আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের মডেলদের সম্ভাবনা
মাকসুদা আখতার
প্রকাশ : ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

লন্ডনে রানওয়েতে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো পোশাকটি ঠিক করে নিচ্ছিলাম। কয়েক মুহূর্ত পর বাংলাদেশের ডিজাইনার মাহীন খানের শোয়ের সমাপনী হাঁটায় অংশ নেব। চারপাশে আলো, সংগীত, ক্যামেরা আর ব্যস্ত মানুষের চলাচল। এমন পরিবেশে মনোযোগ থাকে হাঁটার দিকে, পোশাকের দিকে, সময়ের দিকে। তবু সেদিন আমার মনে হচ্ছিল, এ মঞ্চের সঙ্গে বাংলাদেশেরও একটি যোগ আছে। আমি বাংলাদেশে জন্মেছি। এখন আয়ারল্যান্ড আমার ঘর। আর লন্ডনের সেই রানওয়েতে আমি একজন বাংলাদেশি ডিজাইনারের কাজ তুলে ধরছিলাম। জীবনের এ তিনটি জায়গা যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য এক হয়ে গিয়েছিল।
আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের মডেলদের নিয়ে লিখতে বসলে তাই প্রথমেই আমার মনে পড়ে পরিচয়ের কথা। একজন মডেলকে দর্শক প্রথমে দেখেন তাঁর কাজের মাধ্যমে, তিনি কীভাবে পোশাকটি উপস্থাপন করছেন, ক্যামেরার সামনে কতটা স্বচ্ছন্দ, দলের সঙ্গে কতটা পেশাদারভাবে কাজ করছেন। পরে হয়ত তার দেশ বা ব্যক্তিগত গল্প সম্পর্কে জানেন। কিন্তু সেই গল্পেরও শক্তি আছে। বাংলাদেশি পরিচয় নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন জায়গায় কাজ করতে গিয়ে আমি বুঝেছি, আমাদের গল্প বলার সুযোগ তৈরি হলে মানুষ আগ্রহ নিয়ে শোনে।
আমার নিজের পথচলা বাংলাদেশ থেকে শুরু হলেও পেশাগত জীবন গড়ে উঠেছে মূলত আয়ারল্যান্ডে। সেখানে মডেলিং, সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা ও ফ্যাশন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আমি অনেক কিছু শিখেছি। ২০১৪ সালে MS Ireland জয় আমার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত ছিল। পরের বছর জ্যামাইকায় আয়ারল্যান্ডের প্রতিনিধিত্ব করে Ms Earth International খেতাব অর্জন করি। এসব অভিজ্ঞতা আমাকে নতুন মানুষের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ দিয়েছে, আবার প্রতিটি পর্যায়ে নতুন করে নিজেকে প্রস্তুত করতেও শিখিয়েছে।
একটি সাফল্যের ছবি দেখে তার পেছনের কাজ সব সময় বোঝা যায় না। মঞ্চে ওঠার আগে মহড়া থাকে, পোশাকের ফিটিং থাকে, কখনও শেষ মুহূর্তে পরিকল্পনা বদলায়। কোথায় দাঁড়াতে হবে, কতক্ষণ থামতে হবে, অন্য মডেলদের সঙ্গে কীভাবে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, সবকিছু খেয়াল রাখতে হয়। ক্যামেরার সামনেও একই কথা প্রযোজ্য। সুন্দর একটি ছবি অনেক সময়- মডেল, ফটোগ্রাফার, ডিজাইনার, মেকআপ শিল্পী ও স্টাইলিস্টের সম্মিলিত কাজের ফল। এই সহযোগিতার জায়গাটি বুঝতে পারা আমার পেশাগত জীবনে খুব কাজে এসেছে।
আমি নিউইয়র্ক, লন্ডন, প্যারিস ও মিলানের ফ্যাশন উইকে হাঁটার সুযোগ পেয়েছি। চলতি সেপ্টেম্বরে লন্ডন ফ্যাশন উইক চলাকালে Fashion London-এর মঞ্চে মাহীন খানের শো ক্লোজ করেছি। আন্তর্জাতিক কোনো অনুষ্ঠানে কাজ করতে পারা আনন্দের; কিন্তু সেদিনের অনুভূতি আলাদা ছিল, কারণ ডিজাইনারের সঙ্গে আমার জন্মভূমির সম্পর্ক রয়েছে। তাঁর পোশাক পরে হাঁটার সময় বাংলাদেশের সৃজনশীলতার একটি অংশ দর্শকের সামনে তুলে ধরতে পেরেছি, এ কথা ভাবলে এখনও ভালো লাগে।
