শিখরের নাম লাকপা-রি
এম এ মুহিত
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

হঠাৎ গোঙানির শব্দ শুনে পেছন ফিরে তাকিয়ে দেখি, বিথী বরফের মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। হিমবাহের একটা ফাটলে পড়ে গেছে বিথী। আমরা ছয়জন এক-দড়িতে বাঁধা রয়েছি। সবার আগে প্রধান-গাইড 'দাওয়া তেনজিং শেরপা'। তার পিছে আমি এবং আমার পরে বিথী। বিথীর পেছনে একে একে পেম্বা তেনজিং শেরপা, বিপ্লব ও নিমা দর্জি শেরপা। হিমবাহের ওপরে জমা তুষারে ঢাকা ছিল বড় একটা ফাটল; ওপর থেকে বোঝার কোনো উপায় নেই। কেমন করে যেন দাওয়া-শেরপা আর আমার পা ক্রেভাসটার ওপরে পড়েনি। কাকতালীয়ভাবে বিথীর পা পড়েছে ঠিক ক্রেভাসটার ওপরে। সঙ্গে সঙ্গে সে ক্রেভাসের মধ্যে ঢুকে গেছে; শুধু তার পিঠের ব্যাগটি ফাটলে আটকে আছে বলে পুরো তলিয়ে যায়নি।
এখনও সূর্য উঠেনি। টর্চের আলোয় আমরা ক্রেভাস থেকে টেনে তুললাম বিথীকে। ভাগ্যক্রমে কোনো বড় আঘাত পায়নি সে। আমাদের সঙ্গে সমান তালেই সে এগিয়ে যেতে পারবে। আজ আমাদের আরোহণের চূড়ান্ত দিন। সামনে রয়েছে লাকপা-রি শিখর; আমাদের, বিশেষ করে বিথী ও বিপ্লবের, স্বপ্নের সাত হাজার মিটার সামিট। ইতিপূর্বে ছয় হাজার মিটারের বেশ কয়েকটি পর্বতে অভিযান করলেও বিথী ও বিপ্লবের জন্য সাত হাজার মিটারে এটাই প্রথম অভিযান। ক্রেভাস নিয়ে আলোচনায় সময় ক্ষেপণ করার অবকাশ নেই আমাদের। খুব সাবধানে পা ফেলে আমরা আবার চলতে শুরু করলাম।
আজ ১৯ দিন হলো আমরা দেশ ছেড়ে এসেছি। সেই ২৯ এপ্রিল ভোরে ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা ইনাম আল হকের বাড়িতে তার ও ক্লাবের অন্যান্য সদস্যের শুভকামনা নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছে। শুরুতেই সঙ্গী হয়েছিল ঝড় বৃষ্টি। দুপুর একটা পর্যন্ত ঢাকা বিমান বন্দরে বসে ছিলাম। কাঠমান্ডু পৌঁছে অর্থ জমা দেওয়া ও অভিযান নিয়ে শেরপাদের সঙ্গে আলাপ করতেই দিন শেষ। পরবর্তী তিন দিন কেটেছে আরোহণের পোশাক, যন্ত্রপাতি ও সাজসরঞ্জাম কেনাকাটায়।
মে মাসের ৩ তারিখ সকাল ১০টায় হালকা বৃষ্টির মধ্যে কাঠমান্ডু ছেড়েছি। একটা জিপে আমরা তিব্বত-সীমান্তের দিকে চলেছি। মাঝে মাঝে রাস্তা কাঁচা; বৃষ্টিতে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। দুপুরে ত্রিশুলী-নদীর পারে এক রেস্টুরেন্টে মধ্যাহ্নভোজ হলো। সন্ধ্যা নাগাদ 'টিমুরে' পৌঁছে 'সোনম' গেস্ট হাউজে উঠলাম। রসুয়াগাড়ি সীমান্ত এখান থেকে ১৫ মিনিটের পথ। পরদিন সকাল ৮টায় সীমান্তে এলাম। ইমিগ্রেশনের আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে আমরা জীপে উঠলাম। আমাদের গন্তব্য 'ক্যারুং'; উচ্চতা ২,৭০০ মিটার। 'চায়না-তিব্বত মাউন্টেনিয়ারিং অ্যাসোসিয়েশন'-এর লিয়াঁজো অফিসার আমাদের সঙ্গে আছেন। ৪৫ মিনিটে ক্যারুং পৌঁছে গেলাম। উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা এখানে দু'রাত থাকব।
