আজানের ব্যাটে বাংলাদেশকে পাল্টা জবাব দিচ্ছে পাকিস্তান

প্রকাশ : ১০ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া প্রতিবেদক

ঢাকা টেস্টর প্রথম দিনটা দুর্দান্ত কাটলেও দ্বিতীয় দিনে কিছুটা অস্থিতে ভুগেছে বাংলাদেশ। নাজমুল হোসেন শান্তর সেঞ্চুরি এবং মুমিনুল হক ও মুশফিকুর রহিমের ফিফটিতে প্রথম ইনিংসে চারশ ছাড়াল বাংলাদেশের পুঁজি। তবে ব্যাটারদের গড়ে দেওয়া শক্ত ভিতের সঙ্গে তাল মেলাতে পারলেন না বোলার-ফিল্ডাররা। বিশেষ করে, তিন পেসার তাসকিন আহমেদ, ইবাদত হোসেন ও নাহিদ রানা ভুগলেন লাইন ও লেংথ ঠিক রাখতে। পাশাপাশি স্লিপে একটি করে ক্যাচ ছাড়লেন মাহমুদুল হাসান জয় ও সাদমান ইসলাম। স্বাগতিক দলের এলোমেলো বোলিং ও ক্যাচ মিসের পুরো ফায়দা তুলে নিল পাকিস্তান।

দ্যুতি ছড়িয়ে বাংলাদেশ জন্য দ্বিতীয় দিনটি বিবর্ণ, ধূসর করে দিলেন দুই অভিষিক্ত আজান আওয়াইস ও আব্দুল্লাহ ফজল। এর আগে মিরপুর টেস্টের দ্বিতীয় দিনে ৪ উইকেটে ৩০১ রান নিয়ে খেলতে নামা বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস শেষ হয় ৪১৩ রানে। ৩৯তম জন্মদিনে মুশফিকুর রহিম আউট হন ৭১ রানে। পাকিস্তানের আব্বাস শিকার করেন ৫ উইকেট। প্রথম ইনিংসে স্বাগতিকদের ৪১৩ রানের জবাবে ১ উইকেটে ১৭৯ রান তুলে দিন শেষ করেছে পাকিস্তান। ২৩৪ রানে অতিথিরা পিছিয়ে থাকলেও শুরুর ব্যাটিং পরীক্ষায় উতরে গিয়ে আনন্দে আত্মহারা সফরকারিরা। অভিষেকে শতরানের সম্ভাবনা জাগিয়ে ৮৫ রানে অপরাজিত থেকে দিন শেষ করেন আজান। ২১ বছর বয়সী ব্যাটসম্যানের ১৩৩ বলের ইনিংসে বাউন্ডারি ১২টি। ২৩ বছর বয়সী ফাজাল অপরাজিত ৩৭ রানে।

মাঝেমধ্যে দু-একটি সুযোগ তৈরি করা, কয়েক বার ব্যাটের কানা একটুর জন্য নিতে না পারা, এরকম কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া বাংলাদেশের তিন পেসারের বোলিং ছিল ধারহীন। দেড় বছর পর ফিরে একদমই বিবর্ণ ছিলেন তাসকিন আহমেদ, ওভারপ্রতি পাঁচের বেশি রান দিয়েছেন নাহিদ রানা। ১৪০ কিলোমিটারের আশেপাশে বল করলেও খুব একটা প্রভাব রাখতে পারেননি ইবাদত হোসেন চৌধুরিও। উইকেটও এ দিন মনে হয়েছে দারুণ ব্যাটিং সহায়ক। মাঝেমধ্যে কিছুটা অসমন বাউন্স ছাড়া তেমন কিছু দেখা যায়নি। পাকিস্তানের দুই ওপেনার শুরু থেকেই ছিলেন বেশ ইতিবাচক। প্রথম পাঁচ ওভারে বাউন্ডারি আসে চারটি, ১০ ওভারে দলের রান স্পর্শ করে ৫০। শুরুতে অগ্রণী ছিলেন ইমামণ্ডউল-হাক, পরে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন আজান।

বাংলাদেশের পেসারদের বোলিং ছিল অধারাবাহিক। কিছু ভালো ডেলিভারি তারা করেছেন, সঙ্গে বাউন্ডারি বলও উপহার দিয়েছেন। নাহিদ রানার প্রথম ডেলিভারিই ছোবল দেয় আজানের হেলমেটে। বেশ বিপর্যস্তই মনে হচ্ছিল তাকে তখন। কিন্তু তরুণ ওপেনার সামলে নেন দ্রুতই। পরে অবশ্য নাহিদকে দারুণ খেলেছেন তিনি, টানা তিনটি চারও মেরেছেন তাকে। ইমাম অবশ্য সুযোগ দিয়েছিলেন ২৩ রানে, ইবাদতে বলে স্লিপে কঠিন ক্যাচটি নিতে পারেননি মাহমুদুল হাসান জয়। ওভারপ্রতি প্রায় ৫ রান তুলে দলের শতরান আসে ২১তম ওভারে। পরের বলেই আজান ফিফটিতে পা রাখেন ৬৫ বলেই। পরের ওভারেই জুটি ভাঙে ১০৬ রানে। মেহেদী হাসান মিরাজের দারুণ ডেলিভারিতে ইমাম এলবিডব্লিউ হয়ে যান ৪৫ রানে।