এখানেই বাংলাদেশের মডেলদের সম্ভাবনার একটি বড় দিক দেখি। আমাদের দেশে অসাধারণ সব ডিজাইনার, কারিগর, তাঁতি, মেকআপ শিল্পী ও ফটোগ্রাফার কাজ করছেন। তাদের সৃষ্ট পোশাকের পেছনে উপকরণ, দক্ষতা ও মানুষের গল্প আছে। কোনো মডেল যখন সেই পোশাক নিয়ে আন্তর্জাতিক মঞ্চে যান, তিনি ডিজাইনারের ভাবনাটিকে দর্শকের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করেন। এভাবে মডেল ও ডিজাইনার একে অন্যের কাজকে বড় পরিসরে পরিচিত করার সুযোগ পান।
তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে জায়গা করে নেওয়ার জন্য শুধু নিজের পরিচয়ই যথেষ্ট নয়। কাজের মান, সময়ানুবর্তিতা, প্রস্তুতি ও নির্ভরযোগ্যতা খুব জরুরি। যে ডিজাইনার তার পোশাক মডেলের হাতে তুলে দেন, তিনি চান সেটি যত্ন নিয়ে উপস্থাপন করা হোক। যে ফটোগ্রাফার কয়েক সেকেন্ডে ছবিটি তুলবেন, তার সঙ্গে বোঝাপড়া তৈরি করতে হয়। কখনও দীর্ঘ অপেক্ষার পর অল্প সময়ের মধ্যে নিজের সেরা কাজটি করতে হয়। নতুন মডেলদের জন্য আমার পরামর্শ হবে, বড় মঞ্চের স্বপ্ন দেখার পাশাপাশি প্রতিদিনের কাজেও একই গুরুত্ব দিন।
নিজের পরিচয় সম্পর্কে স্বচ্ছন্দ থাকাও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশি মডেলদের একেকজনের ভাষা, বেড়ে ওঠা ও অভিজ্ঞতা আলাদা হতে পারে। কেউ দেশে থাকেন, কেউ প্রবাসে; কেউ বাংলায় কথা বলতে সবচেয়ে স্বচ্ছন্দ, কেউ দুই বা তার বেশি সংস্কৃতির মধ্যে বড় হয়েছেন। আন্তর্জাতিক মঞ্চে কাজ করতে গিয়ে আমাদের সবাইকে একই রকম হতে হবে, এমন কোনো কথা নেই। ব্যক্তিত্ব ধরে রেখে অন্যদের সঙ্গে কাজ করার দক্ষতা গড়ে তোলাই বেশি প্রয়োজন।
আমি দীর্ঘদিন আয়ারল্যান্ডে বসবাস করি এবং দেশটিকে নিজের ঘর মনে করি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের সঙ্গে আমার জন্মের সম্পর্ক রয়েছে। প্রথম দিকে এই দুই পরিচয়কে কীভাবে প্রকাশ করব, তা নিয়ে ভাবতাম। এখন মনে হয়, দু'টোই আমার জীবনের সত্য। আয়ারল্যান্ডে পাওয়া সুযোগ ও সহায়তার প্রতি আমি কৃতজ্ঞ; বাংলাদেশের ভাষা ও সংস্কৃতিও আমার সঙ্গে রয়েছে। আন্তর্জাতিক পরিসরে কাজ করা অনেক বাংলাদেশি নারীর জীবনেও হয়ত এমন একাধিক পরিচয় আছে। তাদের গল্প শোনার জায়গা তৈরি হওয়া দরকার।
মডেলিং নিয়ে প্রচলিত ধারণাগুলোর মধ্যেও পরিবর্তন প্রয়োজন। অনেক সময় নারীদের বলা হয়, একটি নির্দিষ্ট বয়সের মধ্যে স্বপ্ন পূরণ করতে হবে। মা হওয়ার পর কাজের সুযোগ কমে যাবে, এমন ধারণাও শুনতে হয়। আমি তিন সন্তানের মা। পরিবার ও কাজের দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো আমার জন্য সব সময় সহজ হয়নি। তবু আমি কাজ চালিয়ে গেছি এবং নতুন সুযোগের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করেছি। ২০২১ সালে টপ মডেল বিজয়ী হওয়ার পর থেকে সেখানে বিচারক ও কোচ হিসেবে নতুন মডেলদের সঙ্গে কাজ করছি। নিজের পথচলার পাশাপাশি তাদের বেড়ে উঠতে দেখা আমার জন্য বিশেষ আনন্দের। আমি বিশ্বাস করি, জীবনের যেকোনো পর্যায়ে নিজের স্বপ্নকে নতুনভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব। এ কথা বলার সময় বাস্তব অসুবিধাগুলোর কথাও মনে রাখা জরুরি। সন্তানের দেখাশোনা, ভ্রমণের খরচ, কাজের অনিশ্চয়তা, এসবের পরিকল্পনা করতে হয়। অনেক প্রতিভাবান নারী প্রয়োজনীয় সহায়তা না পাওয়ায় সুযোগ নিতে পারেন না। তাই মডেলদের সাফল্য নিয়ে কথা বলার পাশাপাশি তাদের কাজ করার পরিবেশ নিয়েও ভাবা উচিত। বিশেষ করে যারা পরিবার সামলাচ্ছেন বা নতুন দেশে নিজের পেশাগত