মসজিদে নববিতে জুমার খুতবা

চেষ্টার বৈচিত্র্য ও এর পরিণাম

শায়খ ড. আবদুল বারি বিন ইওয়াজ আস সুবাইতি

প্রকাশ : ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

যদি তুমি জীবনের চলাচল গভীরভাবে লক্ষ্য করো, তাহলে দেখবে সব মানুষই ছুটে চলছে; প্রায় কেউই স্থির নয়, কেউই কাজ থেকে বিরত থাকে না। কোরআন এই দৃশ্যটি স্পষ্ট করে বলেছে, ‘অবশ্যই তোমাদের কর্মপ্রচেষ্টা বিভিন্ন প্রকৃতির।’ (সুরা লাইল : ৪)। বাইরে থেকে মানুষের চেষ্টা এক রকম মনে হলেও, প্রকৃত বিচারে তা ভিন্ন; কারণ কাজগুলো মিল থাকলেও উদ্দেশ্য ভিন্ন। কেউ দুনিয়ার জন্য কাজ করে, কেউ আখেরাতের জন্য, আর কেউ এমনও আছে যে, সে চেষ্টা করে; কিন্তু জানেই না কেন করছে! হাতের কাজ একই হতে পারে; কিন্তু হৃদয়ের উদ্দেশ্য আসল পার্থক্য গড়ে দেয়; কারণ কাজের মর্যাদা বাড়ে উদ্দেশ্যের সততার মাধ্যমে।

ইসলামে ‘চেষ্টা’ শুধু নামাজ বা দৃশ্যমান ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি আরও ব্যাপক ও সর্বব্যাপী। মানুষের পুরো জীবনই এর অন্তর্ভুক্ত যে, তার কাজ, তার ঘর, তার ব্যবসা, তার শিক্ষা, তার সম্পর্ক ও তার সিদ্ধান্ত এর অংশ। শিক্ষক চেষ্টা করছে, ব্যবসায়ী চেষ্টা করছে, ডাক্তার চেষ্টা করছে, পরিবারের কর্তা চেষ্টা করছে। এদের প্রত্যেকেই হয় আল্লাহর দিকে এগোচ্ছে, নয়তো তাঁর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। এখানেই সেই মূলনীতি স্পষ্ট হয়, যা এই বিস্তৃত চেষ্টাকে নিয়ন্ত্রণ করে- ‘প্রত্যেকের একটি দিক আছে, যেদিকে সে মুখ করে।’ (সুরা বাকারা : ১৪৮)।

কাজ একরকম হতে পারে; কিন্তু সেটাকে উন্নত বা অবনত করে তোলে হৃদয়ের উদ্দেশ্য। শিক্ষার ক্ষেত্রে দু’জন মানুষ শিখতে পারে; একজন উন্নত হয় কারণ তার উদ্দেশ্য ছিল সংশোধন, আর অন্যজন ক্ষতিগ্রস্ত হয় কারণ তার উদ্দেশ্য ছিল খ্যাতি। ব্যবসার ক্ষেত্রেও দু’জন ব্যবসা করতে পারে; একজন বরকত পায় কারণ সে হালাল ও মানুষের উপকার চেয়েছে, আর অন্যজন বঞ্চিত হয় কারণ তার লক্ষ্য ছিল শুধু উপার্জন। এইভাবে চেষ্টা দুই ভাগে বিভক্ত। প্রশংসনীয় চেষ্টা ও ব্যর্থ চেষ্টা।

