে বিরত থেকেছ; কিন্তু সেই কাজগুলো করেছ যা সবসময়ই মুসলমানের জন্য হারাম, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। কবি বলেছেন, ‘হে তুমি, যে খাবার থেকে রোজা রেখেছ, যদি তুমি জুলুম থেকেও রোজা রাখতে কতইনা ভালো হতো। একজন জালিম মানুষের জন্য রোজা কি উপকার করবে, যার অন্তর পাপে ভরা?’
হে যারা হারাম জিনিসের দিকে চোখ মেলে তাকাও! তোমরা এখন সেরা মাসে অবস্থান করছো। সাবধান! এই মাসের পবিত্রতা নষ্ট করো না, এর মর্যাদা কলঙ্কিত করো না, এর সম্মান কমিয়ে দিও না। আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা বলা ও সেই অনুযায়ী কাজ করা পরিত্যাগ করে না, তার খাবার ও পানীয় ত্যাগ করার আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।’ (বোখারি : ১৯০৩)। জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রা.) বলেছেন, ‘তুমি যখন রোজা রাখবে, তখন তোমার কান, চোখ ও জিহ্বাও যেন মিথ্যা ও হারাম কাজ থেকে রোজা রাখে। তোমার অধীনস্থ বা কর্মচারীকে কষ্ট দিও না। রোজার দিনে তোমার মধ্যে মর্যাদা ও শান্তভাব থাকা উচিত। রোজার দিন আর রোজা না থাকার দিন যেন একরকম না হয়।’
আবু হুরাইরা (রা.) আরও বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘অনেক রোজাদার আছে, যারা তাদের রোজা থেকে শুধু ক্ষুধা ও তৃষ্ণাই পায়। আর অনেক রাত জাগা ইবাদতকারী আছে, যারা তাদের কিয়াম থেকে শুধু জাগরণই পায়।’ (মুসনাদে আহমাদ : ৮৫০১)
(০৩-০৯-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ২০-০২-২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস- আবদুল কাইয়ুম শেখ)
