টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ অভিষেক রাঙাতে চায় ফুটবলের ইতালি
প্রকাশ : ১১ জানুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রীড়া ডেস্ক

বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গণে ইতালিকে সবাই জানে ফুটবলের দেশ হিসেবে। কিন্তু এবার দেশটিকে দেখা যাবে ক্রিকেট বিশ্বকাপে খেলতে। প্রথমবার ক্রিকেটের কোনো বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে খেলার জন্য রোমাঞ্চ নিয়ে অপেক্ষা করছে ইতালি। এখন পর্যন্ত একটিও প্রাকৃতিক পিচ নেই তাদের, তব্ওু আশা করছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে নিজেদের মেলে ধরে ফুটবল-পাগলের দেশে জায়গা করে নিতে পারবে ক্রিকেট। ইংলিশ, অস্ট্রেলিয়ান, দক্ষিণ আফ্রিকান, পাকিস্তানী ও ভারতীয় বংশোদ্ভূত বেশ কয়েকজন ক্রিকেটার নিয়ে ভারত ও শ্রীলঙ্কায় অনুষ্ঠেয় টুর্নামেন্টে খেলবে ইতালি।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে র্যাংকিংয়ের দিক থেকে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দল ইতালি, তাদের অবস্থান ২৮ নম্বরে। ইউরোপীয় অঞ্চলের বাছাইয়ে চমক জাগিয়ে ২০ দলের টুর্নামেন্টে জায়গা করে নেয় তারা। অস্ট্রেলিয়ায় জন্ম নেওয়া অলরাউন্ডার হ্যারি মানেন্তি এখন খেলছেন বিগ ব্যাশ লিগে। বিশ্বকাপে খেলার জন্য যেন তর সইছে না তার। ‘আমরা সারা বিশ্ব থেকে এসেছি। তবে আমাদের প্রত্যেকের ইতালির সঙ্গে গভীর সংযোগ আছে। আমার মনে হয়, যখন আপনি আমাদের বিশ্বকাপে খেলতে দেখবেন তখন এটা বুঝতে পারবেন আপনারা দেখবেন আমরা ইতালির জন্য কতটা গর্বিত।’
অ্যাডিলেইড স্ট্রাইকার্সে খেলা ২৫ বছর বয়সী মানেন্তির দাদা ছিলেন ব্রেশিয়ার বাসিন্দা। মানেন্তির বাবা জন জন মানেন্তি অস্ট্রেলিয়া উইমেন’স রাগবি দলের কোচ। ভাই বেনের সঙ্গে ইতালি দলে খেলছেন মানেন্তি। বাছাইয়ে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে মহাগুরুত্বপূর্ণ জয়ে বড় অবদান রেখেছেন তিনি ৫ উইকেট নিয়ে। বাছাই পর্বে ইতালির অধিনায়ক ছিলেন এক সময়ে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলা জো বার্নস। চুক্তি নিয়ে জটিলতায় তাকে বাদ দেয় ইতালিয়ান ক্রিকেট ফেডারেশন (এফসিআরআই)। ২০০৬ সালে হকি বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রতিনিধিত্ব করা ওয়েইন ম্যাডসেন হয়েছেন নতুন অধিনায়ক।
দলের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়দের মধ্যে আছে ইংল্যান্ডে জন্ম নেওয়া অলরাউন্ডার এমিলিও গে, ভারতীয় বংশোদ্ভূত অলরাউন্ডার জাসপ্রিত সিং এবং পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া ব্যাটসম্যান সৈয়দ নাকভি। দলের কোচ জন ডেভিসনের আছে বিশ্বকাপে খেলার অভিজ্ঞতা। ২০০৩ সালে কানাডার হয়ে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৬৭ বলে সেঞ্চুরি করে নজর কেড়েছিলেন তিনি। সেই সময়ে সেটা ছিল বিশ্বকাপে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড। তার কথায় উঠে এলো ইতালি দল কতটা বৈচিত্র্যপূর্ণ। ‘আমাদের দলটা যেন কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি দলের মতো। সারা বিশ্ব থেকে ওরা এসেছে। তবে জাতীয় দলের জন্য আছে তাদের গভীর ভালোবাসা।’ ইতালির হয়ে খেলা কতটা আবেগের উঠে এলো মানেন্তির কথায়। উদাহারণ হিসেবে বিশ্বকাপ বাছাইয়ের একটি টিম মিটিংয়ের কথা বললেন তিনি।
