যারা সবার আগে জান্নাতে প্রবেশ করবে

ফাহিম হাসান

প্রকাশ : ০২ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘তিন শ্রেণির মানুষ সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবে- এক. শহিদ। দুই. যে ভেতরে ও বাইরে সং ও চরিত্রবান। তিন. এমন দাস, যে উত্তমরূপে তার রবের ইবাদত করে এবং তার মনিবের কল্যাণ কামনা করে।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৬৪২)

ক. জাহান্নাম থেকে মুক্তি এবং জান্নাতে প্রবেশ : প্রবৃত্তির তাড়নায় কিংবা শয়তানের প্ররোচনায় যে সকল মুসলিম গোনাহে লিপ্ত হয়েছে, তারা নির্দিষ্ট মেয়াদে শাস্তি ভোগ করার পর জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যারা জাহান্নামের স্থায়ী বাসিন্দা, তারা সেখানে মরবেও না, বাঁচবেও না; বরং জীবস্মৃত হয়ে থাকবে। তবে যে সকল মোমিন নির্দিষ্ট গোনাহের কারণে আগুনের গ্রাসে পরিণত হয়েছিল, তাদের আল্লাহ আপেক্ষিক মৃত্যু প্রদান করবেন। একপর্যায়ে যখন তারা কয়লায় পরিণত হবে, তখন আল্লাহ তাদের ব্যাপারে সুপারিশের অনুমতি দেবেন। তখন তাদের দলে দলে সমবেত করা হবে। জান্নাতের প্রস্রবণে মেলে ধরা হবে। অতঃপর বলা হবে, তোমরা তাদের ওপর পানি ঢেলে দাও। তখন তারা পলিমাটিতে বীজ থেকে জন্ম নেওয়া সজীব চারা গাছের মতো নতুন জীবন লাভ করবে।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৮৫)

জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আগুনে জ্বলে সম্পূর্ণরূপে ভস্ম হওয়ার পর কিছু মানুষ জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। তাদের চেহারার কাঠামো শুধু বাকি থাকবে। একপর্যায়ে তারাও জান্নাতে প্রবেশ করবে।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৯১)

একাধিক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, মহান আল্লাহ এমন ব্যক্তিকেও জাহান্নাম থেকে বের করবেন, যার হৃদয়ে এক দিনার, অর্ধ দিনার কিংবা অণু পরিমাণ ঈমান রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, তিনি এমন লোকদেরও একসময় জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেবেন, যারা জীবনে কখনোই কোনো ভালো কাজ করেনি। আবু সাইদ খুদরি (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ জান্নাতবাসীকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন- যাকে ইচ্ছা, তাকেই শুধু আপন অনুগ্রহে প্রবেশ করাবেন। তিনি জাহান্নামবাসীদের জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন। এরপর (ফেরেশতাদের) বলবেন, খেয়াল রেখো, যার হৃদয়ে সরিষার দানা পরিমাণ ঈমান পাবে, তাকেও জাহান্নাম থেকে বের করবে।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৮৪)

খ. সবার শেষে যে জান্নাতে প্রবেশ করবে : সবার শেষে যে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পেয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে, রাসুলুল্লাহ (সা.) একাধিক হাদিসে তার ব্যাপারে বর্ণনা করেছেন। মহান আল্লাহর সঙ্গে তার কথোপকথন এবং তাকে আল্লাহর দেওয়া অবিশ্বাস্য নেয়ামত ও সম্মাননা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি জানি, কে সবার পরে জাহান্নাম থেকে বের হবে এবং কে সবার পরে জান্নাতে প্রবেশ করবে। সর্বশেষ ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হবে। আল্লাহ তাকে বলবেন, যাও, জান্নাতে প্রবেশ করো। সে জান্নাতের কাছে আসবে। তার মনে হবে, জান্নাত লোকে লোকারণ্য হয়ে আছে। একচুল জায়গা নেই সেখানে। ফলে সেই ব্যক্তি রবের কাছে ফিরে গিয়ে বলবে, হে আল্লাহ, জান্নাত তো ভরে গিয়েছে! তখন আল্লাহতায়ালা বলবেন, যাও, জান্নাতে প্রবেশ করো। তোমার জন্য এক পৃথিবী পরিমাণ এবং তার সঙ্গে আরো ১০ পৃথিবী পরিমাণ বিশাল জান্নাত রয়েছে। সে অবাক হয়ে বলবে, আপনি কি মহা পরাক্রমশালী হয়ে আমার সঙ্গে ঠাট্টা করছেন? বর্ণনাকারী বলেন, এই হাদিস বলার সময় আল্লাহর রাসুল হেসে ফেলেন। তার দাঁতের মাড়ি পর্যন্তও দেখা গিয়েছে। বলা হয়ে থাকে, জান্নাতে এই লোকটিই সবচেয়ে কম মর্যাদাপ্রাপ্ত হবে।’ (বুখারি, হাদিস: ৬৫৭১)

অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘আমি জানি সর্বশেষ কোন ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে বের হবে। সর্বশেষ ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বের হবে। তাকে বলা হবে, যাও, জান্নাতে প্রবেশ করো। সে জান্নাতে গিয়ে দেখবে, মানুষজন নিজ নিজ আসন গ্রহণ করে ফেলেছে। তাকে জিজ্ঞেস করা হবে, তোমার কি জাহান্নামে কাটানো সময়ের কথা মনে আছে? সে বলবে, জি আমার মনে আছে। তখন তাকে বলা হবে, তুমি চাইতে থাকো। সে চাইতে থাকবে। এরপর তাকে বলা হবে, তুমি এতক্ষণ যা কামনা করেছ, তোমাকে তা দেওয়া হলো। সেই সাথে দেওয়া হলো, দুনিয়ার চেয়ে ১০ গুণ বড় জান্নাত। তখন সে বলবে, আপনি কি আমার সাথে পরিহাস করছেন! অথচ আপনি বিশ্বজাহানের অধিপতি! বর্ণনাকারী বলেন, হাদিসটি বলার সময় আল্লাহর রাসুল (সা.) হেসেছিলেন। এমনকি তার মাড়ির দাঁত প্রকাশিত হয়েছেল।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৮৬)

গ. কেয়ামত দিবসের আগেই যারা জান্নাতে প্রবেশ করেছেন : সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করেছেন আদি পিতা আদম (আ.)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমি বললাম, হে আদম, তুমি এবং তোমার স্ত্রী জান্নাতে বসবাস করো। জান্নাতের যেখানে ইচ্ছে, সেখান থেকে ইচ্ছেমতো আহার করো। তবে এই গাছটির কাছে যেয়ো না। অন্যথায় তোমরা সীমালঙ্ঘনকারীদের অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ৩৫)

কিয়ামতের আগে আরো যারা জান্নাতে যাবে, তাদের শীর্ষে রয়েছেন শহিদগণ। সহিহ মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, মাসরুক (রহ.) বলেন, একবার আমরা আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর কাছে নিম্নে বর্ণিত আয়াতটি সম্পর্কে জানতে চাই, ‘যারা আল্লাহর রাস্তায় শহিদ হয়েছে, তাদের মৃত ভেবো না; বরং তারা তাদের রবের কাছে জীবিত ও জীবিকা প্রাপ্ত।’ (সুরা আলে ইমরান, আয়াত: ১৬৯) তিনি বলেন, ‘আমরাও এ ব্যাপারে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে জানতে চেয়েছিলাম। তিনি বলেছেন, তাদের প্রাণ সবুজ রঙের বিশেষ প্রজাতির পাখির বুকে সংস্থাপন করা হবে। তাদের বাসাগুলো আরশের সঙ্গে ঝোলানো থাকবে। তারা জান্নাতের যেখানে ইচ্ছা ঘুরে বেড়াবে।

এরপর আবার বাসায় ফিরে আসবে। তাদের রব মাথা উঁচু করে তাদের দিকে তাকাবেন। তাদের জিজ্ঞেস করবেন, তোমাদের কি বিশেষ কিছুর চাহিদা রয়েছে? তারা বলবে, আমাদের আর কী চাই! আমরা তো জান্নাতের যেখানে ইচ্ছা, সেখানেই ঘুরে বেড়াচ্ছি। তাদের এই সকৃতজ্ঞ উক্তির পরও মহান আল্লাহ তাদের পরপর তিনবার একই প্রশ্ন করবেন।

যখন তারা দেখবে যে, তাদের রব তাদের নিস্তার দিচ্ছেন না, তখন বলবে, আমরা চাই, আপনি আমাদের দেহে প্রাণ ফিরিয়ে দেবেন, যাতে আমরা পুনরায় আপনার পথে জিহাদ করতে পারি। যখন আল্লাহ দেখবেন, তাদের আসলে বিশেষ কোনো চাহিদা ইেন, তখন তিনি আর প্রশ্ন করবেন না।’ (মুসলিম, হাদিস: ১৮৮৭)