ঘুরে দাঁড়িয়ে পাকিস্তানকে চ্যালেঞ্জ বাংলাদেশের

প্রকাশ : ১৭ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া প্রতিবেদক

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের উইকেট গতকাল শনিবার সকাল থেকেই একটা বার্তা দিচ্ছিল- এখানে ব্যাটসম্যানদের জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন পরীক্ষা! সেই পরীক্ষার শুরুতেই যেন এলোমেলো হয়ে যায় বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপ। একের পর এক ব্যাটসম্যান ফিরে যাচ্ছেন, স্কোরবোর্ডে বাড়ছে চাপ, গ্যালারিতে ছড়িয়ে পড়ছে হতাশা। কিন্তু সেই অন্ধকারের মধ্যেও একজন ব্যাটসম্যান ছিলেন আলাদা। চারপাশের পতনের মধ্যেও তিনি খেলেছেন নিজের মতো করে, ধৈর্য আর সাহস মিলিয়ে গড়েছেন এক অসাধারণ ইনিংস। তার নাম লিটন দাস।

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্টের প্রথম দিনটি বাংলাদেশের জন্য ছিল সংগ্রাম, ধৈর্য ও ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প। টস হেরে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই পাকিস্তানের পেস আক্রমণের সামনে চাপে পড়ে যায় স্বাগতিকরা। যদিও গতকাল ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখেও এক প্রান্ত আগলে রেখে অনবদ্য শতরানে দলকে সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যান লিটন দাস। তার ১২৬ রানের অসাধারণ ইনিংসে ভর করে বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে ৭৭ ওভারে সবকটি উইকেট হারিয়ে ২৭৮ রান সংগ্রহ করে। জবাবে দিনের শেষ ভাগে ব্যাট করতে নেমে পাকিস্তান কোনো উইকেট না হারিয়ে ২১ রান তুলে প্রথম দিন শেষ করেছে। সকালের শুরুটা ছিল বাংলাদেশের জন্য দুঃস্বপ্নের মতো। পাকিস্তানের অভিজ্ঞ পেসার মোহাম্মদ আব্বাস ইনিংসের শুরু থেকেই নিখুঁত লাইন ও লেংথে আঘাত হানেন। প্রথম ওভারেই চাপে পড়ে যান ওপেনার মাহমুদুল হাসান জয়। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই স্লিপে ক্যাচ তুলে দিয়ে শূন্য রানে সাজঘরে ফেরেন তিনি। খুব দ্রুত প্রথম উইকেট হারিয়ে বাংলাদেশ শুরুতেই ব্যাকফুটে চলে যায়।

তবে অভিষিক্ত ওপেনার তানজিদ হাসান কিছুটা ইতিবাচক ব্যাটিংয়ের আভাস দেন। মুমিনুল হকের সঙ্গে জুটি গড়ে ইনিংস মেরামতের চেষ্টা করেন তিনি। তানজিদের ব্যাটে ছিল কয়েকটি দৃষ্টিনন্দন শট। কিন্তু ভালো শুরুটাকে বড় ইনিংসে রূপ দিতে পারেননি এই তরুণ ব্যাটার। ৩৪ বলে ২৬ রান করে বিদায় নেন তিনি। তার বিদায়ে ভাঙে ৪৪ রানের জুটি। এরপর দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করেন দুই অভিজ্ঞ ব্যাটার মুমিনুল হক ও অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত। কিন্তু পাকিস্তানের পেসার খুররাম শাহজাদের দুর্দান্ত এক ডেলিভারিতে মুমিনুলের অফ স্টাম্প ভেঙে গেলে আবারও চাপে পড়ে বাংলাদেশ। ২২ রান করে ফেরেন এই বাঁহাতি ব্যাটার।

