কিস্তি-৩

ইবনে বতুতার সফরে তৎকালীন বাংলার বর্ণনা

ড. খোন্দকার আলমগীর

প্রকাশ : ২৪ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

শাহ জালাল কুনিয়ারির (রহ.) কারামত (কারামত শব্দের অর্থ হলো মুসলিম সাধকদের দ্বারা প্রদর্শিত অলৌকিক ঘটনা। এটি ‘সাধারণ মানুষের ক্ষমতার বাইরে। কারামতের মূল্য বা মর্যাদা মুজিজার চেয়ে কম, যা কেবল একজন নবীই প্রদর্শন করতে পারেন।’ (দ্য রেহলা, পৃষ্ঠা: ২৩৮)

 

ইবনে বতুতা শাহ জালালের বেশ কয়েকটি কারামতের কথা উল্লেখ করেছেন, যেমন- ১. শাহ জালাল আগে থেকেই জানতেন যে, পশ্চিম থেকে একজন ভ্রমণকারী তার সঙ্গে দেখা করতে আসছেন এবং তিনি ইবনে বতুতাকে স্বাগত জানাতে দুই দিনের দূরত্বের পথে তার চারজন শিষ্যকে পাঠিয়েছিলেন। শাহ জালাল এটি ইলহামের (ঐশ্বরিক অন্তর্দৃষ্টি)-এর মাধ্যমে জানতে পেরেছিলেন। ইন্দ্রিয় এবং যুক্তির ব্যবহার ছাড়াই আল্লাহ যদি কোনো জ্ঞান সরাসরি হৃদয়ে ঢেলে দেন, তবে তা হলো ইলহাম। শরিয়তের পরিভাষায়ওহী হলো সেই ঐশ্বরিক বাণী যা কোনো ফেরেশতার মাধ্যমে নবীর কাছে পাঠানো হয়।

২. শাহ জালাল প্রতিদিন মক্কায় গিয়ে ফজরের নামাজ পড়তেন, প্রতি বছর হজ করতেন এবং ঈদ ও আরাফার দিনে পবিত্র মক্কা নগরীতে নামাজ পড়তেন। এই দিনগুলোতে তিনি সবার চোখ থেকে অদৃশ্য হয়ে যেতেন।

৩. আরেকটি কারামত ছিল যে, তিনি জানতেন যে ইবনে বতুতা সাধকের পরিহিত ছাগলের লোমের তৈরি আলখাল্লাটি পেতে ইচ্ছুক ছিলেন; সেই একই আলখাল্লা ইবনে বতুতার কাছ থেকে একজন অমুসলিম শাসক ছিনিয়ে নেবে এবং শেষ পর্যন্ত তা চীনের সাগার্জের একজন সাধক বুরহানউদ্দিনের কাছে পাঠানো হবে।

৪. তিনি তার মৃত্যুর একদিন আগে তার সঙ্গীদের কাছে নিজের মৃত্যুর ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন। আজকের দিনেও মানুষ বিশ্বাস করে যে সিলেট বিজয়ের সময় শাহ জালাল (রহ.) তার নামাজের মোসাল্লায় (জায়নামাজ) বসে নদী পার হয়েছিলেন।

ইতিহাসে কারামত গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এটি সাধারণ জনগণের ওপর হযরত শাহ জালালের গভীর প্রভাবকে নির্দেশ করে। যদিও কিছু আধুনিক গবেষক কারামতকে কুসংস্কার বলে আখ্যায়িত করেছেন, তবে বিশ্বজুড়ে সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি মুসলমানদের কাছে এটি বিশ্বাসের একটি অংশ হিসেবে গৃহীত।

