এটাই বাংলাদেশের সেরা অর্জন
প্রকাশ : ২১ মে ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রীড়া প্রতিবেদক

সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের আকাশে তখন মেঘ, গ্যালারিও ভরা নয়! কিন্তু মাঠের ভেতরে জমে উঠেছিল এমন এক উত্তেজনা, যা বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের সাম্প্রতিক ইতিহাসে আলাদা করে জায়গা করে নেবে! ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ হাতে নিয়েও শেষ দিনের প্রথম ঘণ্টায় যেন অদ্ভুত এক অস্বস্তিতে পড়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। মোহাম্মদ রিজওয়ান ও সাজিদ খানের ব্যাটে পাকিস্তান ধীরে ধীরে ম্যাচে ফিরে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছিল, আর সেই সঙ্গে বাংলাদেশি ক্রিকেটারদের শরীরী ভাষাতেও ধরা পড়ছিল চাপের ছাপ।
গতকাল বুধবার সিলেট টেস্টের শেষ দিনে জয়ের জন্য তখন বাংলাদেশের প্রয়োজন ছিল মাত্র তিন উইকেট। কিন্তু দিনের প্রথম ৯ ওভারে পাকিস্তান তুলে ফেলে ৪২ রান। বোলারদের লাইন-লেন্থে ছিল অস্থিরতা, ফিল্ডিংয়েও দেখা যাচ্ছিল ছন্নছাড়া ভাব। এমন মুহূর্তেই দলকে স্থির রাখার দায়িত্বটা এসে পড়ে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর কাঁধে! সংবাদ সম্মেলনে সেই সময়ের অনুভূতি নিয়ে তিনি বলেন, ‘ওই এক ঘণ্টার আবেগ ব্যাখ্যা করা মুশকিল। সত্যি বলতে, ওরা ভালো ব্যাটিং করছিল। আমরা একটু চাপেও ছিলাম। তবে একটা ব্যাপার বলব যে, আগের টেস্ট ম্যাচগুলো থেকে আস্তে আস্তে এখন ওই আবেগ নিয়ন্ত্রণ করা, প্যানিক না করা, এসব আরও ভালো হয়েছে। যদিও ওখানে আরও উন্নতির জায়গা আছে, বড় দলগুলো এখানে আরও ধীরস্থির থাকে।
তবে আগের চেয়ে আরও উন্নতি হওয়ায় অধিনায়ক হিসেবে আমি খুশি।’ পানি পানের বিরতির পর যেন বদলে যায় দৃশ্যপট। তাইজুল ইসলামের হাতে আসে সেই কাঙ্ক্ষিত ব্রেকথ্রু, আর তারপর পাকিস্তানের প্রতিরোধ ভেঙে পড়তে সময় লাগেনি। কোনো রান যোগ না করেই পড়ে যায় পরের দুই উইকেট। শেষ পর্যন্ত ৭৮ রানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ।
এই সিরিজের দুই টেস্টই গড়িয়েছে শেষ দিনে। মিরপুরে নাটকীয়তার পর জয়, সিলেটেও স্নায়ুচাপের লড়াই। তাই পুরো সিরিজকে শুধুই ফলাফলের নিরিখে দেখছেন না শান্ত; তিনি দেখছেন একটি দলের মানসিক পরিণতি, ‘১০ দিন ধরে টেস্ট সিরিজ খেলতে পেরেছি। এটা অবশ্যই গর্বের ব্যাপার। সাধারণত আমরা ওভাবে পাঁচ দিন, পাঁচ দিন করে ক্রিকেট খুব একটা খেলিনি অতীতে। এটাও উন্নতির জায়গা। পুরো সিরিজে দল হিসেবে খেলতে পেরেছি।’
অধিনায়কের কণ্ঠে সবচেয়ে বেশি জোর ছিল দলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ওপর, ‘প্রত্যেক ক্রিকেটার যেভাবে পরিশ্রম করেছে, প্রতিটি ব্যাটসম্যান, বোলার, এমনকি যারা ম্যাচ খেলার সুযোগ পায়নি, কোচিং স্টাফ, দলে সহায়তা করার জন্য যারা থাকে, সবারই অবদান ছিল। সবাই চাচ্ছিল যে আরেকবার আমরা এরকম একটা ভালো ফল করতে পারি। সব মিলিয়ে আমি খুব গর্ব অনুভব করছি প্রত্যেকটি ক্রিকেটারের ওয়ার্ক এথিক দেখে।’ বৃষ্টিভেজা সকালেও যারা গ্যালারিতে এসে দলকে সমর্থন দিয়েছেন, তাদের ভূয়সী প্রশংসাও করেছেন শান্ত, ‘গ্যালারিতে যে কয়েকজন দর্শকই ছিলেন, তারা যেভাবে সাপোর্ট করেছেন, অবশ্যই তাদেরকে ধন্যবাদ। তারা টেস্ট ম্যাচে যেভাবে সাপোর্ট করেছে, আজ একটা সময় দেখছিলাম যে, যখন উইকেট পড়ছিল না, গ্যালারি থেকে সাপোর্টটা আমরা পাচ্ছিলাম। একটা নতুন ব্যাপার যে, টেস্ট ক্রিকেটে দর্শকরা কম-বেশি যা আসছে, তারা খেলার মোমেন্টামটা বুঝতে পেরে আমাদের ওই সাপোর্টটা দিয়েছেন।’
বাংলাদেশ এর আগে পাকিস্তানের মাটিতে গিয়ে তাদের হোয়াইটওয়াশ করেছিল। এবার দেশের মাঠেও একই ব্যবধানে সিরিজ জিতল শান্তর দল। ২৬ বছরের টেস্ট যাত্রায় এটিকেই আপাতত বাংলাদেশের সেরা অর্জন মনে করছেন অধিনায়ক, ‘এখন পর্যন্ত সেরা। তবে আমি মনে করি যে, সামনে আরও অনেক টেস্ট ম্যাচ বাংলাদেশ খেলবে। ওখানে আরও ভালো অর্জন হবে, এটাই আশা থাকবে। সব মিলিয়ে বলব যে, এই চারটা ম্যাচ অনেক স্পেশাল। আমরা অনেক ভালো ক্রিকেট খেলেছি।’ তবে এই সাফল্যকে শেষ গন্তব্য ভাবতে নারাজ তিনি। বরং সামনে আরও বড় পরীক্ষার কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন, ‘যেটা সবসময় বলি, আমাদের টেস্ট টিম আস্তে আস্তে গড়ে তুলতে হবে। আরও অনেক জায়গা আছে উন্নতির। ওই জায়গাগুলো ঠিকঠাক করতে হবে। ওসব ঠিকঠাক করে যখন আমরা দেশে এবং দেশের বাইরে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেলব, তখন বলব যে আমাদের দলটা আগের থেকে ভালো অবস্থানে যাচ্ছে।’
শান্ত জানেন, প্রকৃত মানদণ্ড তৈরি হবে অস্ট্রেলিয়া কিংবা দক্ষিণ আফ্রিকার মতো কঠিন কন্ডিশনে। তাই উদযাপনের মাঝেও তার চোখ ভবিষ্যতের দিকে, ‘গত দুই-তিন বছর ধরে বলব যে উন্নতি হচ্ছে, এগোচ্ছি আমরা। তবে গুরুত্বপূর্ণ যে, আমরা যখন আরও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ব, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকায় আমাদের খেলা আছে, ওসব জায়গায় আমরা কত প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলতে পারছি, এসব গুরুত্বপূর্ণ।’