ফাজাল তিনে নেমে বেশ সতর্ক ছিলেন শুরুতে। প্রথম ১৮ বলে রানের দেখা পাননি তিনি। পরে নাহিদের বলে দারুণ এক বাউন্ডারিতে প্রথম রানের স্বাদ পান। এরপর বেশ গোছানো ব্যাট করেন তিনি। আজান প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৩৩ ম্যাচেই সেঞ্চুরি করেছেন ১০টি। সেই প্রতিভার ছাপ রাখেন তিনি টেস্ট ক্রিকেটে প্রথম ইনিংসটিতেও। দৃষ্টিনন্দন কিছু শট খেলেন তিনি। তরুণ দুই বাঁহাতিকে শেষ পর্যন্ত এ দিন আর বিচ্ছিন্ন করতে পারেনি বাংলাদেশ। দিনের শেষ ভাগে ফাজাল একটি সুযোগ দিলেও কঠিন ক্যাচটি নিতে পারেননি সাদমান ইসলাম।

সকালে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের লক্ষ্য ছিল প্রথম ঘণ্টা নিরাপদে পার করা। মুশফিক ও লিটন দাস সেই চ্যালেঞ্জে উতরেই গিয়েছিলেন। ১১৪ বলে ফিফটি স্পর্শ করেন মুশফিক। দিনের প্রথম পানি বিরতির ঠিক আগে ভাঙে এই জুটি। ক্যারিয়ারে আগের অনেকবারের মতোই ভালো খেলতে খেলতেই উইকেট ছুড়ে দেন লিটন। ৩২ রানে আলগা শটে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বেঁচে গিয়ে বাজে শটে উইকেট হারান আর এক রান যোগ করেই। মোহাম্মাদ আব্বাসের অফ স্টাম্পের বাইরের শর্ট বলে দৃষ্টিকটূ পুল শটে ক্যাচ দেন তিনি মিড অনে। মেহেদী হাসান মিরাজ ক্রিজে যাওয়ার পরপরই আত্মবিশ্বাসী এক পুল শটে ছক্কা মারেন আব্বাসকে। কিন্তু পরের বলেই ক্যাচ তুলে দেন তিনি পয়েন্টে।

এরপর মুশফিককে কিছুটা সঙ্গ দেন তাইজুল ইসলাম। কিন্তু জুটি গড়ে ওঠার মুখেই আবার ছোবল দেন আব্বাস। ১২৬ কিলোমিটার গতির শর্ট বল সামলাতে না পেরে কিপারের হাতে ধরা পড়েন তাইজুল ইসলাম (১৭)। চারশ ছোঁয়ার সম্ভাবনায় বড় চোট লাড়ে লাঞ্চের পর। দল তাকিয়ে ছিল মুশফিকের ব্যাটে। কিন্তু ধীরস্থির ব্যাটিংয়ে এগোতে থাকা অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানের লড়াই শেষ হয় লাঞ্চের পর প্রথম ওভারেই। শাহিন শাহ আফ্রিদির দুটি বল খেলার পর একটি মাছি বেশ বিরক্ত করছিল মুশফিককে। তাতে কিছুটা সময় লেগে যায় তার। এতে মনোযোগ নড়ে গেল বলেই কি না, পরের বলেই ব্যাট-প্যাডের মধ্যে বেশ ফাঁক রেখে বোল্ড হয়ে যান তিনি। তার ৭১ রানের ইনিংসটি আসে ১৭৯ বলে।

এরপর ইবাদত হোসেন চৌধুরিতে ফিরিয়ে পাঁচ উইকেট পূর্ণ করেন আব্বাস। চারশ থেকে ১৬ রান দূরে নবম উইকেট হারায় বাংলাদেশ। শেষ জুটিতে তাসকিন আহমেদের ক্যামিওতে চারশর সীমানা ছাড়াতে পারে দল। ৩ চার ও ১ ছক্কায় ১৯ বলে ২৮ রানের ইনিংস খেলেন তিনি। ১১ টেস্টের ক্যারিয়ারে কখনও ১১ বলের বেশি খেলতে না পারা নাহিদ রানা এবার ২৩ বল খেলে ফেলেন। শেষ জুটিতে দুজন যোগ করেন ২৯ রান। আফ্রিদির বলে স্লিপে সাউদ শাকিলের দুর্দান্ত ডাইভিং ক্যাচে তাসকিনের বিদায়ে শেষ হয় দলের ইনিংস। বাংলাদেশের রানকে তখন যথেষ্টই হৃষ্টপুষ্ট মনে হচ্ছিল। কে জানত, দিন শেষে তাদেরকে মাঠ ছাড়তে হবে বোলিংয়ের হতাশা নিয়ে!