‘যখন মিটিং শেষ হলো, তখন সম্ভব ১০ বা ১৫ জন পূর্ণবয়ষ্ক মানুষের কেউ কাঁদছিল, কারও চোখে ছিল জল।’ এফসিআরআইর মহাসচিব লুকা ব্রুনো মালাস্পিনা বললেন, সীমিত সুযোগ-সুবিধা নিয়ে কাজ চালিয়ে নেওয়া অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। ‘ইতালিতে আমাদের শুধু কৃত্রিম পিচ আছে, বিশ্বকাপে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে শুধু আমাদের কোনো প্রাকৃতিক পিচ নেই।’ ২০২৮ লস এঞ্জেলস অলিম্পিকে ফিরছে ক্রিকেট। মালাস্পিনা মনে করছেন, ক্রিকেটের এই অন্তর্ভূক্তি দেশে প্রথম প্রাকৃতিক পিচ তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। ‘এটা এমন কিছু যা আমাদের অনেক সাহায্য করতে পারে। কারণ, ইতালিতে অলিম্পিকের খেলাগুলো খুব গুরুত্বপূর্ণ।’
ইতালির বড় ফুটবল ক্লাব এসি মিলান ও জেনোয়ার অতীতে ক্রিকেট দল ছিল। তবে এই খেলা দেশটিতে কখনও খুব একটা জনপ্রিয়তা পায়নি। ২০০৯ সাল থেকে ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেটে খেলছেন ম্যাডসেন। ডার্বিশায়ারের এই ব্যাটিং গ্রেট বললেন নিজের অভিজ্ঞতার কথা। ‘যখন আমি ইতালিয়ান অলিম্পিক কমিটির ফ্যাসিলিটিজে গেলাম, দেখলাম এমনকি চিকিৎসকরাও জানেন না আমাদের কি করা উচিত।’ ৪২ বছর বয়সী ম্যাডসেন মনে করেন, টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে তাদের ভালো পারফরম্যান্স উত্তরসূরী ক্রিকেটারদের এগিয়ে আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।
শুধু যে ফ্যাসিলিজের ঘাটতি আছে ইতালি তা নয়, জটিল ক্রিকেট খেলা ইতালিয়ানদের সহজ করে বোঝানোও এফসিআরআইয়ের জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। মালাস্পিনা খুঁজছেন উত্তরণের পথ। ‘স্কুল পর্যায়ে আমাদের কিছু কর্মসূচি আছে, যেগুলো শিশুদের ক্রিকেটের সঙ্গে পরিচিত করছে এবং প্রতিযোগিতা করছে। কিন্তু খেলোয়াড়রা ক্লাব ক্রিকেটে যুক্ত হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ পাচ্ছে না, যেটা তারা করতে পারছে ফুটবলের ক্ষেত্রে। এটা কিছুটা অদ্ভূত যে, আমরা এই বছরের বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়েছি কিন্তু ফুটবল বিশ্বকাপে এখনও পারিনি।’ ফুটবলে চারবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইতালি। গত দুই আসরে চূড়ান্ত পর্বে খেলতে পারেনি দলটি। এই বছরও খেলতে হলে পার হতে হবে প্লে-অফে কঠিন বাধা।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে সাবেক দুই বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড ও ওয়েস্ট ইন্ডিজ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশ বাংলাদেশ ও নেপালের সঙ্গে ‘সি’ গ্রুপে আছে ইতালি। বিশ্বকাপে তাদের প্রথম প্রতিপক্ষ লিটন দাসের দল। আরও অনেক বিশ্ব আসরে খেলার স্বপ্ন নিয়ে টুর্নামেন্টে যেতে চান মানেন্তি। ‘ইতালিতে জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা শিশুরা এই খেলাটাকে বেছে নেবে, খেলতে ভালোবাসবে, এটা দেখা হবে দারুণ ব্যাপার। আশাকরি, যখন আমাদের বয়স আরও বাড়বে, আমরা তাদের অন্য বিশ্বকাপে ইতালির হয়ে খেলতে দেখব।’
