কিস্তি-৪

ইবনে বতুতার সফরে তৎকালীন বাংলার বর্ণনা

ড. খোন্দকার আলমগীর

প্রকাশ : ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

ইবনে বতুতা তার বাংলা সফরের সময় সম্ভবত এই দুই ধরনের মহিষই দেখেছিলেন| জমি চাষের জন্য পানির মহিষ অত্যন্ত উপযোগী| এছাড়া মহিষের দুধে সাধারণ গাভীর চেয়ে ফ্যাট (চর্বি) এবং প্রোটিনের পরিমাণ অনেক বেশি থাকে| এই মহিষের দুধ থেকেই ঐতিহ্যগতভাবে দই, পনির এবং ঘি তৈরি করা হতো|

মুরগি: প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় মুরগি পাওয়া যায়| (নীহার রঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস, পৃষ্ঠা: ১৪৬)| দেশি জাতের মুরগিগুলো হলো: সরাইল, সাধারণ দেশি এবং বন্য| ইবনে বতুতা তার সফরের সময় সম্ভবত সাধারণ দেশি জাতের মুরগি দেখেছিলেন|

বাচ্চা কবুতর: প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় কবুতর পাওয়া যায়| (নীহার রঞ্জন রায়, বাঙ্গালীর ইতিহাস, পৃষ্ঠা: ১৪৬)| বিশ্বব্যাপী ১৪০ প্রজাতির কবুতর রয়েছে| বাংলাদেশে ১০টি প্রজাতি রয়েছে, যার মধ্যে ৬টিই হরিতাল বা সবুজ কবুতর| এগুলো হলো-

১. জালালি বা রক পিজন

২. ধলাটুপি কবুতর

৩. ধুমকল কবুতর

৪. পাহাড়ি ধুমকল

৫. লেজচোখা হরিতাল

৬. কমলাবুক হরিতাল

৭. মোটাঠোঁট হরিতাল

৮. হলদেপা হরিতাল

৯. ছাইমাথা হরিতাল

১০. মেটেবুক হরিতাল

এগুলোর মধ্যে মেটেবুক হরিতাল একটি যাযাবর বা পরিযায়ী প্রজাতি|

ভেড়া বা ভেড়ার বাচ্চা: বাচ্চা ভেড়াকে ল্যাম্ব বলা হয়| বাংলাদেশের বরেন্দ্র, যমুনা অববাহিকা এবং উপকূলীয় অঞ্চলের মতো তিনটি পরিবেশগত অঞ্চলে প্রায় ২৭ লাখ ভেড়ার ৩২% লালন-পালন করা হয়| (ফারুকুল ইসলাম, ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল অব বিজিনেস, সোশাল অ্যান্ড সায়েন্টিফিক রিসার্চ, ভলিউম ৪, ইস্যু ৪, পৃ. ৩২৪) ইবনে বতুতা বাংলাদেশের যমুনা অববাহিকা এবং উপকূলীয় অঞ্চল পরিদর্শন করেছিলেন| তিনি বরেন্দ্র অঞ্চল পরিদর্শন করেননি| সুতরাং এটি যৌক্তিক যে তিনি বাংলাদেশের যমুনা অববাহিকা এবং উপকূলীয় অঞ্চলের ভেড়া দেখেছিলেন|

চিনি: আখের রস থেকে চিনি তৈরি হয়| এটি লক্ষ্য করা গেছে যে প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় নির্দিষ্ট প্রজাতির আখের চাষ হতো| অতীতে বাংলাদেশে কোয়েম্বেতর জাতের আখের ব্যাপক চাষ হতো| ( 'আখ', বাংলাপিডিয়া) প্রাচীনকাল থেকেই এখানে আখের চাষ হয়ে আসছে| আরও লক্ষ্য করা গেছে যে, ত্রয়োদশ শতাব্দীতে মার্কো পোলো লক্ষ্য করেছিলেন চিনি ছিল বাংলা থেকে রপ্তানির একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পণ্য| ষোড়শ শতাব্দীর শুরুতে পর্তুগিজ ভ্রমণকারী বারবোসা দেখতে পান যে ভারতের বিভিন্ন অংশ, শ্রীলঙ্কা, আরব এবং পারস্যে চিনি সরবরাহের ক্ষেত্রে বাংলা দক্ষিণ ভারতের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করছে|

