মসজিদে নববিতে জুমার খুতবা

চাকরি : ইবাদত, আমানত ও দায়িত্ব

শায়খ ড. আবদুল বারি বিন ইওয়াজ আস সুবাইতি

প্রকাশ : ০৫ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমি নিজেকে ও তোমাদেরকে আল্লাহর ভয় অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি। আল্লাহর ভয়ের মাধ্যমে হৃদয় শুদ্ধ হয়, কাজ সঠিক হয় ও মানুষ মুক্তি লাভ করে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় কর এবং তোমরা আত্মসমর্পণকারী না হয়ে কোনো অবস্থায় মৃত্যুবরণ কর না।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত : ১০২)

চাকরি বা কর্মজীবন একটি নিয়মিত কাজ, যেখানে একজন মানুষ তার জীবনের বড় একটি সময় কাটায়। প্রতিদিন সকালে কাজে যায় ও সন্ধ্যায় ফিরে আসে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এটি কখনও কখনও একঘেয়ে অভ্যাসে পরিণত হতে পারে; মাঝে মধ্যে ক্লান্তি আসে, আবার কখনও অলসতাও ভর করে। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিতে চাকরির গুরুত্ব ভিন্ন। যখন একজন কর্মী এই ভাবনা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হয় যে, সে ইবাদতের এক ময়দানে যাচ্ছে, তখন তার কাজের সময় আনন্দময় হয়ে ওঠে। তার সাফল্য তাকে সুখ দেয়, তার পরিশ্রম আল্লাহর নৈকট্য লাভের উপায় হয়, আর কাজের প্রতিটি ঘণ্টা সওয়াবের পুঁজি হয়ে যায়। কাজে নিষ্ঠা ও দক্ষতার মাধ্যমে মানুষ ইবাদতের উচ্চতায় পৌঁছ। তার মন প্রশান্ত হয়, উদ্যম বাড়ে এবং সে তার সর্বোচ্চটা দেওয়ার চেষ্টা করে। মানুষের প্রয়োজন পূরণ করতে সে কষ্ট নয়, বরং আনন্দ অনুভব করে। কারণ সে মানুষের আগে আল্লাহর জন্য কাজ করে। যে ব্যক্তি তার কাজে আল্লাহকে স্মরণ রাখে, তার কাজ মর্যাদা পায় ও তার প্রচেষ্টায় বরকত লাভ হয়।

ছোট-বড় প্রতিটি কাজ দেশ ও জাতি গঠনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দায়ি তার মিম্বারে, শিক্ষক তার শ্রেণিকক্ষে, ডাক্তার তার চেম্বারে, প্রকৌশলী তার নির্মাণকাজে, নিরাপত্তাকর্মী তার দায়িত্বস্থলে ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা তার দপ্তরে ভূমিকা পালন করে ও দায়িত্ব বহন করে। তাদের মাধ্যমেই সমাজ এগিয়ে যায়, উন্নয়ন বৃদ্ধি পায়, কাঠামো মজবুত হয় ও জীবন স্থিতিশীল হয়। চাকরি শুধু উপস্থিতি দিয়ে দায়িত্ব শেষ করার বিষয় নয়; এটি একটি আমানত ও বড় দায়িত্ব, যার জন্য কিয়ামতের দিন জবাবদিহি করতে হবে। অফিসের সময় আমানত, কাজের ঘণ্টাগুলো আমানত, মানুষের সঙ্গে আচরণ আমানত, তাদের গোপনীয়তা আমানত এবং তাদের প্রয়োজন পূরণ করাও আমানত। যে ব্যক্তি এই আমানতের মর্যাদা ও দায়িত্বের গুরুত্ব অনুভব করে, সে মানুষের কাজ আটকে রাখে না, সেবা দিতে গড়িমসি করে না এবং কাজ করে দিতে অযথা বিলম্ব করে না। তার জীবন্ত বিবেক ও আল্লাহভীতি সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে ও প্রত্যেকের প্রাপ্য অধিকার দিতে তাকে উদ্বুদ্ধ করে। চাকরি হলো মানুষের সেবা করা। এটি বড় সম্মানের বিষয়। এটি আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় কাজগুলোর একটি। বিশ্বনবী মুহাম্মাদ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় মানুষ সে, যে মানুষের সবচেয়ে বেশি উপকার করে।’ (তাবারানি)। মানুষ যখন এমন উপকারের অবস্থানে থাকে যা শুধু নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বৃহত্তর ক্ষেত্র জুড়ে বিস্তৃত হয়, তখন তার সওয়াব বেড়ে যায় ও আমলের পাল্লা ভারী হয়। শিক্ষক যখন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দেন, তখন তিনি একটি প্রজন্ম গড়ে তোলেন। প্রকৌশলী যখন উন্নয়ন করেন, তখন জীবন সহজ করেন। ডাক্তার যখন চিকিৎসা দেন, তখন আশা জাগান ও কষ্ট কমান। প্রশাসনিক কর্মকর্তা যখন মানুষের কাজ সহজ করেন, তখন তাদের দুর্ভোগ লাঘব করেন। আর নিরাপত্তাকর্মী তার অবস্থানে থেকে দেশ রক্ষা করেন ও জাতিকে নিরাপদ রাখেন। মানুষকে সাহায্য করার প্রতিটি মুহূর্ত এবং তাদের প্রয়োজন পূরণে করা প্রতিটি চেষ্টা একেকটি গোপন ইবাদত। এগুলো তোমার আমলনামায় লেখা হয়, আখেরাতের পাল্লায় যোগ হয়। সেখানে কোনো ভালো কাজ নষ্ট হয় না, কোনো পরিশ্রম অদৃশ্য থাকে না ও কোনো সদাচরণ ভুলে যাওয়া হয় না।

