মসজিদে নববিতে জুমার খুতবা
তাকওয়ার আলোকে হজের সফর
শায়খ ড. আবদুল বারি বিন ইওয়াজ আস সুবাইতি
প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমি তোমাদের ও নিজেকে তাকওয়া অবলম্বনের উপদেশ দিচ্ছি। এটিই হলো সেরা পাথেয়। এটিই মুক্তির পথ ও গ্রহণযোগ্যতার গোপন রহস্য। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে যথার্থভাবে ভয় করো এবং তোমরা আত্মসমর্পণকারী না হয়ে কোন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করো না।’ (সুরা আলে ইমরান : ১০২)।
এই বরকতময় সমাবেশ পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে এসেছে। তাদেরকে এনেছে সত্যিকারের আকাঙ্ক্ষা ও মহান আশা। তারা চায় এমন ক্ষমা, যা গুনাহ ধুয়ে দেবে; এমন মাগফিরাত, যা পাপ মুছে ফেলবে ও এমন রহমত, যা অন্তরকে প্রশান্ত করবে।
তারা এসেছে নিজেদের বোঝা নিয়ে, অন্তরে বহন করছে পাপ ও দুশ্চিন্তার ভার। তারা মহান রবের দিকে মুখ ফিরিয়েছে এমন অন্তর নিয়ে যা তাঁর দয়ার ওপর পূর্ণ বিশ্বাসী যে, তিনি কাউকে ফিরিয়ে দেন না, যে তাঁর দিকে আসে ও নিরাশ করেন না, যে তাঁর কাছে আশা রাখে। পবিত্রতার ময়দানে দাঁড়ানোর জন্য তারা দুনিয়ার কোলাহল ও চাকচিক্য পেছনে ফেলে এসেছে। আর যখন আশা সত্য হয়, তখন তা মানুষকে ক্ষমার স্থানে পৌঁছে দেয়।
হজের সফর শুধু পায়ের পদক্ষেপে বা কতগুলো আমল করা হলো তা দিয়ে মাপা হয় না; বরং হৃদয়ে কতটুকু তাকওয়া সৃষ্টি হলো, সেটিই আসল। সুতরাং সৌভাগ্য তার জন্য, যে সত্যতার সাথে এসেছে, আন্তরিকভাবে দোয়া করেছে, তার রবের সামনে সুন্দরভাবে দাঁড়িয়ে এই অবস্থানকে নতুন জীবনের সূচনা বানিয়েছে, যেখানে গোনাহের পাতা বন্ধ হয়ে যায়।
আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হজ করে এবং অশ্লীলতা ও গোনাহ থেকে বেঁচে থাকে, সে এমনভাবে ফিরে আসে, যেমন সে জন্মের দিন ছিল।’ (বোখারি : ১৫২১)।
হাজির সফর শুরু হয় ইহরাম দিয়ে।
তখন সে নিজের পোশাক খুলে ফেলে, যেন এর সাথে দুনিয়ার বোঝা ও চিন্তাগুলোও ঝরে যায়। বাহ্যিকভাবে যেমন সরল হয়, তেমনি অন্তর থেকেও অহংকার, লোক দেখানো ও গর্ব ত্যাগ করে। এই বরকতময় ভূমিতে সে আল্লাহ ছাড়া সবকিছুর প্রতি আসক্তি ছেড়ে দেয়। সকল হাজী একই পোশাকে দাঁড়ায়; ফলে ভেদাভেদ মুছে যায়, বাধা দূর হয় ও এক উম্মাহর সুন্দর চিত্র প্রকাশ পায়।
হে হাজি, তুমি এই মহান উম্মাহর একজন যে উম্মাহ ঐক্যে মহান, ইতিহাসে দৃঢ় ও মূল্যবোধে উন্নত। তাদের সবার আকীদা এক, কিবলা এক, রব এক।
