রোমাঞ্চের ম্যাচে নায়ক হাসান মাহমুদ

প্রকাশ : ০১ মার্চ ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া প্রতিবেদক

একটি স্ট্রেট ড্রাইভ, আরেকটি কাভার ড্রাইভ। রবিউল হকের বলে হাসান মাহমুদের শট দুটি দেখে কে বলত, তিনি একজন টেলএন্ডার! ওই দুটি শটে দুই দলের স্কোর হয়ে গেল সমান। এক বল পরই ওয়াইডে নিশ্চিত হলো জয়। খুব বেশি উচ্ছ্বাস নেই, স্রেফ মুষ্ঠিবদ্ধ হাত দেখিয়ে উদযাপন করলেন হাসান। মূলত পেসার হলেও এ দিন তিনি হয়ে উঠেছিলেন পুরোদস্তুর ব্যাটসম্যান। মুশফিক হাসানের সঙ্গে অসাধারণ এক শেষ জুটিতে জয় এনে দিলেন তিনি পূর্বাঞ্চলকে। বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের একদিনের ম্যাচের আসরের উত্তেজনাপূর্ণ ম্যাচে দক্ষিণাঞ্চলকে ১ উইকেট হারাল পূর্বাঞ্চল। গতকাল শনিবার বগুড়ার শহিদ চান্দু স্টেডিয়ামে ম্যাচটি ছিল দুই দলেরই শেষ জুটির অসাধারণ পারফরম্যান্সের গল্প। শেষ জুটির ৩০ রানের সৌজন্যে দক্ষিণাঞ্চল করতে পারে ১৮০ রান। সেই রান টপকাতে পূর্বাঞ্চল নবম উইকেট হারায় ১৪১ রানে।

সেখান থেকে হাসান ও মুশফিক অবিচ্ছিন্ন ৪১ রানের জুটিতে জিতিয়ে দেন দলকে। জুটিতে অগ্রণী ছিলেন হাসান। সত্যিকারের ব্যাটসম্যানের মতোই মুশফিককে আগলে রেখে দলকে জয়ের ঠিকানায় নিয়ে যান তিনি। ৫ চারে অপরাজিত থাকেন তিনি ৩৫ রানে। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে ৮১ ম্যাচের ক্যারিয়ারে তার সেরা ইনিংস এটি। এমন ব্যাটিংয়ের আগে বল হাতেও ৩ উইকেট নিয়ে হাসানই ম্যাচের সেরা। তার সঙ্গে জুটিতে মুশফিকের অবদান ছিল কেবল ৪ রান। তবে ৩৫টি বল খেলেন পূর্বাঞ্চলের ১১ নম্বর ব্যাটসম্যান, যা ছিল মহামূল্য।

ব্যাট হাতে ব্যর্থ সৌম্য সরকার বল হাতে ক্যারিয়ার সেরা বোলিংয়ে ৩২ রানে ৪ উইকেট নিয়ে দলকে লড়াইয়ে রাখেন। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। জিতে অবশ্য খুব বেশি লাভ হয়নি পূর্বাঞ্চলের। তাদের বিদায় নিশ্চিতই ছিল। হেরে সর্বনাশ হয়ে গেছে দক্ষিণাঞ্চলের। জিতলে ফাইনালে যেত তারা, হেরে ছিটকে গেছে তারাও। বগুড়ার উইকেট এমনিতে দারুণ ব্যাটিং সহায়ক হলেও এ দিনের চিত্র ছিল ভিন্ন। ঘাসের ছোঁয়া থাকা উইকেট পরীক্ষায় ফেলেছে ব্যাটসম্যানদের।

রান তাড়ায় চতুর্থ ওভারে পারভেজ হোসেন ইমনকে (৪) হারায় পূর্বাঞ্চল।

নতুন বলে শুরু করা দক্ষিণাঞ্চল অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজকে সুইপ করে শর্ট ফাইন লেগেই ধরা পড়েন তিনি। আরেক ওপেনার জাকির ১৬ রান করে আউট হন শহিদুল ইসলামের অনেক বাইরের বলে বাজে শটে। তৃতীয় উইকেটে ৫২ রানের জুটি গড়েন মুমিনুল হক ও শাহাদাত হোসেন। তানভির ইসলামের বলে প্রিয় সুইপ শটে মুমিনুলের (৫০ বলে ২৯) বিদায়ে ভাঙে এই জুটি।

