সিরিজ জয়ের অপেক্ষায় বাংলাদেশ
প্রকাশ : ১৯ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রীড়া প্রতিবেদক

প্রথম ইনিংসে লিটন কুমার দাস, দ্বিতীয় ইনিংসে মুশফিকুর রহিমের সেঞ্চুরি এবং বোলারদের নৈপুণ্যে সিলেট টেস্টে চালকের আসনে বাংলাদেশ! প্রথম ইনিংসে টপ অর্ডারের ব্যর্থতায় যখন দল চাপে পড়ে গিয়েছিল, তখন লিটন দাসের অনবদ্য সেঞ্চুরি দলকে লড়াইয়ে ফিরিয়ে আনে। পরে বোলারদের নিয়ন্ত্রিত পারফরম্যান্সে পাকিস্তানের বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে ৪৬ রানের লিড নেয় স্বাগতিকরা। সেই সুবিধাকে আরও বড় করে তুলতে দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট হাতে অসাধারণ দৃঢ়তা দেখান বাংলাদেশের ব্যাটাররা। বিশেষ করে মুশফিকুর রহিমের ব্যাটে আসে অনন্য এক ইনিংস, যা আজ বাংলাদেশকে এনে দিয়েছে পাহাড়সম সংগ্রহ এবং ম্যাচে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ।
দ্বিতীয় ইনিংসে বাংলাদেশ সবকটি উইকেট হারিয়ে তুলে ৩৯০ রান। প্রথম ইনিংসের লিড যোগ হয়ে পাকিস্তানের সামনে দাঁড়ায় ৪৩৭ রানের বিশাল লক্ষ্য। লক্ষ্যটা এতটাই বড় যে জিততে হলে পাকিস্তানকে গড়তে হবে টেস্ট ইতিহাসের নতুন বিশ্বরেকর্ড! বর্তমানে টেস্টে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের রেকর্ড ওয়েস্ট ইন্ডিজের, যারা ৪১৮ রান তাড়া করে জিতেছিল।
পাকিস্তান যদি এই ম্যাচ জেতে, তবে শুধু বিশ্বরেকর্ডই নয়, নিজেদের টেস্ট ইতিহাসেও সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের নতুন কীর্তি গড়বে। গতকাল তৃতীয় দিনের খেলা শুরু করে বাংলাদেশ ১৫৬ রানের লিড নিয়ে। আগের দিন অপরাজিত থাকা নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুশফিকুর রহিম দিন শুরু করেন। তবে খুব বেশি সময় টিকতে পারেননি শান্ত। খুররম শাহজাদের বলে এলবিডব্লিউ হয়ে ১৫ রান করে ফেরেন বাংলাদেশ অধিনায়ক। রিভিউ নিয়েও বাঁচতে পারেননি তিনি। এরপর ক্রিজে এসে লিটন দাস আবারও দলের হাল ধরেন। প্রথম ইনিংসের মতো দ্বিতীয় ইনিংসেও সাবলীল ব্যাটিং করেন এই ডানহাতি ব্যাটার।
মুশফিক ও লিটনের জুটিই মূলত ম্যাচ থেকে পাকিস্তানকে ছিটকে দেয়। দুজনে মিলে গড়েন গুরুত্বপূর্ণ ৮৮ রানের জুটি। লাঞ্চের আগেই বাংলাদেশের লিড পৌঁছে যায় ২৪৯ রানে। বিরতির পর আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে খেলেন লিটন। ক্যারিয়ারের ২০তম টেস্ট ফিফটি তুলে নেন তিনি। একই সঙ্গে এটি ছিল তার টেস্ট ক্যারিয়ারে প্রথমবার, যখন এক ম্যাচের দুই ইনিংস মিলিয়ে ব্যক্তিগত সর্বোচ্চ রান করেন। এর আগে এক ম্যাচে তার সর্বোচ্চ রান ছিল ১৯৩, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে মিরপুর টেস্টে।
