মননে ও আচরণে ইবাদত কবুলের প্রভাব

প্রকাশ : ২৭ মে ২০২১, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

আমরা ক’দিন আগেই পবিত্র রমজান মাসকে বিদায় জানালাম। আল্লাহর কাছে আশা রাখি, আমরা এ মাসে মাকবুল ও কামিয়াব হব। তিনি আমাদের কলব ও কদমকে সরল পথে অটল ও অবিচল রাখবেন। আশা রাখি, তার আনুগত্যে আমাদের সাহায্য করবেন এবং আমাদের ওপর রাজিখুশি থাকবেন। বরকত ও ফজিলত এবং করুণা ও কল্যাণের মৌসুম রমজান শেষ হয়ে গেল। দিনগুলো ফুরিয়ে গেল। আমলগুলো লিপিবদ্ধ হলো। এ মাসে যে কামিয়াব হওয়ার সে কমিয়াব হয়েছে। যে বঞ্চিত থাকার সে বঞ্চিত থেকেছে।

হে লোকসব! সবসময় আল্লাহর সঙ্গে ওয়াদা নবায়ন করুন। রমজানের পর তার সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবেন না। কেন না, তিনি সদা নিকটবর্তী ও সাড়াদানকারী। দোয়া কবুল করেন, হাজত পুরা করেন। তার খাজনা হলো পরিপূর্ণ ও অফুরন্ত এবং তার দুই হাত প্রশস্ত ও প্রসারিত। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নভোম-ল ও ভূম-লের সবাই তার কাছে প্রার্থী। তিনি সর্বদাই কোনো না কোনো কাজে রত আছেন।’ (সুরা রহমান : ২৯)। ‘তিনি জীবিত, সব কিছুর ধারক। তাকে তন্দ্রাও স্পর্শ করতে পারে না এবং নিদ্রাও নয়।’ (সুরা বাকারা : ২৫৫)।

সম্মানিত মুসলিমবৃন্দ! নিশ্চয় ইবাদতকারীর আচার-আচরণে ইবাদত প্রভাব ফেলে। যেমন ধরুন নামাজ, এটি অশ্লীল ও শরিয়ত অসমর্থিত কাজকর্ম থেকে নামাজিকে বিরত রাখে। আর আমল কবুল হওয়ার আলামত, ইবাদতকারীর অবস্থা পরিবর্তন হয়ে উন্নতির দিকে ধাবিত হবে। যে ভালো কাজ আগের খারাপ কাজকে মিটিয়ে দেয়, সে ভালো কাজ কতই না উত্তম। তবে এর চেয়ে উত্তম হলো ভালো কাজের পর আবার ভালো কাজ করা। তাই আল্লাহর কাছে আমৃত্যু ইবাদতে লেগে থাকার দোয়া করুন। অন্তরের মন্দ পরিবর্তন এবং আমলে সংযুক্তির বিযুক্তি থেকে পানাহ কামনা করুন।

আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহর কাছে ইবাদত ও আনুগত্যে অটল ও অবিচল থাকার দোয়া করুন। কেন না, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘তোমাদের কোনো ব্যক্তি আমল করতে করতে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, তার এবং জান্নাতের মধ্যে মাত্র এক হাত পার্থক্য থাকে। এমন সময় তার আমলনামা তার ওপর জয়ী হয়। তখন সে জাহান্নামবাসীর মতো আমল করে। আর একজন আমল করতে করতে এমন স্তরে পৌঁছে যে, তার এবং জাহান্নামের মধ্যে মাত্র এক হাত তফাত থাকে, এমন সময় তার আমলনামা তার ওপর জয়ী হয়। ফলে সে জান্নাতবাসীর মতো আমল করে।’ (বোখারি, মুসলিম)।

সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘আমি আমার উম্মতের কতক দল সম্পর্কে অবশ্যই জানি। যারা কেয়ামতের দিন তিহামার শুভ্র পর্বতমালার সমতুল্য নেক আমলসহ উপস্থিত হবে। মহামহিম আল্লাহ সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করবেন। সাওবান (রা.) বলেন, হে আল্লাহর রাসুল! তাদের পরিচয় পরিষ্কারভাবে আমাদের কাছে বর্ণনা করুন, যাতে অজ্ঞাতসারে আমরা তাদের অন্তর্ভুক্ত না হই। তিনি বলেন, তারা তোমাদেরই ভ্রাতৃগোষ্ঠী এবং তারা তোমাদের সম্প্রদায়ভুক্ত। তারা রাতের বেলা তোমাদের মতোই ইবাদত করবে। কিন্তু তারা এমন লোক যে, একান্ত গোপনে আল্লাহর হারামকৃত বিষয়ে লিপ্ত হবে।’ (ইবনে মাজাহ)।

হে মুসলিমরা, কল্যাণ অর্জনের পথ অসংখ্য ও অগণিত। এর প্রবেশপথও খোলা ও উন্মুক্ত। তো এ পথের পথিকরা কোথায়? এ দ্বারে প্রবেশকারীরা কোথায়? হক ও সত্য সবসময় স্বচ্ছ ও স্পষ্ট। নিজের বিনাশকারীই একমাত্র এ থেকে সরে থাকে। অতএব, আল্লাহর ইবাদত ও আনুগত্যের প্রতিটিতেই অংশগ্রহণ করুন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে মোমিনরা! তোমরা রুকু করো, সেজদা কর, তোমাদের পালনকর্তার ইবাদত করো এবং সৎকাজ সম্পাদন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার।’ (সুরা হজ্ব :৭৭)।

ধারাবাহিকতা, নিরবচ্ছিন্নতা ও সঠিক পথে স্থির থাকার কষ্ট সহ্য করাটাই অনেক বড় ইবাদত। এ বৈশিষ্ট্য আমলে ইখলাস থাকা এবং ইবাদত কবুল হওয়ার আলামত। এরূপ ইবাদত আল্লাহ তায়ালা পছন্দ করেন। আর রাসুল (সা.) এভাবেই আমল করতেন।

আল্লাহর বান্দারা! বছরের প্রতিটি মাসই একেকটি ইবাদতের মৌসুম। যদিও ওজিফা ও ফজিলতের দৃষ্টিকোণ থেকে ভিন্নতা ও পার্থক্য রয়েছে। আর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত ইবাদত ও আমলের মধ্য দিয়ে কাটানো সম্ভব। হাদিসের ভাষায় ‘যাকে যে কাজ করার জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সে কাজ করা সহজ করে দেওয়া হয়। অন্য হাদিসে আছে, ‘সব মানুষই প্রত্যেক ভোরে নিজেকে আমলের বিনিময়ে বিক্রি করে। তার আমল দ্বারা সে নিজেকে (আল্লাহর আজাব থেকে) মুক্ত করে অথবা সে তার নিজের ধ্বংস সাধন করে।’ (বোখারি, মুসলিম)।

সম্মানিত মুসলিমবৃন্দ! আল্লাহকে উত্তম কর্জ দিন। নিজের জন্য আগেভাগে কিছু পাঠান। আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমরা নিজেদের জন্য যা কিছু অগ্রে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে উত্তম আকারে এবং পুরস্কার হিসেবে বর্ধিতরূপে পাবে।’ (সুরা মুজ্জাম্মিল : ২০) অন্য আয়াতে বলেছেন, ‘এমন কে আছে যে, আল্লাহকে করজ দেবে, উত্তম করজ; অতঃপর আল্লাহ তাকে দ্বিগুণ-বহুগুণ বৃদ্ধি করে দেবেন।’ (সুরা বাকারা : ২৪৫)।

জেনে রাখুন! রোজা হলো ঢাল স্বরূপ। রোজা বাদে বনি আদমের প্রতিটি আমল তার নিজের জন্য। কেন না, রোজা আল্লাহর জন্য আর তিনিই এর বিনিময় দান করেন। আপনাদের মধ্যে যার জন্য শাওয়াল মাসের ছয়টি রোজা রাখা সম্ভব হয়, তিনি এই রোজাগুলো রাখবেন। কেন না, এ রোজাগুলো রাসুল (সা.) করতেন। এগুলো তার আমল ও সুন্নত। রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের রোজা রাখার পর যে শাওয়াল মাসে ছয়টি রোজা করল, সে যেন পুরো ১ বছর রোজা রাখল।’ (মুসলিম)।