প্রশংসনীয় চেষ্টা হলো, যা জীবনের সব ক্ষেত্রজুড়ে থাকে, কিন্তু আল্লাহর দিকে মুখ করে থাকে। দুনিয়ার কাজও যদি সৎ নিয়তে করা হয়, তা ইবাদতে পরিণত হয়; এর প্রভাব বরকতময় হয় ও তা বড় হয়ে ওঠে। শক্তি সঞ্চয়ের নিয়তে ঘুমানো ইবাদত, নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করা ইবাদত, পরিবারের জন্য ব্যয় করা নৈকট্য লাভের মাধ্যম, মানুষের প্রয়োজন পূরণে চেষ্টা করা উত্তম কাজ, পিতা-মাতার প্রতি সদ্ব্যবহার মর্যাদা বৃদ্ধি করে, সন্তানদের সঠিকভাবে গড়ে তোলা একটি আমানত, পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরানো সদকা, ভালো কথা বলা গঠনমূলক কাজ, মানুষের কষ্ট সহ্য করা এক গোপন ইবাদত, আর লেনদেনে ন্যায়পরায়ণতা একটি প্রকাশ্য ইবাদত। এসব তখনই ইবাদতে পরিণত হয়, যখন দিকনির্দেশ সঠিক থাকে; তখন দৈনন্দিন কাজও ইবাদত হয়ে যায়, সাধারণ কাজও হয়ে ওঠে নৈকট্যের মাধ্যম, আর ছোট কাজও বড় হয়ে যায়; কারণ, হৃদয় সঠিক দিকে থাকে ও নিয়ত সত্য হয়।

আর বিফল চেষ্টা হলো, যেখানে কষ্ট অনেক, কিন্তু নিয়ত অনুপস্থিত থাকে ও উদ্দেশ্য হারিয়ে যায়। মানুষ অনেক কাজ করে, কিন্তু জানে না কেন করছে! সে দিকভ্রষ্টভাবে চলতে থাকে; ফলে গন্তব্যে পৌঁছেও কিছু পায় না। কুরআন এ অবস্থাকে বর্ণনা করেছে, ‘যারা কুফরি করে তাদের কর্ম মরুভূমির মরীচিকাসদৃশ, পিপাসার্ত যাকে পানি মনে করে থাকে; কিন্তু সে এর নিকট উপস্থিত হলে দেখবে তা কিছু নয়।’ (সুরা নুর : ৩৯)। এখানে পরিশ্রম আছে, কিন্তু ফল নেই; কারণ উদ্দেশ্য আল্লাহ থেকে সরে গিয়ে চলে গেছে খ্যাতির পেছনে, বা প্রবৃত্তির অনুসরণে, বা মানুষের সন্তুষ্টি লাভের আশায়। ফলে বাহ্যিকভাবে চেষ্টা অনেক হলেও, তার প্রকৃত মূল্য খুবই কম।

দিন কেটে যায়, কাজ জমতে থাকে; কিন্তু মানুষ নিজেকে প্রশ্নই করে না যে, আমি কোথায় যাচ্ছি?! অবশেষে পথের শেষে গিয়ে সে বিস্মিত হয় যে, তার জীবন তো নষ্ট হয়ে গেছে সেই কাজে, যার জন্য তাকে সৃষ্টি করা হয়নি। মহান আল্লাহ বলেন, ‘এরাই তারা, ‘পার্থিব জীবনে যাদের প্রচেষ্টা প- হয়, যদিও তারা মনে করে যে, তারা সৎকর্মই করছে।’ (সুরা কাহাফ : ১০৪)।

এই আয়াতটি প্রত্যেক মানুষকে নিজের দিকে ফিরে তাকাতে আহ্বান করে যে, আমি যা করছি, তা কি সঠিক? তা কি সঠিক পথে আছে? আমি কি এটি আল্লাহর জন্য করছি, নাকি অন্য কিছুর জন্য? কোরআন এমন একটি মানদণ্ড স্থাপন করে, যা মানুষকে নিজের কাছে ফিরিয়ে এনে তাকে তার পূর্ণ দায়িত্বের মুখোমুখি দাঁড় করায়।

আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর এই যে, মানুষ তাই পায় যা সে করে। আর এই যে, তার কর্ম অচিরেই দেখান হবে।’ (সুরা নাজম : ৩৯-৪০)। কেউ তার কাজের বোঝা বহন করবে না, তার নাম বা অবস্থান তাকে কোনো উপকার দেবে না। আসলে সে যা সত্যিকার অর্থে অর্জন করেছে তা হলো তার নিজের করা চেষ্টা। একদিন সে তা নিজের সামনে উপস্থিত দেখতে পাবে; তখন তার কাজের সূক্ষ্ম অংশগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে প্রকাশ পাবে, তার নিয়তের গোপন দিকগুলোও উন্মোচিত হবে।

