ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতি মুক্ত রাখার অঙ্গীকার

ফুটবলার থেকে মন্ত্রী

প্রকাশ : ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া প্রতিবেদক

দেশের ফুটবলাঙ্গণে এক পরিচিত নাম আমিনুল হক। ২০০৩ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ জয়ী বাংলাদেশ দলের কিংবদন্তি গোলরক্ষক ও অধিনায়ক। দীর্ঘ সময় জাতীয় দলের গোলপোস্টের অতন্দ্র প্রহরী ছিলেন তিনি। ফুটবল ছাড়ার পরপরই রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন আমিনুল। বর্তমানে দলটির কেন্দ্রীয় কমিটির ক্রীড়া সম্পাদক ও ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়কের দায়িত্ব পালন করছেন। শেষ পর্যন্ত খেলার মাঠ থেকে রাজনীতির ময়দান মাড়িয়ে এখন মন্ত্রণালয়ে আমিনুল হক। নবগঠিত সরকারের যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। টেকনোক্র?্যাট কোটায় এ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাকে। গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সয়সদ নির্বাচনে ঢাকা-১৬ আসন থেকে বিএনপির হয়ে লড়াই করেন আমিনুল। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী মনোনীত প্রার্থী কর্নেল (অব.) মো. আবদুল বাতেনের কাছে হেরে যান তিনি। তবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে নির্বাচনে জয়লাভ করে বিএনপি। এরপর থেকেই ক্রীড়ামন্ত্রী কে হবেন এনিয়ে শুরু হয় জল্পনাকল্পনা। বিসিবির সাবেক সভাপতি আলী আসগর লবী ও সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী নিতাই রায়ের নাম শোনা গেলেও আমিনুল হকই মন্ত্রী হলেন।

প্রতিমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার পর দেশের ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতিকীকরণ না করার ঘোষণা দিয়েছেন আমিনুল হক। সাবেক ফুটবলার বলেন, একদিনেই সব পরিবর্তন সম্ভবও না। লম্বা সময়ের চর্চা প্রয়োজন। আমি নিশ্চিত করতে চাই খেলাকে রাজনীতিকীকরণ করা কিংবা কোনো দলের প্ল্যাটফর্মে পরিণত করা হবে না। যারা সত্যিকারভাবে খেলাকে ভালোবাসে ও স্পোর্টিং কমিউনিটির উচিত তাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করা।

আমিনুল হক বিভিন্ন সময় ক্রীড়াঙ্গন নিয়ে আলোচনার সময় বলেন, ‘জাতীয় শিক্ষাক্রমে চতুর্থ শ্রেণি থেকে খেলাধুলা বাধ্যতামূলক করা, ‘নতুন কুঁড়ি স্পোর্টস’-কর্মসূচির মাধ্যমে ১২-১৪ বছরের প্রতিভাবান ক্রীড়া শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান করা, ৪৯৫টি উপজেলায় মানসম্পন্ন ইনডোর স্টেডিয়াম নির্মাণ করা ও ৬৪ জেলায় ইনডোর সুবিধাসম্পন্ন স্পোর্টস ভিলেজ নির্মাণ করা হবে।’ তার আগের এই কথাগুলো শুধু কথার কথাই ছিল না। বিএনপির ইশতেহারেও সেটা উপস্থাপন করা হয়েছে প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ক্রীড়া ছড়িয়ে দিতে হলে সেখানে ক্রীড়ায় অভিজ্ঞদের ভূমিকা থাকতে হবে। তাই আমিনুল হক অগ্রাধিকার দেবেন দেশের সব উপজেলায় ক্রীড়া অফিসার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ক্রীড়া শিক্ষক নিয়োগে। এমনকি খেলাধুলার ডিসিপ্লিনভুক্ত শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিও গুরুত্ব দেবেন আমিনুল। প্রতিটি বিভাগীয় শহরে বিকেএসপির শাখা প্রতিষ্ঠা করা, সব মহানগরসহ দেশের গ্রামীণ জনপদে খেলার মাঠের সুব্যবস্থা করা, দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ও সুবিধাবঞ্চিতদের খেলার সুযোগ নিশ্চিত করা এবং দেশে ক্রীড়া সরঞ্জাম ইন্ডাস্ট্রি স্থাপন করার অঙ্গীকারও করা হয়েছে আমিনুল হকের দল থেকে। মাঠের স্বল্পতার কথা সবসময়ই বলেছেন আমিনুল। খেলাধুলার অন্যতম শর্ত হচ্ছে খেলার পরিবেশ তৈরি এবং মাঠের সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করা। বিএনপির ইশতেহারে সে দিকটাও উল্লেখ করা হয়েছে। ওয়ার্ডভিত্তিক মাঠ তৈরি ও মাঠ দখলমুক্ত করা, থানাভিত্তিক খেলার মাঠ তৈরি করার পরিকল্পনা গ্রহণ এবং সম্ভব হলে দুটি ওয়ার্ডের মধ্যে একটি মাঠ গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণের কথাও বলেছে বিএনপি। যেসব মাঠ দখল হয়ে আছে সেগুলো বেদখল করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছে দলটি। এ প্রতিশ্রুতিগুলো ধীরে ধীরে বাস্তাবায়ন করতে হবে আমিনুলকে।