৬ মে সকাল ১০টায় আমরা ক্যারুং থেকে তিংরির উদ্দেশে যাত্রা করলাম। পথে নীল একটি লেক দেখে আমরা গাড়ি থেকে নামলাম। প্রায় ৪,৫৯০ মিটার উঁচুতে ৩০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিশাল লেক; নাম পাইকু-তসো। আধ ঘণ্টা লেকের পাশে কাটিয়ে আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম। বেলা ২:৪৫টায় পৌঁছলাম তিংরি; উচ্চতা ৪,৩৪৮ মিটার। এখানে হোটেলে হাঙ্গেরির পর্বতারোহী ডেভিডের সঙ্গে দেখা হলো। ২০১০ সালের এভারেস্ট অভিযানে আমরা একই দলে ছিলাম। সেবার ক্যাম্প-১ থেকে অ্যাডভান্স বেস-ক্যাম্পে নামার পথে ডেভিডের সঙ্গী বারকোনি তুষারধসে মারা যান; আর ডেভিডকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। ডেভিড এবার শিশা-পাংমা অভিযানে এসেছে। উচ্চতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্য আমরা তিংরিতেও দু'রাত রইলাম।
৮ মে সকাল ৯টায় তিংরি থেকে বেসক্যাম্পের উদ্দেশ্যে আমাদের যাত্রা শুরু হল। রংবুক মনেস্ট্রি পার হয়ে দুপুর ১২টায় বেসক্যাম্পে পৌঁছালাম; উচ্চতা প্রায় ৫,২০০ মিটার। একই সঙ্গে এটা লাকপা-রি বেসক্যাম্প ও এভারেস্ট-বেসক্যাম্প। আমাদের দলের শেরপা, বাবুর্চি ও অন্যান্য স্টাফ এপ্রিলের শুরুতেই বেসক্যাম্পে এসেছেন। তাই আমাদের জন্য তিনটি তাঁবু আগে থেকেই পাতা ছিল। তাঁবুতে ব্যাগ রেখে গরম জুস খেয়ে বেস-ক্যাম্পটা একটু হেঁটে দেখলাম।
এখানে আমরা তিনজনই শুধু লাকপা-রি অভিযাত্রী; অন্য সবাই এভারেস্ট অভিযাত্রী। এভারেস্টের উত্তর-পূর্বেই লাকপা-রি শৃঙ্গ। আমরা তাই এভারেস্ট অভিযাত্রীদের বেসক্যাম্প, মিডল-ক্যাম্প ও অ্যাডভান্স্ড-বেসক্যাম্প ব্যবহার করব। তিনটি ক্যাম্পেই আমরা এভারেস্ট অভিযাত্রীদের সঙ্গে পাশাপাশি থাকব।
চার দিন বেস-ক্যাম্পে কাটল আমাদের। ১২ মে সকাল ৮টায় নিমা দর্জি শেরপাকে সঙ্গে নিয়ে আমরা মিডলক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। ঘণ্টা দেড়েক হাঁটার পর নেপাল-তিব্বত সীমান্তে পুমরি পবর্তশৃঙ্গের মুখোমুখি হলাম। এরপর পথ বেশ খাড়া উপরে উঠে গেছে। দুপুরে পাথরে বসে প্যাক লাঞ্চ খেলাম। এরপর পূর্ব-রংবুক হিমবাহে পাথরের বোল্ডারের উপর দিয়ে হেঁটে চড়াই-উতরাই পার হয়ে বিকাল ৩:৩০টায় পৌঁছালাম মিডলক্যাম্প; উচ্চতা প্রায় ৫,৮০০ মিটার। এখানে আমাদের জন্য তাঁবু পাতা ছিল। কুক ফুর্বার দেওয়া খাবার খেয়ে সন্ধ্যা ৭:৩০টায় আমরা ঘুমাতে গেলাম।