আল্লাহ তায়ালা একটি আমলের সওয়াব ১০ গুণ দেন। সে হিসাবে রমজানের এক মাসের সওয়াব হবে ১০ মাসের সমান। আর শাওয়ালের ৬ রোজার সওয়াব হবে ৬০ রোজা বা দুই মাসের সমান। এভাবে ১০ মাস আর দুই মাস মিলে ১২ মাস বা ১ বছর পূর্ণ হলো। সুতরাং, কেউ যেন এ রোজা রাখার ব্যাপারে নিজের ওপর সংকীর্ণতা না দেখায়। হয়তো আল্লাহ তায়ালা তাকে ১ বছর রোজা রাখার সওয়াব দান করবেন। এটি এক বিরাট গণিমত। যা চেষ্টা, প্রচেষ্টা ও আগ্রহের দাবিদার। রোজাগুলো একাধারে রাখা যায়। আবার মাঝেমধ্যে বিরত রেখেও করা যায়।

আল্লাহর বান্দারা! আমাদের ওপর মহান আল্লাহর নেয়ামতগুলো অফুরন্ত ও অগণিত। হিসাব-নিকাশ করে এর কোনো কূল পাওয়া যাবে না। নেয়ামতগুলো থেকে সামান্য একটি নেয়ামতেরও প্রতিদান দেওয়া সম্ভব নয়। ‘তোমরা যদি আল্লাহর নেয়ামত গণনা করো, তবে গুণে শেষ করতে পারবে না। (সুরা ইবরাহিম : ৩৪)।

সুতরাং, আল্লাহ তায়ালার নেয়ামত ও নিদর্শনের ওপর শুকরিয়া আদায় করুন। ইবাদত ও আমলে নিজেকে উৎসর্গিত করুন। হাদিসে এসেছে, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনে কেউ যদি জন্ম থেকে আত্মনিয়োগ করে বৃদ্ধাবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তবুও এটি একটি নেয়ামতের প্রতিদান হিসেবে গণ্য হবে না। (মুসনাদে আহমাদ)।

আল্লাহর বান্দারা! আল্লাহর দয়া ও অনুগ্রহ ছাড়া কেউ শুধু নিজে আমলের কারণে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, আমি আল্লাহর রাসুল (সা.)কে বলতে শুনেছি, ‘তোমাদের কোনো ব্যক্তিকে তার নেক আমল জান্নাতে প্রবেশ করাতে পারবে না। লোকজন প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসুল! আপনাকেও নয়? তিনি বললেন, আমাকেও নয়, যতক্ষণ পর্যন্ত আল্লাহ আমাকে তার করুণা ও দয়া দিয়ে আবৃত না করেন।’ (বোখারি, মুসলিম)। অতএব, আমাদের কেউ যেন নিজের আমল নিয়ে ধোঁকা না খায়। ইবাদত নিয়ে বড়াই না করে। যা আমল করেছে, এটাকে বেশি মনে না করে। ইবাদত করতে করতে যেন বিরক্ত না হয়। কেন না, ইবাদত কবুলের ব্যাপারে সে অজ্ঞ, কিছুই জানে না। সুতরাং, নিজের সামর্থ্য ও সাধ্যানুযায়ী আল্লাহকে ভয় করুন। দ্বীনের পথে অটল-অবিচল থাকুন। নবীজির সুন্নতকে আঁকড়ে ধরুন। নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক সংশোধন করুন। (ইমান-আমলের) শত্রুদের ব্যাপারে প্রতিবাদী হোন। আল্লাহর কাছে ইস্তেকামাত ও তৌফিকের দোয়া করুন।

৯ শাওয়াল ১৪৪২ হিজরি মসজিদে নববিতে প্রদত্ত জুমার খুতবার সংক্ষিপ্ত অনুবাদ ইশরাক বিন ফরিদ