পরিচয় তৈরি করছেন, তাদের জন্য সহযোগিতার মূল্য অনেক। ফ্যাশনের আরেকটি দিক আমার কাছে দিন দিন বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে : পোশাকের প্রতি আমাদের দায়িত্ব। আমি আইরিশ ডিজাইনারদের কাজ তুলে ধরেছি; পাশাপাশি দাতব্য দোকান থেকে পাওয়া পোশাক ও আনুষঙ্গিক সামগ্রী আবার পরেছি। কান ও ভেনিসের চলচ্চিত্র উৎসবের লালগালিচায় পোশাক বেছে নেওয়ার সময়ও নতুন নকশার পাশাপাশি পুরোনো জিনিসকে নতুনভাবে ব্যবহার করার কথা ভেবেছি। একটি পোশাক একবার পরার পর তার মূল্য শেষ হয়ে যায় না। যত্ন, সৃজনশীলতা ও উপস্থাপনার মাধ্যমে সেটি আবার নতুন জীবন পেতে পারে।
বাংলাদেশের ফ্যাশনেও এ ভাবনার জায়গা রয়েছে। আমাদের হাতে তৈরি কাপড় ও পোশাকের পেছনে অনেক মানুষের শ্রম থাকে। আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে সেই কাজ তুলে ধরতে গেলে কারিগরদের অবদান স্বীকার করা উচিত। একটি পোশাকের ছবিতে ডিজাইনারের নামের সঙ্গে প্রয়োজনমতো- কারিগর, স্টাইলিস্ট, মেকআপ শিল্পী ও ফটোগ্রাফারের নামও আসুক। যাদের হাতে কাজটি তৈরি, তাদের পরিচিতি বাড়লে পুরো সৃজনশীল ক্ষেত্রই উপকৃত হবে।
আজ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে একজন নতুন মডেল নিজের কাজ বিশ্বের নানা জায়গায় দেখাতে পারেন। এটি বড় সুযোগ, তবে ছবি প্রকাশ করলেই কাজ এসে যাবে; এমন নয়। ভালো পোর্টফোলিও তৈরি, কাজের সঠিক তথ্য দেওয়া, সহযোগীদের কৃতিত্ব উল্লেখ করা এবং যোগাযোগে পেশাদার থাকা জরুরি। তরুণদের আমি বলব, শুরুতেই নিজেকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা করবেন না। ছোট কাজেও যত্ন নিন। কী ধরনের কাজ করতে চান, কোন দক্ষতা বাড়ানো প্রয়োজন এবং কাদের সঙ্গে শিখতে পারবেন, সেসব ভেবে ধীরে ধীরে এগোন।
সুযোগ পাওয়ার পাশাপাশি সম্মানজনক কর্মপরিবেশও প্রয়োজন। একজন মডেল যেন কাজের শর্ত বুঝে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন, পারিশ্রমিক সম্পর্কে পরিষ্কার ধারণা পান এবং সেটে তার সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা হয়। নতুনদের অনেক প্রশ্ন থাকতে পারে; সেগুলো করতে সংকোচ বোধ করা উচিত নয়। পেশাটিকে গুরুত্ব দিলে এর সঙ্গে যুক্ত প্রত্যেক মানুষের শ্রমকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
আমি চাই, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের মডেলদের উপস্থিতি আরও বাড়ুক এবং সেই উপস্থিতির মধ্যে নানা ধরনের মানুষ ও গল্প দেখা যাক। কেউ উচ্চ ফ্যাশনে কাজ করবেন, কেউ বিজ্ঞাপনে, কেউ অভিনয়ের সঙ্গে মডেলিং মিলিয়ে এগোবেন। তাদের পথ এক হবে না। প্রয়োজন- প্রশিক্ষণের সুযোগ, পরস্পরের সঙ্গে পরিচয়, ভালো কাজ দেখানোর জায়গা এবং অভিজ্ঞ মানুষের সহায়তা। দেশের ডিজাইনার ও বিদেশে কাজ করা বাংলাদেশি মডেলদের মধ্যে আরও সহযোগিতা হলে নতুন দরজাও খুলতে পারে।
লন্ডনে মাহীন খানের শোয়ের সেই শেষ হাঁটাটি আমার মনে থাকবে। আলো নিভে যাওয়ার পর, ছবি প্রকাশের পরও এর অর্থ আমার কাছে রয়ে গেছে। বাংলাদেশের একজন ডিজাইনারের কাজ আমি আন্তর্জাতিক দর্শকের সামনে উপস্থাপন করেছি; এটি ছিল আমার ব্যক্তিগত যাত্রার সঙ্গে জন্মভূমির একটি সুন্দর মিলন। সামনে আরও বাংলাদেশি মডেল এমন সুযোগ পাবেন বলে আমি আশা করি। তাদের প্রত্যেকের নিজস্ব গল্প থাকবে, নিজস্ব কাজ থাকবে। সেই কাজের মধ্য দিয়েই বিশ্ব বাংলাদেশের সৃজনশীলতাকে আরও কাছ থেকে চিনবে।
লেখক : মডেল এবং পাইলট
