ব্যক্তিগত পরিচয় গেটের বাইরে রেখে আসুন
প্রার্থীদের প্রতি তামিম ইকবাল
প্রকাশ : ০৭ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রীড়া প্রতিবেদক

গত এক যুগেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) নির্বাচন বলতে গেলে একতরফা হয়ে আসছে। রাজনৈতিক প্রভাব, সরকার বা ক্রীড়া পরিষদের সরাসরি হস্তক্ষেপ এবং সমঝোতার মাধ্যমে প্যানেল গঠন করা হয়েছে। ফলে নির্বাচনের আগেই প্রায় অর্ধেক পরিচালক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়ে যেতেন। বিরোধী পক্ষের প্রার্থীরা চাপের মুখে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করতে বাধ্য হতেন বা তাদের মনোনয়ন বাতিল করা হতো। ফলে সাধারণ ভোটার বা কাউন্সিলরদের ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকত না এবং ফলাফল আগে থেকেই নির্ধারিত থাকত। এবারও অনেকটাই সেরকমই হয়ে গেছে। এরই মধ্যে ৮ পরিচালক বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ থেকে মনোনীত দুজন সরাসরি পরিচালক নির্বাচিত হবেন। ২৫ পরিচালক পদের ১০ জনই নিশ্চিত। বাকি থাকল কেবল ১৫ পদ। সেই ১৫ পদেই আজ নির্বাচন।
প্রার্থীরা শেষবারের মতো কাউন্সিলরদের কাছে ভোট চেয়েছেন। গত শুক্রবার রাতে ক্লাব ক্যাটাগরির ১৬ প্রার্থী কাউন্সিলরদের কাছে ভোট চাওয়ার জন্য ‘মিট অ্যান্ড গ্রিট’ অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। ১৬ প্রার্থীর যৌথ উদ্যোগে এই আয়োজনে ক্লাব ক্যাটেগরির পরিচালক প্রার্থীদের কাছে অনুরোধ ও আশাবাদ জানিয়ে রাখলেন প্রার্থীদেরই একজন ও বোর্ডের অ্যাডহক কমিটির প্রধান তামিম ইকবাল। তিনি বলেন, ‘আমি একটা অনুরোধই করব ও আশা করব, এই ১৬ জন প্রার্থীর মধ্যে ক্রিকেটার আছেন, ব্যবসায়ী আছেন, চিকিৎসক আছেন, রাজনৈতিক পরিবার থেকে আসা ব্যক্তিরা আছেন বাংলাদেশ ক্রিকেটের ভালোর জন্য একটা ব্যাপার আমাদের নিশ্চিত করতে হবে, আমরা যারাই নির্বাচিত হই না কেন, যখনই মিরপুর স্টেডিয়ামের গেট দিয়ে ঢুকলে আপনাদের ব্যক্তিগত পরিচয় বাইরে রেখে আসবেন। যে মুহূর্তে ওই আসনে আপনারা বসবেন, আপনারা কেবল বাংলাদেশ ক্রিকেটের সেবা করবেন। আপনাদের ব্যক্তিগত পরিচয়ের এখানে গুরুত্ব নেই। একটা ব্যাপারের মূল্য আছে, সেটা হলো আপনাদের ইচ্ছা।’ এই ক্যাটেগরির পরিচালক পদপ্রার্থীদের মধ্যে বেশ কজন আছেন তরুণ সংগঠক। তারা জয়ী হলে দেশের ক্রিকেটই উপকৃত হবে বলে মনে করেন তামিম।
বিসিবি সভাপতি বলেন, ‘অবশ্যই অভিজ্ঞতার একটা মূল্য আছে, অভিজ্ঞ সংগঠকদের মূল্য আছে।
পাশাপাশি এটিও বিশ্বাস করি, তরুণ, যুব ও তরতাজা মানসিকতার লোকজনও গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের সৌভাগ্য যে, এই ক্যাটেগরিতে এরকম অনেকেই আছেন। আশা করি, তারা নির্বাচিত হলে বাংলাদেশের ক্রিকেটকে ভালো করে সার্ভ করবে, এটার মধ্যে আমিও পড়ি।’ বিসিবির একটি নির্বাচন হয়েছিল মাত্র আট মাস আগেই। কিন্তু সেই নির্বাচনে নানা অনিয়মের দায়ে ওই বোর্ড ভেঙে দিয়ে গত ৭ এপ্রিল অ্যাডহক কমিটি গঠন করে জাতীয় ক্রীড়া পরিষদ, যেটির প্রধার করা হয় তামিমকে। তিন মাসের মধ্যে নির্বাচন করার বাধ্যবাধকতা ছিল এই কমিটি। তারা নির্বাচন আয়োজন করছে ঠিক দুই মাসের মাথায়।