গোলাপ জল (ফার্সি গুল অর্থ ফুল ও আব অর্থ পানি আরবিতে): বাংলাদেশে গোলাপের চার/পাঁচটি প্রজাতি রয়েছে| এগুলো হলো: ১. রোসা অ্যালবা (সাদা গোলাপ), ২. রোসা সেন্টিফিফোলিয়া (বাঁধাকপি গোলাপ), ৩. রোসা চাইলেনসিস (চা গোলাপ), ৪. রোসা কাইনোফিলা (বাংলার বন্য গোলাপ) এবং ৫. রোসা ডেমাসেনা (গ্রীষ্মকালীন দামেস্কী গোলাপ)| এগুলোর মধ্যে রোসা কাইনোফিলা (বাংলার বন্য গোলাপ) সুনামগঞ্জ জেলার হাওর অঞ্চলে পাওয়া যায়| রোসা চাইলেনসিস (চা গোলাপ) ঢাকার মিরপুর বোটানিক্যাল গার্ডেন এবং বলধা গার্ডেনে চাষ করা হয়| সুগন্ধি আতরের জন্য গ্রীষ্মকালীন দামেস্কী গোলাপের চাষ করা হয়| (জিয়াউদ্দীন আহমদ সম্পাদিত, এনসাইক্লোপেডিয়া অব ফ্লোরা এন্ড ফনা অব বাংলাদেশ, ভলিউম ১০, পৃষ্ঠা: ৩৩-৩৬) এই ধরনের গোলাপ থেকে গোলাপ জলও তৈরি করা হয়| সুখী দাম্পত্য নিশ্চিত করার জন্য বিয়েতে গোলাপ জল ছিটানো হতো এবং এটি ভালোবাসা ও পবিত্রতার প্রতীক, যা ধ্যান ও প্রার্থনায় সহায়তা করতেও ব্যবহৃত হয়| গোলাপ জল হলো গোলাপ তেল তৈরির প্রক্রিয়ার একটি উপজাত বা বাই-প্রোডাক্ট| গোলাপ তেল থেকে গোলাপের সুগন্ধি তৈরি হয়| বাষ্প পাতন বা স্টিম ডিস্টিলেশনের মাধ্যমে গোলাপ জলের ব্যাপক উৎপাদন ইবনে সিনা (৯৮০-১০৩৭ খ্রি.) দ্বারা পরিমার্জিত হয়েছিল| গোলাপ জল রান্নায় ব্যবহৃত হয়| এটি বিভিন্ন খাবার ও পানীয়ের পাশাপাশি প্রসাধন এবং ঔষধি উদ্দেশ্যেও ব্যবহৃত হয়|

ঘি: ঘি হলো পরিশোধিত মাখন| এটি মহিষের দুধ থেকে তৈরি হতো|

তিল: এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে প্রাচীনকাল থেকেই বাংলায় সরিষার চাষ হতো| সপ্তম শতাব্দীতেও সরিষার উল্লেখ পাওয়া যায়| মাত্র কয়েক দশক আগেও বাংলাদেশে সরিষার তেলই ছিল একমাত্র রান্নার তেল| আজকাল সয়াবিন তেল প্রধান রান্নার তেল হিসেবে ব্যবহৃত হয়| এই রান্নার তেলের ব্যবহার এখন ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে| ইবনে বতুতা তার রেহলায় তিলের (ঝবংধসব ওহফরপঁস) কথা উল্লেখ করেছেন| এটি মধ্যযুগীয় বাংলায় তিল এবং এর তেলের ব্যাপক ব্যবহারের ইঙ্গিত দেয়| তিল শব্দটি প্রাক-আর্য দ্রাবিড় উৎস থেকে বাংলায় এসেছে| এই শব্দটি দ্রাবিড় গোষ্ঠীর তামিল, মালায়লাম এবং কন্নড় ভাষায়ও প্রতিশব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে| অন্য একজন লেখকের মতে, তিল আফ্রিকা থেকে এই উপমহাদেশে এসেছিল, যা এর উৎপত্তিস্থল| এটি চীন এবং মিশরেও চাষ করা হতো (খ্রিস্টপূর্ব ১৩০০ অব্দ)| এটি এখন বাংলাদেশের একটি বিলুপ্ত বা প্রায় বিলুপ্ত ফসল| বাংলাদেশের অনেক এলাকায় অন্যান্য বিলুপ্ত বা প্রায় বিলুপ্ত ফসল হলো: তিসি, বার্লি, অড়হর, কাউন, খেসারি, সরিষা, নীল, মিষ্টি আলু, মুগ ডাল, আউশ ধান, মাসকলাই, চিনা ইত্যাদি| এটি কৌতূহলজনক যে, ইবনে বতুতা তিলের কথা উল্লেখ করলেও সরিষার কথা উল্লেখ করেননি|

