মদিনা শরিফের খুতবা

আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে ভাবুন এবং উপদেশ গ্রহণ করুন

শায়খ ড. আলী বিন আবদুর রহমান হুজাইফি

প্রকাশ : ২৭ আগস্ট ২০২০, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন ঈমানদার হোন। যথাযথ কাজ সম্পন্নকারী ও বিবেকবানদের পথ অনুসরণ করুন। কেননা তারা সঠিক বিবেক এবং নিরাপদ স্বভাবের অধিকারী। তারাই ওহির দ্বারা উপকৃত হয়। নাজিলকৃত আয়াতের মর্ম আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উদ্দেশ্য অনুযায়ী বোঝে। সওয়াবের আশা এবং শাস্তির ভয়ে আল্লাহর কথা মতো কাজ করে।

চিন্তাভাবনা আলোকিত বিবেক এবং গভীর দৃষ্টিশক্তিসম্পন্ন ব্যক্তির কাজ। ভাবনা সফলতা আনে এবং ধ্বংস থেকে বাঁচার পথ দেখায়। চিন্তাভাবনাকারী ব্যক্তি কল্যাণ কাজের জন্য তৌফিকপ্রাপ্ত হয়। এর মাধ্যমে ব্যক্তি নেককার ও সৎকর্মশীলদের পথের সন্ধান পায়। তার পরিণতি হয় কল্যাণের। যে চিন্তাভাবনা বঞ্চিত হয়, তার জন্য উপদেশ কাজে আসে না। সে ধ্বংসে নিপতিত হয়। খেয়ালখুশির অনুসরণ করে। ফ্যাসাদাকারীদের পথ অনুসরণ করে। সবশেষে লজ্জিত হয়।

আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। পৃথিবীর জন্য একটি রীতি নির্ধারণ করেছেন। অতএব, আনুগত্যকে দুনিয়া ও আখেরাতের সব কল্যাণের কারণ বানিয়েছেন। আর অপরাধ ও অবাধ্যতাকে দুনিয়া ও আখেরাতের সব অকল্যাণের কারণ বানিয়েছেন। কেউ কি তাঁর আনুগত্য করে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে? অন্যদিকে কেউ কি তাঁর অবাধ্য হয়ে সুখী হয়েছে? আল্লাহ তায়ালা কোরআনে এবং রাসুল (সা.) হাদিসে অসংখ্য নবী-রাসুলের ঘটনা উল্লেখ করেছেন। শিক্ষা, উপদেশ এবং শাস্তি থেকে বাঁচা ও সফলতার গল্প তুলে ধরেছেন। সুন্দর পরিণতি ও সম্মান বৃদ্ধির বিষয়ও আলোকপাত করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘তাদের কাহিনিতে রয়েছে বুদ্ধিমানের জন্য প্রচুর শিক্ষণীয় বিষয়।’ (সুরা ইউসুফ : ১১১)। তিনি আরও বলেন, ‘নিশ্চয় এতে নিদর্শন রয়েছে; কিন্তু তাদের অধিকাংশই বিশ্বাস করে না। (সুরা শোআরা : ১৯০)।

ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, ‘এ ঘটনার অকাট্য প্রমাণ ও স্পষ্ট বক্তব্যে ঈমানদার ব্যক্তিদের ভিত আরও মজবুত হয়। অবশ্যই এতে এ শিক্ষা রয়েছে যে, তেমাদের প্রতিপালক নিশ্চয় তিনি পরাক্রমশালী। যিনি সব কিছুর ওপরই ক্ষমতাশীল। তাঁর সৃষ্টির যাকে ইচ্ছা পরাস্ত করেন। আর যাকে ইচ্ছা রহম করেন। যারা অবাধ্যতা করে তিনি তাদের সুযোগ দেন। দ্রুতই কোনো শাস্তি প্রদান করেন না। কিন্তু যখন পাপ পূর্ণ হয়ে যায় তখন তাকে কঠোর শাস্তি প্রদান করেন। সাঈদ ইবনে যুবায়ের (রহ.) বলেন, ‘একমাত্র যারা তওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসে তিনি তাদের প্রতিই দয়াশীল।’ আল্লাহ তায়ালা লুত (আ.) এর সম্প্রদায়ের ব্যাপারে বলেছেন, ‘নিশ্চয় মোমিনদের জন্য তাতে রয়েছে নিদর্শন।’ (সুরা হিজর : ৭৫)।