কামারু (কামরূপ)-র জাদুবিদ্যা: আরবি ভাষায় কোনো ‘প’ বর্ণ না থাকায় মুসলিমরা এই জায়গার নাম কামারু, কামরু বা কামরুদ বলে উল্লেখ করেছেন। ইতিহাসের ধারায় কামরূপের সীমানা বেশ কয়েকবার পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে ভারতের আসাম রাজ্যে কামরূপ নামে একটি জেলা রয়েছে। প্রাচীন ও মধ্যযুগে কামরূপ জাদুবিদ্যা ও ডাইনিবিদ্যার জন্য পরিচিত ছিল। আজও মানুষ বিশ্বাস করে যে কামরূপে জাদুর চর্চা হয়। ইবনে বতুতাও কামরূপের মানুষের করা অলৌকিক জাদুর কথা উল্লেখ করেছেন।

বাংলার উদ্ভিদ, প্রাণী এবং অন্যান্য পণ্য: ইবনে বতুতা তৎকালীন বাংলার কিছু পণ্যের দাম উল্লেখ করেছেন। এগুলো হলো: ধান বা চাল, গরু, মহিষ, মুরগি, বাচ্চা কবুতর, ভেড়ার বাচ্চা, চিনি, গোলাপ জল, ফার্সি গুল অর্থ ফুল ও আব অর্থ পানি আরবিতে, ঘি, তিল, ক্রীত দাসী এবং মিহি সুতি কাপড় বা মসলিন। এই নামগুলো থেকে সেই সময়ে বাংলার পণ্যের একটি ধারণা পাওয়া যায়। ধান বা চাল: এটি লক্ষ্য করা গেছে যে: পুরোনো চীনা ভাষার নিংপো উপভাষার ‘ঙঁষরু’ শব্দটি আরবিতে ‘ঙৎুঁ’ এবং গ্রিক ভাষায় ‘ঙৎুুধ’ হয়ে ওঠে, যা পরবর্তীতে ‘জরঃু’ এবং ‘জরপব’ শব্দে রূপান্তরিত হয়। ধান ও ধান্য শব্দের উৎপত্তি জানা নেই। লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রধান শস্য চাল একটি প্রাচীন ফসল। চীন ও জাপানের রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায় প্রায় ১০,০০০ বছর আগে ধান চাষ শুরু হয়েছিল। এই ফসলের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা ব্যাপক এবং এটি উত্তর কোরিয়া থেকে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৬০০ মিটার উচ্চতা (জুমলা, নেপাল) পর্যন্ত জন্মায়। (‘ধান’: বাংলাপিডিয়া)

 

চাল বাঙালিদের প্রধান খাদ্য। এটি বাঙালিদের খাদ্যতালিকায় অস্ট্রালয়েড

(Australoid) মানুষের অবদান। চালের ইতিহাস নব্যপ্রস্তর যুগ পর্যন্ত বিস্তৃত। বাংলায় ধান চাষ প্রায় ৫,০০০ বছরের পুরানো। খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীতে সম্রাট অশোকের মহাস্থান শিলালিপিতে ধানের উল্লেখ পাওয়া গেছে। (নীহার রঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস, ১৩৮) বাংলায় আসা অবাঙালি অধিবাসীরা ভাত পছন্দ করত না, তারা রুটি ও মাংস পছন্দ করত। কিন্তু তাদের পছন্দের পোলাও এবং বিরিয়ানির মতো সুস্বাদু খাবার চাল দিয়েই রান্না করা হয়। পোলাও ঘি এবং চাল দিয়ে রান্না করা হয়। বিরিয়ানিতে গরুর মাংস, খাসি বা মুরগির মাংস যোগ করা হয়। এই খাবারগুলো রান্নায় অনেক মূল্যবান মসলার প্রয়োজন হয়। ঐতিহ্যগতভাবে বাংলায় তিন ধরনের ধান বা চাল রয়েছে, এগুলো হলো- আউশ, আমন এবং বোরো। যেহেতু ইবনে বতুতা বর্ষাকালে বাংলা সফর করেছিলেন, তাই আউশ হলো সেই ধান বা চাল যা এই ঋতুতে কাটা হয়। ইবনে বতুতা হয়তো গভীর পানির ধানও দেখেছিলেন। এটিও দুই জাতের হয়ে থাকে। সাধারণ বাঙালিরা মাছসহ বা মাছ ছাড়াই তরকারি দিয়ে ভাত খায়। ভাত খাওয়ার আরও অনেক প্রক্রিয়া রয়েছে। চাল থেকে মুড়ি, খই এবং চিঁড়ে তৈরি হয়। চাল বাংলার সামাজিক জীবন এবং উৎসবের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