তারা শিখে যে, শ্রেষ্ঠত্ব চেহারা, সম্পদ বা পদমর্যাদায় নয়; বরং অন্তরের ঈমানে, সৎ নিয়তে ও ভালো কাজে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘হে মানুষ ! আমি তোমাদেরকে সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে, পরে তোমাদেরকে বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে, যাতে তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে আল্লাহর নিকট সেই ব্যক্তিই অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে তোমাদের মধ্যে অধিক মুত্তাকী। নিশ্চয়ই আল্লাহ সকল কিছু জানেন, সমস্ত খবর রাখেন।’ (সুরা হুজুরাত : ১৩)।
এরপর হাজী উচ্চস্বরে বলে, ‘লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক’। এটি এমন একটি বাক্য, যা পুরো জীবনের অর্থকে প্রকাশ করে। যেন সে বলছে, হে আমার রব! আমি আপনার জন্যই হাজির, আপনার আদেশ মানতে প্রস্তুত, আপনার দিকেই ফিরেছি, আপনাকে ছাড়া সবকিছু ত্যাগ করেছি। এই তালবিয়া শুধু জিহ্বায় নয়, অন্তরেও স্থান করে নেয়, তাকে জাগিয়ে তোলে। এরপর এই অর্থগুলো জীবনে প্রকাশ পায়। নামাজে বিনয়, কাজে সততা, লেনদেনে সত্যবাদিতা ও জীবনে সৎপথে চলা প্রকাশ পায়।
এরপর সে তাওয়াফ করে। কাবাঘরকে কেন্দ্র করে ঘোরে। কিন্তু এর সাথে তার অন্তরেও বড় পরিবর্তন আসে। তার অন্তর আর নিজের কামনা, সম্পদ, ইচ্ছা বা মানুষের সন্তুষ্টিকে কেন্দ্র করে ঘোরে না; বরং শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টিকে কেন্দ্র করে ঘোরে। যেন তাওয়াফ তাকে জীবনের লক্ষ্য নতুন করে ঠিক করতে শেখায় যে, আল্লাহই হবে তার উদ্দেশ্য, আর পুরো জীবন তাঁর সন্তুষ্টির চারপাশে ঘুরবে।
এরপর সে সাফা ও মারওয়ার মাঝে সাঈ করে। তখন সে হযরত হাজেরা (রা.)-এর সেই প্রচেষ্টা স্মরণ করে, যখন তিনি নির্জন উপত্যকায় ছিলেন, না ছিল ফসল, না ছিল পানি; কিন্তু তিনি আল্লাহর ওপর ভরসা করেছিলেন।
তিনি চেষ্টা করেছেন, আর তাঁর অন্তর ছিল আল্লাহর প্রতি শান্ত। এতে হাজি শিখে যে, চেষ্টা করতে হবে, কিন্তু শুধু কারণের ওপর নির্ভর করা যাবে না; বরং অন্তরকে আকাশের রবের সাথে যুক্ত রাখতে হবে।
এরপর আসে আরাফার দিন, যে দিনের জন্য অন্তর অপেক্ষা করে। এই দিনে মানুষ নিজের সাথে সত্যিকারের হিসাব করে। সে নিজের দুর্বলতা দেখে, নিজের ভুল মনে করে, নিজের গোনাহ স্মরণ করে। তখন সে আল্লাহর সামনে ভেঙে পড়ে, ভয় ও আশার অশ্রু ঝরায়। সে জানে, আল্লাহর দরজা কখনও বন্ধ হয় না; তাঁর রহমত আমাদের গোনাহর চেয়েও অনেক বেশি বিস্তৃত। আর যে সত্যভাবে ফিরে আসে, আল্লাহ তার জন্য কবুলিয়ত ও গ্রহণযোগ্যতার দরজা খুলে দেন।
এরপর সে জামারাতে পাথর নিক্ষেপ করে। সে ছোট ছোট পাথর ছুঁড়ে মারে, যেন এর সাথে সে তার সেই গোনাহগুলোও ছুঁড়ে ফেলছে, যেগুলোতে সে অভ্যস্ত ছিল; সেই হারাম অভ্যাসগুলো, যেগুলোতে সে আসক্ত হয়ে গিয়েছিল; শয়তানের কাছে দীর্ঘদিনের আত্মসমর্পণকেও বর্জন করে। সে ঘোষণা করে যে, সে গুনাহে ফিরে যাওয়ার পথ কেটে ফেলবে এবং সৎপথ ও আত্মসংযমের পথ বেছে নেবে।