এক পর্যায়ে শান্ত ও মুশফিকুর রহিম মিলে ইনিংস সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। শান্ত উইকেটে থিতু হয়ে খেলছিলেন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে। তবে শট খেলতে গিয়ে দ্বিধায় পড়ে স্লিপে ক্যাচ দিয়ে বিদায় নেন তিনি। ২৯ রানের এই ইনিংসটি আরও বড় হতে পারত। এরপর মুশফিকও সুবিধা করতে পারেননি। ৬৪ বল খেলে ২৩ রান করার পর লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়েন তিনি। মিডল অর্ডারে বড় ভরসা মেহেদি হাসান মিরাজও ব্যর্থ হন। মাত্র ৪ রান করে ফিরে গেলে ১১৬ রানে ৬ উইকেট হারিয়ে চরম বিপর্যয়ে পড়ে বাংলাদেশ। তখন মনে হচ্ছিল দেড়শ রানের আগেই হয়তো গুটিয়ে যাবে স্বাগতিকদের ইনিংস। ঠিক সেই কঠিন মুহূর্তে দৃঢ়তা ও দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে দলের হাল ধরেন লিটন দাস। শুরু থেকেই ধৈর্যের পরিচয় দেন তিনি। একদিকে উইকেট পড়তে থাকলেও নিজের স্বাভাবিক আক্রমণাত্মক খেলা ও নিয়ন্ত্রিত শট নির্বাচনের সমন্বয়ে পাকিস্তানি বোলারদের বিপক্ষে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন দেন তাইজুল ইসলাম। যদিও তাইজুল মাত্র ১৬ রান করেন, তবে ৪০ বল খেলে লিটনকে সময় দেন ইনিংস গড়ার।

তাইজুল আউট হওয়ার পর তাসকিন আহমেদকে নিয়েও কিছুটা লড়াই চালিয়ে যান লিটন। তবে তাসকিন বেশিক্ষণ টিকতে পারেননি। তবুও লিটন একাই দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। চমৎকার ড্রাইভ, স্কয়ার কাট ও পুল শটে রান তুলতে থাকেন তিনি। পাকিস্তানের পেস ও স্পিন-দুই আক্রমণই দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেন এই ডানহাতি ব্যাটার। ১৩৫ বলে ব্যক্তিগত শতক পূর্ণ করেন লিটন দাস। এটি ছিল টেস্ট ক্যারিয়ারে তার ষষ্ঠ সেঞ্চুরি। শতকের পরও থেমে থাকেননি তিনি। শেষ পর্যন্ত ১৫৯ বলে ১৪টি চার ও ২টি ছক্কায় ১২৬ রানের দুর্দান্ত ইনিংস খেলেন। বাংলাদেশের ইনিংসের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এই লড়াকু শতরান। দিনের শেষ দিকে হাসান আলি দ্রুত দুটি উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের ইনিংস গুটিয়ে দেন। প্রথমে ডিপ স্কয়ার লেগে ক্যাচ দিয়ে ফেরেন লিটন। এরপর নাহিদ রানাকে আউট করে বাংলাদেশের ইনিংসের সমাপ্তি টানেন তিনি।

পাকিস্তানের হয়ে সবচেয়ে সফল বোলার ছিলেন খুররাম শাহজাদ। তিনি ৪টি উইকেট শিকার করেন। মোহাম্মদ আব্বাস নেন ৩টি উইকেট। হাসান আলি পান ২টি উইকেট। পাকিস্তানি পেসারদের নিয়ন্ত্রিত ও ধারালো বোলিং পুরো দিনজুড়েই বাংলাদেশের ব্যাটারদের চাপে রেখেছিল। দিনশেষে পাকিস্তান ব্যাট করতে নেমে সাবধানী শুরু করেছে। ৬ ওভারে বিনা উইকেটে ২১ রান সংগ্রহ করেছে সফরকারীরা। আবদুল্লাহ ফজল ও আজান আলি অপরাজিত আছেন। এখনও বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের চেয়ে ২৫৭ রানে পিছিয়ে পাকিস্তান।