গরু: ইবনে বতুতা উল্লেখ করেছেন যে শাহ জালালের (রহ.) একটি গরু ছিল। (যদুনাথ সরকার, দ্য হিস্ট্রি অব বেঙ্গল, ভলিউম ২, পৃ. ১০০) ইবনে বতুতা নিজে এই সাক্ষ্য দেন এবং উল্লেখ করেন যে টানা ১০ দিন রোজা রাখার পর তিনি এই গরুর দুধ দিয়ে ইফতার করেছিলেন। এই গরুটি সম্ভবত বাংলার একটি দেশি গরু ছিল। বাংলাদেশের পাহাড়পুরের টেরাকোটা এবং পাথরের ফলকে (অষ্টম শতাব্দী) গরুর ছবি রয়েছে। শাহ জালাল যে ধরনের রোজা রাখতেন তাকে বলা হয় ‘সওম আল-উইসাল’ ( বিরতিহীন বা একটানা রোজা)। রাসুলুল্লাহ (সা.) এই রোজা রাখতেন, তবে তিনি অন্যদের এই রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। মুসলিম আইনবিদদের মধ্যে এই ধরনের রোজা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। রক্ষণশীল মুসলমানরা এই ধরনের রোজা রাখার সুপারিশ বা চর্চা করেন না।

মহিষ: ইবনে বতুতার ভ্রমণকালীন সময়ে বাংলায় মহিষ মূলত গরুর বিকল্প বা পরিপূরক হিসেবে কাজ করত। মহিষ মূলত পানি ও জলাভূমির প্রাণী, এবং বর্তমান পূর্ব বাংলা (বাংলাদেশ) অঞ্চলে এখনও প্রচুর সংখ্যক মহিষ পাওয়া যায়। এই অঞ্চলের অধিবাসীরা মহিষের দুধ পান করেন এবং জমি চাষের (লাঙল টানার) কাজেও মহিষ ব্যবহার করা হয়। ময়মনসিংহ অঞ্চল সম্পর্কে একটি প্রচলিত প্রবাদ রয়েছে, যা ইবনে বতুতা হয়তো তাঁর সফরের সময় শুনে থাকতে পারেন:

‘হাওর জঙ্গল মইষের শিং, এই তিনে ময়মনসিংহ। অর্থাৎ, হাওর (হ্রদ), জঙ্গল এবং মহিষের শিং- এই তিনটি উপাদান ময়মনসিংহে প্রচুর পরিমাণে দেখা যায়। তৎকালীন অবিভক্ত ভারতের সবচেয়ে বড় জেলা ছিল এই ময়মনসিংহ, যা বর্তমানে বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রশাসনিক বিভাগ (যার অধীনে ছয়টি জেলা রয়েছে)।

প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় মহিষের অস্তিত্ব বিদ্যমান। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ সংঘ (ওটঈঘ) বন্য মহিষকে ইঁনধষঁং ধৎহবব এবং গৃহপালিত মহিষকে ই. নঁনধষরং প্রজাতির অন্তর্ভুক্ত হিসেবে বিবেচনা করে। এর মধ্যে তিনটি উপপ্রজাতি স্বীকৃত ছিল। প্রায় চার দশক আগেও বাংলাদেশের বনাঞ্চল এবং জলাভূমিগুলোতে বন্য মহিষের উপপ্রজাতি ইঁনধষঁং ধৎহবব ভঁষাঁং দেখা যেত, যা বর্তমানে বাংলাদেশ থেকে সম্পূর্ণ বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এই বন্য মহিষই বর্তমান গৃহপালিত মহিষের পূর্বপুরুষ বলে ধারণা করা হয়।

বর্তমানে বাংলাদেশে প্রধানত দুই ধরনের গৃহপালিত পানির মহিষ দেখা যায়:

১. নদীর মহিষ

২. জলাভূমির মহিষ