ভিড়ের মধ্যে, যখন মানুষ তাকে ধাক্কা দেয় বা কেউ তার সাথে খারাপ আচরণ করে, তখন সে ধৈর্য ও সহনশীলতা শেখে। সে নিজের জিহ্বাকে সংযত রাখে, রাগ দমন করে; আল্লাহর এই বাণী মেনে চলে যে, ‘হজ হয় সুনির্দিষ্ট মাসসমূহে। এরপর যে কেউ এ মাসগুলোতে হজ করা স্থির করে তার জন্য হজের সময়ে স্ত্রী-সম্ভোগ, অন্যায় আচরণ ও কলহ-বিবাদ বিধেয় নয়।’ (সূরা বাকারা, আয়াত: ১৯৭) এরপর সে এই চরিত্র পুরো জীবনে নিয়ে যায়। নিজের পরিবারে, কাজে, লেনদেনে ও জীবনের সব ক্ষেত্রে।
এভাবেই হজ এক ঈমানি ও আল্লাহপ্রদত্ত শিক্ষা কেন্দ্র হয়ে ওঠে। এখান থেকে হাজী ফিরে আসে তাকওয়ার পাথেয় নিয়ে; তার মন পবিত্র হয়, হৃদয় পরিশুদ্ধ হয় ও চরিত্র উন্নত হয়। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কখনই আল্লাহর নিকট পৌঁছায় না এদের গোশত ও রক্ত, বরং পৌঁছায় তোমাদের তাক্ওয়া।’ (সুরা হজ : ৩৭)।
আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি দয়াবশত ভালো কাজকে শুধু হাজিদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেননি; বরং সবার জন্য এর দরজা খুলে দিয়েছেন। জিলহজ মাসের প্রথম ১০ দিন অত্যন্ত মহৎ দিন। আল্লাহ এদের শপথ করে বলেছেন, ‘শপথ ঊষার, শপথ ১০ রজনীর।’ (সুরা ফজর : ১-২)।
আল্লাহ কোনো কিছুর শপথ করেন না, যদি তা মহান না হয়। এই দিনগুলোতে সওয়াব বহুগুণে বৃদ্ধি পায়, রহমত নাজিল হয়। এতে নামাজ, রোজা, জিকির, সদকা, তাকবির ও সব ধরনের ইবাদত একত্রিত হয়। যেন এটি একটি খোলা আহ্বান যে, কাছে আসো। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘জিলহজের প্রথম দশ দিন নেক আমল করার চেয়ে আল্লাহর কাছে প্রিয় আর কোনো দিন নেই।’ সাহাবিরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহর পথে জিহাদও না?’ তিনি বললেন, ‘আল্লাহর পথে জিহাদও নয়, তবে সেই ব্যক্তি ছাড়া, যে নিজের জান ও মাল নিয়ে বের হয়েছে এবং কিছুই নিয়ে ফিরে আসেনি।’ (বোখারি : ৯৬৯)।
এই দিনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে মহান হলো আরাফার দিন। এটি ক্ষমার দিন, এমন এক দিন যেদিন আল্লাহ গোনাহ মাফ করেন। বিশ্বনবী (সা.) বলেছেন, ‘আমি আল্লাহর কাছে আশা করি, আরাফার দিনের রোজা আগের এক বছর ও পরের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবে।’ (মুসলিম : ২৬৩৬)।
দুই বছরের গুনাহ মাফ। একটি সহজ আমলের মাধ্যমে এটি একটি মহান প্রতিদান। তাই নিজেকে বঞ্চিত করো না, তওবা দেরি করো না, এই সুযোগ নষ্ট করো না। জীবন সীমিত, দিনগুলো দ্রুত চলে যাচ্ছে। কত মানুষ ইচ্ছা করেও করতে পারেনি! আর সৌভাগ্যবান সেই ব্যক্তি, যে দ্রুত গতিতে এগিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে যায়।
(২৮-১১-১৪৪৭ হিজরি মোতাবেক ১৫-০৫-২০২৬ খিষ্টাব্দে মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষেপিত অনুবাদ করেছেন জামিয়া ইসলামিয়া ইসলামবাগের মুহাদ্দিস- আবদুল কাইয়ুম শেখ)