যখন এই সত্যটি হৃদয়ে স্থির হয়ে যায়, তখন চেষ্টা আর কোনো মূল্য রাখে না যদি তা আল্লাহর জন্য না হয়। এখানেই কোরআন গ্রহণযোগ্যতার পথ দেখায় যে, ‘যারা মোমিন হয়ে আখেরাত কামনা করে এবং এর জন্যে যথাযথ চেষ্টা করে তাদের প্রচেষ্টা পুরস্কারযোগ্য।’ (সুরা বনি ইসরাইল : ১৯)। যে আখেরাত কামনা করে, সে তার হৃদয়কে সঠিক করে, তার উদ্দেশ্য ঠিক করে শরীয়তের পথনির্দেশ অনুযায়ী নিয়মিতভাবে চেষ্টা করে। এমন লোকের মধ্যে এমন ঈমান থাকে, যা কাজকে জীবন্ত করে তোলে ও তার প্রভাবকে বরকতময় করে। তাদের চেষ্টা হবে স্বীকৃত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে গৃহীত হবে। এই চেষ্টা হবে গ্রহণযোগ্য, সংরক্ষিত ও বৃদ্ধি প্রাপ্ত; আল্লাহ তা প্রশংসা করেন ও তার জন্য বহুগুণ প্রতিদান দেন। এখানে ‘শুকরিয়া’ শুধু প্রশংসা নয়; বরং গ্রহণ, সম্মান, বরকত ও বৃদ্ধি। এমনকি সামান্য কাজও অনেক হয়ে যায়, আর ছোট কাজও মহান হয়ে ওঠে।

যখন একজন মুসলিম এই মহান অনুগ্রহকে উপলব্ধি করে ও দানের ব্যাপকতা বোঝে, তখন আসে এই ঐশী আহ্বান, ‘প্রত্যেকের একটি দিক আছে, যেদিকে সে মুখ করে। অতএব, তোমরা সৎকর্মে প্রতিযোগিতা কর।’ (সুরা বাকারা : ১৪৮)। এটি এমন এক আহ্বান, যা মুসলিমের হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে ও তার উদ্যমকে উসকে দেয়, যাতে সে তার জীবনকে প্রতিযোগিতার ময়দান বানায়; বরং তার পুরো জীবনকে আল্লাহর জন্য করে তোলে। তার কাজ, তার বিশ্রাম, তার উপার্জন ও তার দান হয় আল্লাহর জন্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বল, ‘আমার সালাত, আমার ইবাদত, আমার জীবন ও আমার মরণ জগতসমূহের প্রতিপালক আল্লাহরই উদ্দেশ্যে। তাঁর কোনো শরীক নেই।’ (সুরা আনআম: ১৬২-১৬৩)।

আর যখন মানুষের হৃদয় তার সমস্ত চেষ্টাসহ আল্লাহর দিকে সম্পূর্ণভাবে ফিরে যায়, তখন তার আত্মা পবিত্র হয়; হিংসার আগুন নিভে যায়, বিদ্বেষ দূর হয়ে যায়, সে তুচ্ছ প্রতিযোগিতা থেকে নিজেকে উঁচুতে তোলে। তখন সে ক্ষণস্থায়ী বিষয় নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে না; বরং তার আগ্রহ উন্নতি, নির্মাণ, সংশোধন ও উৎকর্ষের দিকে উঠে যায়। এরপর এই মনোভাব সমাজেও ছড়িয়ে পড়ে; মানুষের চেষ্টার লক্ষ্যগুলো উন্নত হয়, পরস্পরের সহযোগিতা বাড়ে, ঐক্য দৃঢ় হয়। ফলে শক্তিগুলো পরিণত হয় উপকারী দানে, প্রভাবশালী কাজে ও দীর্ঘস্থায়ী জনকল্যাণে। কারণ যখন হৃদয়গুলো এক দিকের অভিমুখে একত্রিত হয়, তখন সফলতা ও গ্রহণযোগ্যতার কারণগুলোও একত্রিত হয়ে যায়।

(০৭-১১-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ২৪-০৪-২০২৬ খ্রিস্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস - আবদুল কাইয়ুম শেখ)