১৩ মে সকাল ৮টায় অ্যাডভান্সড-বেসক্যাম্পের (এবিসি)-এর উদ্দেশে রওনা হলাম। চমৎকার আবহাওয়া। প্রথমে হিমবাহের বরফ গলা পানির কাছে নেমে তারপর চড়াই। ধীরে ধীরে চড়াই বাড়ছে, অক্সিজেন কমছে আর চলার গতি কমছে। পুরোটা পথ পূর্ব-রংবুক হিমবাহের উপর দিয়ে গেছে। দু'পাশে হিমবাহের কঠিন বরফের টাওয়ার; মাঝখানে পাথরের ওপর দিয়ে আমরা হেঁটে চলেছি। আমরা হাঁর্টছি দক্ষিণমুখী হয়ে; সবসময় এভারেস্টের শীর্ষ দেখা যাচ্ছে। মাঝপথে লাকপা-রি শৃঙ্গকে দেখা গেল। এবিসিতে পৌঁছার কিছু আগে তুষারপাত শুরু হলে চারিদিক হোয়াইট আউট হয়ে গেল। বিকাল ৪:৩০টা নাগাদ পৌঁছালাম এবিসি; উচ্চতা প্রায় ৬,৪০০ মিটার।
এবিসিতে আমাদের বেশ কয়েক দিন থাকতে হবে। এখানে বিভিন্ন দলের তাঁবুগুলো দক্ষিণ থেকে উত্তরে সাজানো। তাঁবুতে ব্যাকপ্যাক রেখে ডাইনিং-টেন্টে গেলাম। বেশ ঠান্ডা লাগছে। বেস-ক্যাম্প ও এবিসির ডাইনিং-টেন্টে হিটার আছে। ডাইনিং-টেন্টে পরিচয় হলো রাশিয়ার বিখ্যাত পর্বতারোহী ভিক্টর ববক-এর সাথে। তিনি মোট পাঁচবার এভারেস্ট সামিট করেছেন; একবার দক্ষিণ আর চারবার উত্তর দিক দিয়ে। তার দলের ৫ জন রুশ আরোহী আজ ক্যাম্প-৩ যাবেন, কাল তারা সামিট করবেন। ভিক্টর এখন নিজে শিখর আরোহণ করেন না; অভিযান তদারকি করেন।
১৭ মে বৃহস্পতিবার রাত ১২:৩০টায় উঠে পোশাক পরে এলাম ডাইনিং টেন্টে। কিছুটা রাইস-পরিজ খেয়ে এবং কিছু খাবার পথে খাওয়ার জন্য ব্যাগে ভরে নিলাম। হার্নেস-সেট ও আইস-বুট পরে মাথায় হেড-টর্চ লাগিয়ে রাত ২:৩০টায় এবিসি থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হলো। ১৫ মিনিট হেঁটে ক্রাম্পন-পয়েন্টে এসে আইস বুটের নিচে ক্রাম্পন লাগালাম। দাওয়া তেনজিং শেরপা মেইন-রোপ বের করলেন। আমরা সবাই নির্দিষ্ট দূরত্বে একজনের পেছনে আরেকজন স্ক্রু-ক্যারাবিনারে দড়ি আটকিয়ে নিলাম। রাত ৩টা বাজল। আমরা ক্রাম্পন পয়েন্ট থেকে হাঁটা শুরু করলাম।
প্রথমে ইস্ট রংবুক হিমবাহে কঠিন বরফের টাওয়ারের মধ্যে দিয়ে জিগজ্যাগ চলছি; অনেকটা গোলকধাঁধাঁর মতো। টাওয়ারগুলো ৫ থেকে ২০ ফুট পর্যন্ত উঁচু। ঘণ্টা খানেক সময় লাগল এটা পার হতে। এরপর হিমবাহের একটা প্রান্তরে এসে পৌঁছলাম। তাপমাত্রা মাইনাস ১০-১৫ ডিগ্রির মতো হবে। পথটি কঠিন নয়; শুধু ক্রেভাস এড়িয়ে চলতে হচ্ছে। আস্তে আস্তে চড়াই বাড়ছে। এখানেই বিথীকে ক্রেভাস থেকে তুলে আমাদের হাঁটা অব্যাহত রয়েছে। কিছু পরে এভারেস্টের গায়ে সকালের সূর্যের প্রথম আলো লাগল। সূর্যের আলো গায়ে লাগামাত্র ফেদার জ্যাকেট খুলে ব্যাগে ঢুকালাম।
সকাল সাড়ে ৭টার দিকে আমরা ৫০-৬০ ডিগ্রি খাড়া একটা বরফের দেয়ালের সামনে এসে দাঁড়ালাম। ৬০ মিটারের মেইন-রোপ ছাড়াও আমাদের সঙ্গে ২০০ মিটার নাইলন-দড়ির একটি কয়েল আছে। তিন শেরপা মিলে বরফের দেয়ালে নাইলনের রোপ লাগালে আমরা তাতে জুমার লাগিয়ে আরোহণ শুরু করলাম। দেয়াল ওঠার পর শেরপারা নিচ থেকে দড়ি খুলে আবার ওপরে নিয়ে বাঁধলেন।