আগামী ৫ বছরে দেশের খেলাধুলাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কীভাবে গ্রহণযোগ্য স্থানে নেওয়া যায়, সেই পরিকল্পনা করে তা বাস্তবায়নের কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে আমিনুলকে। মাল্টি গেমস ইভেন্ট, যেমন সাউথ এশিয়ান গেমস, এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমস, অলিম্পিক গেমসে বাংলাদেশের সম্মানজনক স্থান অর্জনের জন্য দেশে একটি আধুনিক জাতীয় অলিম্পিক একাডেমি প্রতিষ্ঠা করার পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে বিএনপির ইশতেহারে। ক্রিকেট, ফুটবল ও হকির পাশাপাশি বাস্কেটবল, ভলিবল, দাবা ও অন্যান্য খেলায়ও পেশাদার লিগ চালুর কথা ও বিভিন্ন সময় আলোচনা করেন আমিনুল। এগুলো তার দলের ইশতেহারেও যোগ করা হয়েছে। ‘স্পোর্টস ইকোনমি’কে সম্প্রসারণ ও উৎসাহ প্রদান করা, যাতে ক্রীড়াঙ্গন দেশের অর্থনীতিতে মূল্য সংযোজন করতে পারে সে লক্ষ্যে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের কথাও বলা হয়েছে। খেলাধুলার মানোন্নয়নের জন্য ক্রীড়ায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং পিপল-টু-পিপল সম্পর্ক বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘স্পোর্টস ডিপ্লোম্যাসি’-কে গুরুত্বারোপ করা হবে। দেশে আধুনিক ক্রীড়া বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন করার বিষয়টিও উল্লেখ করেছে বিএনপি।

নবনিযুক্ত প্রতিমন্ত্রী জানান, ক্রিকেট ও ফুটবলের পাশাপাশি প্রতিটি ফেডারেশনের জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের সরকারি বেতনের আওতায় আনা হবে। এছাড়া ঢাকা মহানগরের প্রতি দুটি ওয়ার্ডের জন্য অন্তত ৩ থেকে ৪ বিঘা আয়তনের একটি খেলার মাঠ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দেন তিনি। আন্তর্জাতিক বাজারের কথা মাথায় রেখে বাংলাদেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘স্পোর্টস ইন্ডাস্ট্রি’ তৈরির পরিকল্পনাও রয়েছে তার, যার মাধ্যমে দেশের তৈরি ক্রীড়া সামগ্রী বিদেশে রপ্তানি করে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব হবে। বিগত দিনের অস্থিতিশীল ক্রীড়াঙ্গনের কথা উল্লেখ করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, খেলোয়াড়, সংগঠক এবং সাংবাদিকদের মধ্যে যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা ঘুচিয়ে একটি পারিবারিক পরিবেশ তৈরি করা হবে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘আমি অবকাঠামো নয়, বরং খেলোয়াড়দের সুযোগ-সুবিধার দিকে বেশি মনোযোগী হতে চাই।’

গত নভেম্বরে সরকারি হস্তক্ষেপের অভিযোগে বড় এক অংশ নির্বাচন বয়কট করার পর যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছিল, তা নিরসনে আলোচনার ওপর জোর দিয়েছেন ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘আমি আগেও বলেছি, এখনও বলছি- ক্রিকেট বোর্ডের সর্বশেষ নির্বাচনটি ছিল অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। বিষয়টি যেহেতু আইসিসির অধীনে এবং তাদের নির্দিষ্ট নিয়মণ্ডকানুন রয়েছে, তাই আমরা আইসিসির বিধি-বিধান মেনেই সবার সঙ্গে বসব। আলোচনার মাধ্যমে কিভাবে একটি সুন্দর ও গ্রহণযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছানো যায়, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।’ তিনি আরও জানান, আইসিসি ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের সঙ্গে পর্যালোচনার পরই এ বিষয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করবেন তিনি।

নিজে সাবেক ফুটবলার বলেই প্রবাসী হামজা চৌধুরী-শোমিত সোমদের আগমণের সুযোগ কাজে লাগানোর পরামর্শ বাফুফেকে দিলেন আমিনুল। ফুটবলের প্রতি ‘পক্ষপাত’ নয়, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী হিসেবে সব খেলার উপর সমান দৃষ্টি দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। ‘দেখুন, আমি যেহেতু ফুটবলার, তবে শুধু ফুটবল নয়, সব খেলাকে সমান গুরুত্ব দিয়ে আগাব। যেহেতু আমাদের ফুটবল... আমরা সম্প্রতি দেখেছি শেষ ছয়-সাত মাস বা এক বছরের মধ্যে হামজা চৌধুরী বা আরও অনেক ভালো ভালো খেলোয়াড়দের আগমনের কারণে কিন্তু ফুটবলে অন্যরকম একটি প্রাণ ফিরে এসেছে। এটিকে কাজে লাগাতে হবে।