নবীজির প্রিয়তমা উম্মুল মোমিনিন আয়েশা (রা.)
প্রকাশ : ১৭ জুন ২০২১, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
নূর মুহাম্মদ রাহমানী

নবীকুল শিরোমণি শেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) এর একনিষ্ঠ সাহাবি ইসলামের প্রথম খলিফা আবু বকর (রা.) এর প্রিয় কন্যা আয়েশা সিদ্দিকা (রা.)। তিনি নবী করিম (সা.) এর সম্মানিত স্ত্রী এবং মোমিন জননীদের মধ্যে নবীজির (সা.) সবচেয়ে প্রিয় স্ত্রী। তার উপাধি সিদ্দিকা ও হোমাইরা। অত্যধিক সুন্দরী হওয়ায় তাকে হোমাইরা বলা হতো।
তার উপনাম উম্মে আবদুল্লাহ। এ উপনামটি নবী (সা.) নিজে নির্ধারণ করেছিলেন। আরবে উপনাম রাখা ভদ্রতার পরিচায়ক মনে করা হতো। তিনি নিঃসন্তান ছিলেন। একদিন নবী (সা.) এর কাছে বললেন, আরবের নারীরা উপনামে প্রসিদ্ধ। নবীজি, আমারও কোনো উপনাম নির্ধারণ করে দিন। নবী (সা.) বললেন, তোমার উপনাম তোমার পুত্র আবদুল্লাহর নামের দিকে লক্ষ্য করে উম্মে আবদুল্লাহ রাখ। এ আবদুল্লাহ ছিলেন আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) এর ভাগ্নে।
মা উম্মে রোমান বিনতে আমের ইবনে ওয়াইমির কেনানি (রা.)। নবীজি এ মহীয়সী নারীর ব্যাপারে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ডাগর ডাগর চোখবিশিষ্ট হুর দেখতে পছন্দ করে, সে যেন উম্মে রোমানের দিকে তাকায়।’
তিনি নবুয়তের চতুর্থ বা পঞ্চম বর্ষে মক্কা মোকাররমায় জন্মগ্রহণ করেন। জন্মসূত্রে মুসলমান হওয়া তার বিশেষ বৈশিষ্ট্য। ফলে তিনি ওইসব লোকদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের কানে কুফর ও শিরকের আওয়াজ পর্যন্ত পৌঁছেনি। নারী সাহাবিদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বড় ফকিহ। বিয়ের আগে নবী (সা.) তাকে দু’বার স্বপ্নে দেখেন যে, তিনি রেশমি কাপড় পরে আছেন। একজন নবীজিকে বলছে, তিনি আপনার সম্মানিত স্ত্রী। নবীজি স্বপ্নে থেকেই বলছেন, যদি এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়ে থাকে, তাহলে এমনটা হয়ে যাবে। এ স্বপ্নের ওপর ভিত্তি করে নবীজি (সা.) আবু বকর (রা.) এর কাছে কন্যা আয়েশা সিদ্দিকার (রা.) বিয়ের প্রস্তাব পাঠান। দোজাহানের সর্দার মুহাম্মদ (সা.) এর সঙ্গে কন্যার বিয়ে হবে, আবু বকর (রা.) এর আনন্দ আর দেখে কে! সঙ্গে সঙ্গে তিনি রাজি হয়ে গেলেন। হিজরতের প্রায় ১০ মাস আগে শাওয়াল মাসে ৪০০ দেরহাম দেনমোহর নির্ধারণ করে তার বিয়ে হয়।