আবহাওয়া খুবই ভালো। এবার পথটা তত বেশি খাড়া না; তবে বেশ কিছু ক্রেভাস আছে। কিছু কিছু জায়গায় নরম তুষারে হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছি। এক জায়গায় নীল রঙের কঠিন বরফ পেলাম; সেখানে ক্রাম্পন আটকায় না। বার বার পা পিছলে যাচ্ছে বলে আরোহণ বেশ কষ্টসাধ্য। এরপর বেশ বড় ও বিপজ্জনক একটা ক্রেভাসের পাশ দিয়ে কিছুটা নিচে নেমে আবার ওপরে উঠতে হলো। নিচ থেকে দড়ি খুলে শেরপারা আবার ওপরে নিয়ে বাঁধলেন। একই দড়ি বার বার খোলা আর বাঁধার কাজে বেশ সময় লাগছে। বরফের এই দেয়ালের শেষ ৫০ মিটার খুব খাড়া।
দুপুর ১টার দিকে আমরা দড়ির শেষ প্রান্তের পাথুরে অংশে পৌঁছলাম। এখান থেকে চূড়া আর ১০০ মিটারের মতো হবে। পাথরে বসে সঙ্গে আনা খাবার দিয়ে আমরা মধ্যাহ্নভোজ সারলাম। দাওয়া শেরপা ও পেম্বা শেরপা পাথুরে অংশে দড়ি বেঁধে বেঁধে চূড়ার দিকে এগোতে লাগলেন। খাওয়া শেষ করে আমরা দড়িতে জুমার লাগালাম।
পাথুরে অংশের শুরুটা ততো বেশি খাড়া নয়; ২০-৩০ ডিগ্রি ঢালু হবে। সেই পাথরের ঢালের ওপর ৫০ মিটারের মতো জায়গায় আলগা অনেক টুকরা পাথর; ক্রাম্পন নিয়ে এখানে হাঁটা বেশ কষ্টকর। এরপর ৩ মিটারের মতো উঁচু একটি পাথরের দেয়াল প্রায় ৯০ ডিগ্রি খাড়া। প্রথমে কিছুটা খাড়া উঠে তারপর ডান দিকে আড়াআড়ি যেতে হচ্ছে। ক্রাম্পন নিয়ে এ দেয়াল আরোহণ করা সত্যিই কঠিন।
পাথরের দেয়াল আরোহণের পর আমরা লাকপা-রি শীর্ষের কাছে তুষারের শেষ অংশে এসে দাঁড়ালাম। এখান থেকে চূড়া আর মাত্র ১৫ মিটারের মতো হবে। তুষারের এই শেষ অংশটুকু প্রায় ৪০-৫০ ডিগ্রি খাড়া; তেমন কঠিন নয়। সূর্য তখন পশ্চিম আকাশে হেলে পড়েছে। এভারেস্টের মাথায় মেঘ ও সূর্যের লুকোচুরি চলছে। থেকে থেকে বাতাস বইছে। দাওয়া শেরপা ও পেম্বা শেরপা এরইমধ্যে চূড়ায় পৌঁছে দড়ি বেঁধে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন।
দাওয়া শেরপা আমাদের তাড়াতাড়ি চলার তাগাদা দিচ্ছেন; আবহাওয়া খারাপ হওয়ার আগেই চূঁড়া থেকে নামতে হবে। দড়িতে জুমার লাগিয়ে ধীরে ধীরে আরোহণ করে নেপাল সময় বিকাল ৩টায় আমি লাকপা-রি শীর্ষে এসে দাঁড়ালাম। আমার পেছনে এলো একে একে বিথী, বিপ্লব ও নিমা শেরপা। দাওয়া শেরপা আমাদের অভিনন্দন জানালেন। আমরা একে অপরকে আলিঙ্গন করলাম।
এ অভিযানে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে পাঁচটি প্রতিষ্ঠান: ইস্পাহানি টি লিমিটেড, প্যারাগন এগ্রো লিমিটেড, আরলা ফুডস বাংলাদেশ লিমিটেড, এমকে এন্টারপ্রাইজেস লিমিটেড ও আজিম গ্রুপ।
লেখক : পর্বতারোহী এবং দুইবার এভারেস্টজয়ী একমাত্র বাংলাদেশি