এরপরই দৃশ্যপটে আগমন সৌম্যর এবং পূর্বাঞ্চলের ব্যাটিংয়ে ধস। অধিনায়ক ইয়াসির আলি (৬) চৌধুরি শর্ট মিড উইকেটে ক্যাচ দেন আলতো শটে। বাউন্ডারি মারার পর ভেতরে ঢোকা বলে আসলে শটে এলবিডব্লিউ হন আসরে প্রথম খেলতে নামা জাকের আলি (৫)। দারুণ এক শটে ছক্কার পর আরেকটির চেষ্টায় সীমানায় ধরা পড়েন শাহাদাত (৬২ বলে ৪২)। টানা তিন ওভারে সৌম্যর তিন উইকেটের পর নাসুম আহমেদকে বিদায় করেন মিরাজ। ২২ রানের মধ্যে ৫ উইকেট হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়ে পূর্বাঞ্চল। সৈয়দ খালেদ আহমেদকে বেশিক্ষণ টিকতে দেননি রবিউল হক।

ব্যাটে-বলে ফর্মে থাকা নাঈম হাসান আবারও চেষ্টা করছিলেন দলকে এগিয়ে নিতে। কিন্তু ২০ রানে তিনি স্টাম্পে টেনে আনেন বল। চতুর্থ উইকেট পূর্ণ হয় সৌম্যর। লিস্ট ‘এ’ ক্যারিয়ারে তৃতীয়বার ৪ উইকেট নিলেন তিনি।

তখন মনে হচ্ছিল দক্ষিণাঞ্চলের জয় শুধু সময়ের ব্যাপার। কিন্তু হাসান ও মুশফিকের বীরত্বগাঁথায় বদলে গেল গল্প। সকালে টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা দক্ষিণাঞ্চল ষষ্ঠ ওভারে হারায় ওপেনার সৌম্যকে। নাঈম হাসানের ড্রিফটে বিভ্রান্ত হয়ে ভুল লাইনে খেলে বোল্ড হন বাঁহাতি ওপেনার। আসরের তিন ম্যাচে অভিজ্ঞ ওপেনারের রান ০, ৯ ও ৯। আরেক ওপেনার আনিসুল ইসলাম ইমন দলকে এগিয়ে নেন একরকম একাই। দলের রান যখন ৭১, তখন ফিফটি হয়ে যায় তার। তবে ফিফটির পরই ক্রিজ ছেড়ে বেরিয়ে নাঈমকে ছক্কার চেষ্টায় ধরা পড়েন তিনি মিড উইকেট সীমানায়।

তিনে নামা আজিজুল হাকিম ধুঁকে ধুঁকে আউট হন সৈয়দ খালেদ আহমেদের বাউন্সারে। আগের দুই ম্যাচে অপরাজিত ফিফটি করা মোহাম্মদ মিঠুন ১০ রান করে উইকেট উপহার দেন নাঈমকে। হাসান মাহমুদের বলে গালিতে ইয়াসির আলির দুর্দান্ত ক্যাচে নুরুল হাসান সোহান ফেরেন শূন্যতে। নাসুম আহমেদের বলে বাজে শটে উইকেট হারান অধিনায়ক মেহেদী হাসান মিরাজ (৪)। অনেকক্ষণ একপ্রান্ত আগলে রাখা মুশফিক হাসানের বলে বোল্ড হয়ে যান পায়ের পেছন দিয়ে। প্রথম ম্যাচের সেঞ্চুরিয়ান এবার ৫২ বলে করেন ২৪। মূল ব্যাটসম্যানদের সবাইকে হারিয়ে বিপর্যস্ত দলকে এগিয়ে নেন দুই পেসার রবিউল হক ও শহিদুল ইসলাম। ৩ চার ও ২ ছক্কায় ৩১ রানের ইনিংস খেলেন রবিউল। রবিউল ও তানভির ইসলামকে যখন এক ওভারে ফেরালেন হাসান, দক্ষিণাঞ্চলের রান ৯ উইকেটে ১৫০। সেখান থেকে দলকে ১৮০ রানে নিয়ে যান শহিদুল।

৩০ রানের জুটি আসে শেষ উইকেটে, সেখানে রুয়েল মিয়ার অবদান ৮ বল খেলে শূন্য। শহিদুল করেন ২৮ রান। খালেদের এক ওভারে চার মারেন টানা চারটি। শহিদুলের বিদায়েই শেষ হয় ইনিংস। তখন ভাবা যায়নি, কতো নাটক জমা আছে ম্যাচের শেষ ভাগে!