বিয়ের খুতবা আবু বকর (রা.) নিজেই পড়েন। এ সময় আয়েশা (রা.) এর বয়স অনেক কম ছিল। এজন্য এটা শুধু বিয়ের আকদ ছিল, যাতে উঠিয়ে নেওয়ার সুযোগ ছিল না। সাত বছরের কথা কোথাও কোথাও পাওয়া যায়। এটা আল্লাহ তায়ালার হেকমত ছিল এবং এ নির্বাচনও আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকেই ছিল। তিনি তুখোড় মেধাবী ছিলেন। নবী (সা.) এর আনীত দ্বীন যেভাবে তিনি সংরক্ষণ করে ব্যাপক করেছেন, এটা আল্লাহ তায়ালার হেকমত এবং দ্বীন সত্য হওয়ার প্রমাণ। তিনি ছিলেন নবীজির একমাত্র কুমারী স্ত্রী। তিনি নবীজির প্রতিটি কথা অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে দেখেছেন, পরখ করেছেন, বুঝেছেন এবং মুসলিম উম্মাহ বিশেষ করে নারীদের পর্যন্ত পৌঁছিয়েছেন।
মদিনায় হিজরতের দ্বিতীয় বর্ষে নবীর ঘরে তাকে আনা হয়। তখন তার বয়স ছিল ৯ বছর। নবী (সা.) তাকে উত্তম তারবিয়াত শিক্ষা দেন। তিনিও নবী (সা.) থেকে অনেক উপকৃত হন এবং ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের এক বড় ভান্ডার শুধু নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন, এমন নয়; বরং প্রতিটি ক্ষেত্রে উম্মতে মুসলিমাকে দিকনির্দেশনা দিয়েছেন।
সাইয়্যেদ সোলাইমান নদভি (রহ.) লেখেন, সাধারণত সব যুগের বাচ্চাদের অবস্থায় আজকালের বাচ্চাদের মতোই হয়ে থাকে। সাত-আট বছর বয়স পর্যন্ত তাদের কোনো হুশ-জ্ঞান থাকে না, কোনো কথার গভীরতায় পৌঁছতে পারে না। কিন্তু আয়েশা (রা.) এর বাল্যকালের প্রতিটি কথা মনে থাকত। এগুলো বর্ণনা করতেন, এগুলো থেকে বিধি-বিধান আহরণ করতেন। বাল্যকালের খেলাধুলায় কোনো আয়াত কানে পড়লেই তা মুখস্থ করে নিতেন। এ অল্প বয়সেও সতর্কতা ও মুখস্থশক্তি এতটুকু ছিল যে, নবীজির হিজরতের সব ঘটনাবলি বরং খন্ড খন্ড ছোট ছোট কথাও তার মনে থাকত। হিজরতের ঘটনা তার চেয়ে অধিক বিস্তারিত কেউ বর্ণনা করতে পারেনি।
মর্যাদা ও বৈশিষ্ট্য : তার এমন কিছু বৈশিষ্ট্য ছিল, যা উম্মতের অন্য কারও ছিল না। তিনি বলেন, ফেরেশতা নবীজির খেদমতে তার আকৃতি নিয়ে আগমন করত। নবীপত্নীদের মধ্যে তিনিই ছিলেন সবচেয়ে বেশি প্রিয়। তার কারণে উম্মত অজুর পরিবর্তে তায়াম্মুমের মতো সহজ বিধান পেয়েছে। জিবরাইল (আ.) তাকে দেখেছেন। তার পবিত্রতা ও নিষ্কুলষতার ব্যাপারে পবিত্র কোরআনের ১০টি আয়াত নাজিল হয়েছে। তিনি স্ত্রী হিসেবে নবীজির ঘরে ১০ বছর অতিক্রম করেন। প্রায় অর্ধেক কোরআন এ সময়গুলোতেই নবীজির ওপর অবতীর্ণ হয়। নবীজির সংশ্রবে আসার আগে যেগুলো নাজিল হয়েছে, সেগুলো সম্পর্কে তার জানা ছিল। তার সংশ্রবে তিনি মহাগ্রন্থ কোরআনের এক একটি আয়াতের কেরাত পদ্ধতি, দলিল-প্রমাণ এবং গবেষণা পদ্ধতিতে পূর্ণ দক্ষতা রাখতেন। তিনি প্রতিটি মাসআলার সমাধানের জন্য অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোরআনের শরণাপন্ন হতেন।
ইমাম বোখারি (রহ.) আবু মুসা আশআরি (রা.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘অন্যান্য নারীর তুলনায় আয়েশার (রা.) শ্রেষ্ঠত্ব এমন, যেমন অন্যান্য খাবারের ওপর সারিদ খাবারের শ্রেষ্ঠত্ব।’ (বোখারি : ৩৪১১)।