মিহি সুতি কাপড় বা মসলিন: বাংলার মসলিন বিশ্ববিখ্যাত ছিল| এটিকে বাংলার একটি অনন্য পণ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতো| এমনকি মিশরের মমিগুলোও মসলিন দিয়ে জড়ানো হতো এবং এটি রোমের ফ্যাশনেবল নারীরা ব্যবহার করতেন| কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, পেরিপ্লাস অব দি ইরিথ্রিয়ান সি, বেশ কয়েকজন বিদেশী ভ্রমণকারী এবং ব্যবসায়ীদের লেখা থেকে জানা গেছে যে, প্রাচীনকালে সূক্ষ্ণ তুলা এবং সিল্ক ছিল বাংলার প্রধান শিল্পজাত পণ্য| ইবনে বতুতা বাজারে এটি দেখতে পেয়েছিলেন, যা স্বাভাবিক| আবুল কাশেম লক্ষ্য করেছেন, '...বিখ্যাত মসলিন শিল্পের জন্য উপযোগী সেরা মানের তুলা ঢাকা ও ময়মনসিংহ জেলায় উৎপাদিত হতো'| ('কৃষি', বাংলাপিডিয়া) কে. এম. মহসিন পর্যবেক্ষণ করেছেন, 'মসলিন তৈরি হতো তুলা থেকে যা পদ্মা, মেঘনা ও যমুনা নদী দ্বারা পরিবেষ্টিত ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় উৎপাদিত হতো'| ('ঢাকাই মসলিন', ৪ হান্ড্রেড ইয়ার্স অব ক্যাপিটল ঢাকা এন্ড বেয়ান্ড) মসলিন শব্দটি সম্ভবত মোগল আমলে ব্যবহৃত হয়েছিল| মসলিন অনেক রকমের ছিল এবং সেগুলোর নাম ছিল আরবি বা ফার্সিতে| মসলিন শিল্প সম্পূর্ণভাবে একটি দেশীয় শিল্প ছিল| তুলা চাষ থেকে শুরু করে সুতা তৈরি, বুনন, তাঁত তৈরি ইত্যাদি- সবকিছু একই ব্যক্তি বা স্থানীয়ভাবে করা হতো| তাঁতের জন্য প্রয়োজনীয় বাঁশ ও কাঠ স্থানীয় এলাকা থেকে সংগ্রহ করা হতো| পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো বিদেশী উপাদান ব্যবহার করা হতো না এবং এটি তৈরি পণ্য হিসেবে রপ্তানি করা হতো| এর উচ্চ মানের কারণ হিসেবে দুই ধরনের মতামত রয়েছে: সুতা তৈরি অথবা তাঁতিদের দক্ষতা| সুতা তৈরির জন্য দুই ধরনের তুলা ব্যবহার করা হতো: ফুটি এবং বৈরাতি; ফুটি বৈরাতির চেয়ে ভালো ছিল|

উপসংহার: ইবনে বতুতার রেহলা ইতিহাসের একটি খনি বা আকর| এটি 'বাংলার মানুষের জীবন সম্পর্কে নিবিড় জ্ঞান' প্রদান করে| ইবনে বতুতা বাংলায় প্রায় ৪৮ দিন অবস্থান করেছিলেন| তার সফরের সময় তিনি বাংলার অনেক দিক পর্যবেক্ষণ করেছিলেন| তিনি যেসব অঞ্চল পরিদর্শন করেছিলেন সেগুলোর প্রতি তাঁর গভীর পর্যবেক্ষণ প্রশংসনীয়| জ্ঞানের প্রায় সব ক্ষেত্রেই তাঁর রেহলা গ্রন্থ থেকে প্রচুর দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়| এর থেকে বাংলার আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক দিকগুলোও জানা সম্ভব| এর পাশাপাশি লেখক এই গবেষণাপত্রে ইবনে বতুতা কর্তৃক বর্ণিত বাংলার উদ্ভিদ, প্রাণী এবং অন্যান্য পণ্য সম্পর্কে কিছু তথ্য দেওয়ার চেষ্টা করেছেন|

কৃতজ্ঞতা স্বীকার: ড. মো. আনোয়ারুল ইসলাম (প্রাণিবিদ্যা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), ড. সৈয়দ হাদিউজ্জামান (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর); ড. মো. নজিবুর রহমান (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়,গাজীপুর ); ড. মনজুর-এ-এলাহী (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, গাজীপুর); ড. মো. শাহজাহান (বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ); ড. এ.কে. ফজলুল হক ভূঁইয়া (বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ); ড. মো. ওমর ফারুক (বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ); মো. পনির চৌধুরী (বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউট); ড. মো. শাহিনুর রশিদ (ইতিহাস একাডেমি)|