কাতাদাহ (রহ.) শিক্ষানুরাগীদের উদ্দেশে বলেন, ‘ইতিহাসের বিভিন্ন ঘটনা ও পরিস্থিতির বার্তা থেকে চিন্তাশীল ওইসব শিক্ষার্থীই উপকৃত হতে পারে, যারা একমাত্র সংশোধনকারী ও কল্যাণকামীদের অনুসারী। আর যারা চিন্তা করে উপদেশ গ্রহণ করে না, আখেরাতের জন্যও পুঁজি সংগ্রহ করে না, তার ধর্মজ্ঞান তাকে খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখতে পারে না। সে চতুষ্পদ প্রাণীর মতো। যেমনটা কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, ‘তুমি কি মনে কর যে, তাদের অধিকাংশ শোনে ও বুঝে? তারা তো পশুর মতোই। বরং উপহারা অধিক প্রথভ্রষ্ট।’ (সুরা ফুরকান : ৪৪)। অন্য আয়াতে আল্লাহ আরও বলেন, ‘আকাশম-লী ও পৃথিবীতে অনেক নিদর্শন রয়েছে, তারা এসব প্রত্যক্ষ করে। কিন্তু তারা এসব থেকে উদাসীন।’ (সুরা ইউছুফ : ১০৫)।

নবীজি (সা.) বলেছেন, কোনো মোমিন যখন অসুস্থ হয়ে সেই অসুস্থতায় মারা যায়, তখন আল্লাহ তার পেছনের সব ছগিরাহ গোনাহ মাফ করে দেন। আর যদি সে সুস্থ হয়ে যায়, তাহলে তার আগের ছগিরা গোনাহ মাফ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাকি জীবনের জন্য উপদেশ হয়ে দাঁড়ায়। তবে যদি কোনো মোনাফেক অসুস্থ হওয়ার পর সুস্থ হয়ে যায় তাহলে সে ওই উটের মতো, যাকে তার মালিক বেঁধে রাখল তারপর ছেড়ে দিল। কিন্তু সে জানল না কেনই বা তাকে বেঁধে রাখা হলো আবার কেনইবা ছেড়ে দেওয়া হলো। রাসুল (সা.) ও নবীদের জীবনব্যবস্থাকে আল্লাহ তায়ালা শিক্ষা অর্জন করা এবং তাদের পথে পরিচালিত হওয়ার জন্যই বর্ণনা করেছেন। আল্লাহ তাঁর নবী মুহাম্মদ (সা.) কে পূর্ববর্তী নবীদের অনুসরণ করতে বলেছেন। এই মর্মে তিনি কোরআনে বলেছেন, ‘আল্লাহ তাদের হেদায়েত দান করেছেন। সুতরাং আপনি তাদের অনুসরণ করুন।’ (সুরা আনআম : ৯০)।

আল্লাহ তায়ালা সর্বশেষ নবী মুহাম্মদ (সা.) এর মাধ্যমে সব শরিয়তকে রহিত ঘোষণা করেছেন। আর তাকে পাঠিয়েছেন পূর্ণাঙ্গ ও চিরস্থায়ী দ্বীন দিয়ে। বলে দিয়েছেন, যে ব্যক্তি তার আদর্শকে আঁকড়ে ধরবে তাকে তিনি দুনিয়া ও আখেরাতে অনাবিল সুখের জীবন দান করবেন এবং সৃষ্টির সেরা মানবের সঙ্গে জান্নাতে বসবাসের সুযোগ দেবেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আর যে কেউ আল্লাহর হুকুম এবং তাঁর রাসুলে হুকুম মান্য করবে, তাহলে যাদের প্রতি আল্লাহ নেয়ামত দান করেছেন সে তাদের সঙ্গী হবে। তারা হলেন নবী, সিদ্দিক, শহীদ ও সৎকর্মশীল ব্যক্তি। আর তাদের সান্নিধ্যই হলো উত্তম।’ (সুরা নিসা : ৬৯)।