এ ছাড়া তার আরও অনেক ফজিলত ছিল। সহিহ মুসলিমে রয়েছে, তিনি নিজেই বলেন, লোকেরা নবীজিকে (সা.) হাদিয়া দেওয়ার জন্য আয়েশার (রা.) পালার দিনের অপেক্ষা করত। আর এর দ্বারা তাদের উদ্দেশ্য থাকত, রাসুল (সা.) এর সন্তুষ্টি অর্জন করা। তিনি আরও বলেন, আমার ওপর আল্লাহ তায়ালার দয়া ছিল যে, নবী (সা.) যখন আমার সঙ্গে এক লেপে আরাম করতেন, তখন তার ওপর অহি অবতীর্ণ হতো। অন্য কোনো স্ত্রীর এ সৌভাগ্য অর্জিত হয়নি।
হাদিস, ফিকহ, ইতিহাস এবং বংশবিদ্যার মধ্যে তিনি ছিলেন সেরা। উরওয়া ইবনে যোবায়ের (রহ.) বলেন, হালাল-হারাম, কবিতা, চিকিৎসাবিদ্যায় উম্মুল মোমিনিন আয়েশার (রা.) চেয়ে অধিক পারদর্শী কাউকে দেখিনি। আহনাফ ইবনে কায়েস (রহ.) ও মুসা ইবনে তালহা (রহ.) বলেন, আয়েশা (রা.) এর চেয়ে অধিক কাউকে বিশুদ্ধবাসী পাইনি। বড় বড় সাহাবায়ে কেরাম তার কাছে ফারাইজের মাসআসা-মাসায়েল জিজ্ঞেস করতেন। ২৯৯ জন সাহাবি ও তাবেয়ি তার থেকে হাদিস বর্ণনা করেছেন। আর তার থেকে বর্ণিত হাদিসের সংখ্যা ২ হাজার ২১০টি।
রাসুলের (সা.) নিয়ম ছিল, সাধারণত যেভাবে তিনি তাকে সামনে রাখতেন, সেখানে বেশ কয়েকটি সফরেও তাকে সঙ্গে রাখেন, যুদ্ধের সফরগুলো এতে অন্যতম। রাসুল (সা.) দুনিয়া থেকে বিদায় নেওয়ার সময় তিনি কয়েকদিন অসুস্থ থাকেন। অসুস্থতা বেড়ে গেলে তিনি স্ত্রীদের থেকে তার সেবা-যতœ আয়েশার (রা.) এখানে হওয়ার অনুমতি চান। স্ত্রীরা সন্তুষ্টচিত্তে এর অনুমতি দেন। নবীজি (সা.) আয়েশার (রা.) এখানে যান এবং ইন্তেকাল পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন।
আয়েশা (রা.) সুরা এখলাস, সুরা ফালাক এবং সুরা নাস পড়ে রাসুলের (সা.) হাতে দম (ফুঁ দেওয়া) করতেন। নবীজির (সা.) পবিত্র জীবনের শেষ মুহূর্তে এটা তার জন্য বড় সম্মানের বিষয়। ইন্তেকালের আগে আয়েশা (রা.) আবদুল্লাহ ইবনে যোবাইরকে অসিয়ত করেন, আমাকে নবীপত্নীদের কাছেই দাফন করবে। নবীজির (সা.) রওজার পাশে এখনও যে জায়গাটি অবশিষ্ট আছে, সেখানে দাফন করবে না। কেননা আমি এটা পছন্দ করি না যে, অন্য নবীপত্নীদের তুলনায় আমাকে বিশেষ অবস্থান দেওয়া হোক।
ইন্তেকাল : ৫৮ হিজরির পবিত্র রমজানের ১৭ তারিখ মঙ্গলবার রাতে তিনি ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পর সঙ্গে সঙ্গে দাফন করার অসিয়ত ছিল, এজন্য আর দেরি করা হয়নি। আবু হুরাইরা (রা.) জানাজার ইমামতি করেন। মদিনা নগরীর জান্নাতুল বাকিতে রাতেই তাকে দাফন করা হয়। পাঁচজন সাহাবি তার কবরে নামেন আবদুল্লাহ ইবনে যোবাইরের দুই পুত্র ১. আবদুল্লাহ ও ২. উরওয়া ৩. কাসেম ইবনে মুহাম্মদ ৪. আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ইবনে আবু বকর ৫. আবদুল্লাহ ইবনে আবদুর রহমান রাদিয়াল্লাহু আনহুম দাফনের কাজে অংশগ্রহণ করেন।
লেখক : শিক্ষক, হাদিস ও ফতোয়া বিভাগ, জামিয়া আরাবিয়া দারুল উলুম বাগে জান্নাত, চাষাঢ়া, নারায়ণগঞ্জ