আল্লাহর চিরন্তন নিয়মগুলোর একটি হলো, মানুষ যেমনভাবে অন্যদের সঙ্গে আচরণ করে, আল্লাহও তার সঙ্গে তেমন আচরণ করেন। কাজের ফল কাজের মতোই হয়। যে মানুষের জন্য সহজ করে দেয়, আল্লাহ তার জন্য সহজ করে দেন। যে বিপদগ্রস্তকে সাহায্য করে, আল্লাহ তাকে সাহায্য করেন। যে দুর্বল বা কষ্টে থাকা মানুষের প্রতি দয়া করে, আল্লাহ তার ওপর দয়া করেন। যদিও আসল প্রতিদান আখেরাতে দেওয়া হবে, তবুও এর সুসংবাদ দুনিয়াতেই পাওয়া যায়। হৃদয়ে শান্তি, সন্তান ও স্বাস্থ্যে বরকত, কাজে সফলতা ও জীবনের শেষে উত্তম পরিণতি। এই বরকতের সবচেয়ে স্পষ্ট ও দৈনন্দিন জীবনের কাছাকাছি উদাহরণ হলো, হালাল খাবার ও রিজিকের বৃদ্ধি। যে কর্মচারী তার কাজের সময় হালাল উপার্জনের ব্যাপারে সতর্ক থাকে, সে জানে তার পরিবারের জন্য আনা খাবার সততার ঘামে অর্জিত; তাই তা আল্লাহর হেফাজত ও রহমত পাওয়ার যোগ্য হয়। যেমন কাজ নিজেই একটি ইবাদত, তেমনি হারাম বা অবহেলা থেকে কাজকে রক্ষা করাও সেই ইবাদতের পূর্ণতা। এর মাধ্যমে জীবন সুন্দর হয়, দোয়া কবুল হয় এবং অল্পের মধ্যেও সন্তুষ্টি আসে।

অন্যদিকে, যে ব্যক্তি লোকদের কাজ অযথা আটকে রেখে বা কঠোর আচরণ করে তাদের কষ্ট দেয়, আল্লাহও তাকে কষ্টে ফেলেন। এটি আল্লাহর নিয়ম, আর তাঁর নিয়ম কাউকে পক্ষপাত করে না। মহানবী (সা.) দোয়া করে বলেছেন, ‘হে আল্লাহ, আমার উম্মতের যে ব্যক্তি কোনো দায়িত্ব পেয়ে মানুষকে কষ্ট দেয়, তুমি তাকে কষ্ট দাও; আর যে তাদের প্রতি কোমল আচরণ করে, তুমি তার প্রতি কোমল হও।’ (মুসলিম : ৪৬১৬)। যখন একজন কর্মচারী অনুভব করে যে, সে ইবাদতের মধ্যে আছে, তখন সে সুন্দর ধৈর্য ধারণ করে, ফলে মানুষের প্রয়োজন পূরণের জন্য তার মন উদার হয়। সে কোমল আচরণ গ্রহণ করে যা কাজকে সুন্দর ও সঠিক করে। এটি প্রকাশ পায় হাসিমুখে, ভালো কথায়, মনোযোগ দিয়ে শোনায়, কাজ সহজ করে দেওয়ায় এবং বয়স্ক, অভাবী বা বিপদগ্রস্ত মানুষের অবস্থার প্রতি খেয়াল রাখায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কানো কাজে নম্রতা থাকলে তা সুন্দর হয়, আর নম্রতা না থাকলে তা খারাপ হয়ে যায়।’ (মুসলিম : ৬৪৯৬)।

এরপর আসে বিনয়, যা প্রকৃত মর্যাদা ও এমন উচ্চতা, যা চোখে দেখার আগেই মানুষের হৃদয়ে অনুভূত হয়। বিনয়ী কর্মচারী পদমর্যাদাকে মানুষের সেবা করার উপায় মনে করে, অহংকার করার মঞ্চ নয়। সে বড়-ছোট বা ধনী-গরিব কারও মধ্যে পার্থক্য করে না। এটাই ছিল নবী (সা.)-এর আদর্শ। মানুষের মধ্যে সর্বোচ্চ মর্যাদার অধিকারী হয়েও তিনি ছিলেন সবচেয়ে নম্র। তিনি বিধবা ও দরিদ্র মানুষের সঙ্গে হাঁটতেন, তাদের প্রয়োজন পূরণ করতেন ও সবার সেবা করতেন। মহান আল্লাহ বলেন, ‘রহমানের বান্দা তারাই, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে এবং তাদেরকে যখন অজ্ঞ ব্যক্তিরা সম্বোধন করে, তখন তারা বলে, ‘সালাম’।’ (সুরা ফুরকান : ৬৩)।

সুতরাং প্রত্যেক কর্মচারীর জানা উচিত যে, চাকরির জীবন শুধু কয়েকটি দিন নয় যা চলে যায় ও ভুলে যায়; বরং এটি একটি লিখিত পৃষ্ঠা, একটি সংরক্ষিত আমলনামা, যা আল্লাহর সামনে সাক্ষাতের দিন তার অপেক্ষায় থাকবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কেউ অণু পরিমাণ সৎকর্ম করলে সে তা দেখবে। অনুরূপভাবে কেউ অণু পরিমাণ অসৎকর্ম করলে সে তাও দেখতে পাবে।’ (সুরা জিলজাল : ৭-৮)।

(১১-০৮-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ৩০-০১-২০২৬ খ্রিষ্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস- আবদুল কাইয়ুম শেখ)