প্রথম ইনিংসে ১২৬ রান করা লিটন দ্বিতীয় ইনিংসেও দারুণ ছন্দে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত ৬৯ রান করে থামেন তিনি। যদিও সেঞ্চুরি পাননি, তবুও দুই ইনিংসে তার ধারাবাহিকতা বাংলাদেশের শক্ত ভিত গড়ে দেয়। অন্যদিকে মেহেদি হাসান মিরাজ শুরুটা ভালো করেও ইনিংস বড় করতে পারেননি। ১৯ রান করে আউট হন তিনি।
তবে পুরো দিনজুড়ে আলো ছড়িয়েছেন মুশফিকুর রহিম। বয়স এবং ক্যারিয়ারের শেষভাগেও যে তিনি বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য টেস্ট ব্যাটার, সেটি আরও একবার প্রমাণ করলেন অভিজ্ঞ এই ক্রিকেটার। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি থেকে অবসর নিলেও টেস্ট ক্রিকেটে নিজের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছেন তিনি। সিলেট টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ১৭৮ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন মুশফিক। তার ইনিংসে ছিল ৯টি চার ও একটি ছক্কা। এটি তার টেস্ট ক্যারিয়ারের ১৪তম শতক, যা বাংলাদেশি ব্যাটারদের মধ্যে সর্বোচ্চ।
শেষ পর্যন্ত ২৩৩ বলে ১৩৭ রানের মহাকাব্যিক ইনিংস খেলেন তিনি। এই ইনিংসের মধ্য দিয়ে আরেকটি অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করেন মুশফিক। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের তিন ফরম্যাট মিলিয়ে ১৬ হাজার রান পূর্ণ করেন তিনি, যা বাংলাদেশের আর কোনো ক্রিকেটারের নেই।
শততম টেস্ট খেলা প্রথম বাংলাদেশি ক্রিকেটার হওয়ার পর এবার ব্যাট হাতে নতুন ইতিহাস লিখলেন তিনি! মুশফিককে শেষদিকে ভালো সমর্থন দেন তাইজুল ইসলাম। তিনি ২২ রান করেন। এছাড়া তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলামও ছোট কিন্তু কার্যকর ইনিংস খেলেন। পাকিস্তানি বোলাররা টেলএন্ডারদের দ্রুত ফিরিয়ে দিলেও মুশফিককে আউট করতে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে তাদের। শেষ পর্যন্ত সাজিদ খানের বলে স্লগ সুইপ খেলতে গিয়ে ডিপ মিড উইকেটে মোহাম্মদ আব্বাসের হাতে ক্যাচ দেন তিনি। তার বিদায়ের মধ্য দিয়েই শেষ হয় বাংলাদেশের ইনিংস।
দিনের শেষভাগে পাকিস্তান দ্বিতীয় ইনিংসে ব্যাট করতে নামলেও আলো স্বল্পতার কারণে খেলা বেশিক্ষণ এগোয়নি।
মাত্র দুই ওভার খেলার পরই দিনের সমাপ্তি ঘোষণা করেন আম্পায়াররা। পাকিস্তানের দুই ওপেনার আওয়াইস ও ফজল কোনো রান তুলতে পারেননি। তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলাম টানা দুই মেডেন ওভার করেন।
ফলে চাপ নিয়েই চতুর্থ দিনের খেলা শুরু করতে হবে সফরকারীদের। এখন সব হিসাবই পাকিস্তানের বিপক্ষে। ৪৩৭ রানের লক্ষ্য শুধু বিশালই নয়, সিলেটের উইকেট ও বাংলাদেশের বোলিং আক্রমণ বিবেচনায় প্রায় অসম্ভব এক চ্যালেঞ্জ। তবে ক্রিকেট অনিশ্চয়তার খেলা। পাকিস্তান যদি এই লক্ষ্য ছুঁতে পারে, তবে সেটি হবে টেস্ট ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম সেরা রান তাড়ার ঘটনা। আর বাংলাদেশ যদি পরিকল্পনা অনুযায়ী বোলিং করতে পারে, তাহলে সিলেট টেস্ট হতে পারে তাদের আরেকটি স্মরণীয় জয়!