এর থেকে বড় সম্মান আর কি হতে পারে? আল্লাহ তায়ালা আমাদের কাজে আম্বিয়া আলাইহিমুস সালামের ঘটনা বর্ণনা করেছেন। যাতে আমরা তাদের অনুসরণ করতে পারি। তাদের যাপিত জীবন থেকে উপদেশ গ্রহণ করে মুক্তির পথ অবলম্বন করতে পারি। এমনিভাবে মিথ্যাবাদীদের সংবাদও তুলে ধরেছেন। যারা সত্যের অবাধ্যতা করেছে, নবীদের অনুসরণে দাম্ভিকতা প্রদর্শন করেছে। দুনিয়ার জীবনকে আখেরাতের ওপর প্রাধান্য দিয়েছে। সব ধরনের ভোগবিলাসে মত্ত হয়েছে। আমাদের কাছে তাদের সংবাদ তুলে ধরার উদ্দেশ্য হলো উপদেশ গ্রহণ করা। দুনিয়া ও আখেরাতে তাদের নেমে আসা লাঞ্ছনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। তাদের জন্য অবধারিত অভিশাপ থেকে বাঁচার পথ খোঁজা। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আমি কারুন ফেরাউনকে ধ্বংস করেছি। মুসা তাদের কাছে সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি নিয়ে আগমন করেছিল । অতঃপর তারা দম্ভ করেছিল। কিন্তু তারা জিতে যায়নি। আমি প্রত্যেককেই তার অপরাধের কারণে পাকড়াও করেছি। তাদের কারও প্রতি প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রচ- বাতাস। কাউকে পেয়েছে বজ্রপাত। কাউকে আমি বিলীন করেছি ভূগর্ভে এবং কাউকে করেছি নিমজ্জিত। আল্লাহ তাদের প্রতি জুুলুম করার ছিলেন না। কিন্তু তারা নিজেরাই নিজেদের ওপর জুলুম করেছে।’ (সুরা আনকাবুত : ৩৯-৪১)।

বনু নজিরের ঘটনা উল্লেখ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘হে চক্ষুষ্মান ব্যক্তিরা, উপদেশ গ্রহণ কর।’ (সুরা হাশর : ৬)। আম্বিয়া (আ.) এর সঙ্গে মিথ্যাচারীদের যেই ইতিহাস, তা আল্লাহ তায়ালার একত্ব, সত্য ও সত্যবাদীদের সমর্থন এবং শিরক বেদাতের অসারতা প্রমাণের জন্য যথেষ্ট। এদিকে সৃষ্টিজীবের প্রকৃতি তাদের সৃষ্টির নিপুণতা গুণাগুণ ও নিগূঢ় রহস্য চিন্তা করলে তার চূড়ান্ত ফলাফল এটাই দাঁড়ায় যে, আল্লাহ তায়ালা এক। তিনিই একমাত্র ইবাদতের উপযুক্ত। আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেন, ‘তোমাদের জন্য চতুষ্পদ জন্তুর মধ্যে চিন্তা করার অবকাশ রয়েছে। আমি তোমাদের পান করাই তাদের উদরস্থিত বস্তুগুলোর মধ্য থেকে গোবর ও রক্ত নিঃসৃত দুগ্ধ, যা পানকারীদের জন্য উপাদেয়।’ (সুরা নাহাল : ৬৬)।

আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আল্লাহ দিন ও রাতের পরিবর্তন ঘটান। এতে শিক্ষা রয়েছে অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের জন্য।’ (সুরা নুর : ৪৪)। আল্লাহ আরও বলেন, ‘বল, আকাশম-লী ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে তার প্রতি লক্ষ্য কর। নিদর্শনাবলি ও ভীতিপ্রদর্শন অবিশ্বাসী লোকদের উপকারে আসে না।’ (সুরা ইউনুস : ১০১)। আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করা একটি ইবাদত। এতে ঈমান বৃদ্ধি পায়। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘আসমানগুলো ও জমিনের মধ্যে রয়েছে ঈমানদারদের জন্য নিদর্শনাবলি।’ (সুরা জাসিয়াহ : ৩)। এ চিন্তাভাবনা মোমিনের সংশয় দূর করে। তার হৃদয়কে জাগিয়ে তোলে। দৃষ্টিশক্তিকে আলোকিত করে। পথচলাকে সুগঠিত করে। আর চিন্তা ও শিক্ষা গ্রহণের পথ পরিহার করলে হৃদয় কঠিন হয়ে যায়। উদাসীনতা ভর করে। শেষে গোনাহ ও অবশেষে অনুশোচনার শিকার হতে হয়।

আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত নবীজি (সা.) বলেন, মিরাজের রাতে নিম্নাকাশে অবতরণের সময় আমি নিচের দিকে তাকিয়ে কিছু ধোঁয়া, আওয়াজ ও বাতাস দেখতে পেলাম। তখন জিবরাইলকে প্রশ্ন করলাম এগুলো কী? তিনি বললেন, ‘শয়তানরা বনি আদমের চোখের সম্মুখে আগুন ধরিয়ে রেখেছে। যেন তারা আল্লাহর সৃষ্টি নিয়ে চিন্তা করতে না পারে। এ ধোঁয়া তাদের সামনে না থাকলে তারা আল্লাহর আশ্চর্য সৃষ্টি দেখে অবাক হতো। (মুসনাদে আহমাদ)। আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘মুত্তাকিদের শয়তান যখন কুমন্ত্রণা দেয় তখন তারা আল্লাহকে স্মরণ করে। তাদের সঙ্গীসাথিরা তাদের ভ্রান্তির দিকে টেনে নেয় এবং এ বিষয়ে তারা কোনো ত্রুটি করে না।’ (সুরা আরাফ : ১০১-১০২)।

তাই আসুন হিসাবের কাঠগড়ায় দাঁড়ানোর আগে নিজেরাই জীবনের হিসাব করে নিই। সবকিছুতে পরিণামের দিকে দৃষ্টি দিই। যে যত বেশি শিক্ষাগ্রহণ করে, তার ভুল তত কম হয়। আর গোনাহ থেকে যে বেঁচে থাকে তার জীবনযাপন ও জীবনের পরিসমাপ্তি সুন্দর হয়। সৌভাগ্যবান সে, যে অন্যের থেকে শিক্ষা নেয়। আর ধোঁকাগ্রস্ত সে, যে অপরকে শিক্ষা দিতে যায়। যে প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং দ্বীনের সতর্কবাণী থেকে উপদেশ গ্রহণ করে না তাকে ভর্ৎসনা করে আল্লহ কোরআনে বলেছেন, ‘তারা সত্য প্রত্যাখ্যান করে এবং নিজ খেয়ালখুশির অনুসরণ করে। আর প্রত্যেক বিষয়ই তার লক্ষ্যে পৌঁছবে। তাদের কাছে এসেছে সুসংবাদ, যাতে আছে সতর্কবাণী। (সুরা কামার : ৩-৪)।

২ মহররম ১৪৪২ হিজরি মদিনার মসজিদে নববিতে প্রদত্ত খুতবার

সংক্ষিপ্ত অনুবাদÑ মহিউদ্দীন ফারুকী