শেষ সময়ের বেশ আগেই নির্বাচন আয়োজনের জন্য ক্রীড়ামন্ত্রী আমিনুল হকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন তামিম। ঝঞ্ঝা-বিক্ষুব্ধ সময় পেরিয়ে এই নির্বাচন দিয়ে দেশের ক্রিকেট প্রশাসনে স্থিরতা আসবে বলেই আশা তার। ‘আমাদের যে ক্রীড়ামন্ত্রী আছেন, উনাকেও ধন্যবাদ দিতে হয়। কারণ যখন অ্যাডহক কমিটি হয়, বলেছিলাম যে আমাদের জন্য মূল চ্যালেঞ্জ নির্বাচন। এটা বলেছিলাম, যত তাড়াতাড়ি, স্বচ্ছ আর ভালোভাবে নির্বাচন আমরা যদি দিতে পারি, তাহলে ভালো। আপনারা দেখেছেন যে, প্রায় এক মাস আগে, আমাদের ডেডলাইনের এক মাস আগে নির্বাচনটা ৭ তারিখে হওয়ার কথা। যদি ওটা সুস্থভাবে, সুন্দরভাবে হয়ে যায়, তাহলে এটা আমাদের ক্রিকেটের জন্য যেটা ভালো।’ তামিম বলেন, ‘গত দেড়-দুই বছর ধরে অনেক ধরনের অনেক কিছু হচ্ছে। আমিও অনেক কিছু হয়তো অনেক সময় বলেছি। সবকিছু নিয়ে একটা অশান্তির মধ্যে ছিলাম। আমার কাছে মনে হয়, আশা করি যে এই নির্বাচনের মাধ্যমে, নির্বাচনের পরে যারাই নির্বাচিত হবে, একটা সেটেলড বোর্ড হবে। সেটেলড বোর্ড হয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে সামনে নিয়ে যাবে।’
এই নির্বাচন আটকানোর নানা চেষ্টা অবশ্য দেখা গেছে গত কিছুদিনে। আমিনুল ইসলাম বুলবুলের নেতৃত্বাধীন আগের বোর্ডের পরিচালকদের কয়েকজন, ওই নির্বাচনের কাউন্সিলরদের কয়েকজন, এরকম নানা পক্ষ আদালতে গিয়েছে দফায় দফায়। কোনোটিই ধোপে টেকেনি শেষ পর্যন্ত। তাদের আদালাতে যাওয়াতে অবশ্য সমস্যার কিছু দেখেন না তামিম। ‘কেইস যে হচ্ছে, এটা তাদের অধিকার। তারা যদি মনে করেন যে, কেইস করবেন, উনাদের কোনো কথা বলার আছে বা উনারা যদি মনে করেন, যা হচ্ছে এটা ভুল, কেইস করা তাদের অধিকার। এটাতে আমি কিছু বলতে পারি না। তবে অবশ্যই আমাদের এখান থেকেও, বিসিবি থেকেও আইনজীবীরা লড়েছেন। এখন পর্যন্ত যা ফলাফল এসেছে, আশা করি আপনারা সবাই পরিষ্কার। আমি মনে করি না, নির্বাচনে কোনো সমস্যা হওয়ার কথা।’
নির্বাচনের আগে আইসিসি দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে গেছে। দুই দিনের সফরে তারা অ্যাডহক কমিটির সদস্য, আগের বোর্ডের সদস্য, নির্বাচন কমিশনসহ সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। আইসিসি প্রতিনিধি দলের এই সফর নিয়েও নানরকম খবর ছড়িয়েছে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে। সেসব নিয়েও নিজেদের অবস্থান জানালেন তামিম। ‘আইসিসির যে বিষয়টা, আইসিসি সবার সঙ্গেই কথা বলছেন, স্টেকহোল্ডার সবার সঙ্গেই কথা বলেছেন। আমাদের ইলেকশন কমিশনে যারা আছেন, উনাদের সঙ্গে প্রায় দেড় ঘণ্টা মিটিং করেছেন। আমার সঙ্গেও কথা বলেছেন। উনারা বলেছেন যে, উনারা গিয়ে কথা বলে পরবর্তীতে আমাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন। আমরা এই ব্যাপারটা সম্মানটা করি।’
তিনি বলেন, ‘এর মাঝখানে যে কিছু কিছু গুজব চলেছে, ওগুলোও কিন্তু আইসিসি পরিষ্কার করে দিয়েছে যে, এরকম ধরনের কোনো আলোচনা বা এরকম ধরনের কোনো কথা কাউকে বলা হয়নি। আমার কাছে মনে হয়, আমরা যে পজিশনে আছি, ওই পজিশনে থেকে যখন সঠিক সময়, সঠিক সময়ের মধ্যে আপনারা সবকিছু জানতে পারবেন।’ আগের বোর্ডের পরিচালকদের কয়েকজন গত কিছুদিনে তীব্র সমালোচনা করেছেন তামিমের। জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) পক্ষ থেকে শুক্রবার সংবাতদ সম্মেলনে নানা অভিযোগ তোলা হয় বিসিবি নির্বাচনে প্রার্থীদের নিয়ে, সেখানেও কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় তামিমকে।
এসব আলোচনা-সমালোচনায় আপত্তি নেই বলেই দাবি করলেন তামিম। তবে দেশের সাবেক এই অধিনায়ক বললেন, ব্যক্তিগত আক্রমণ কখনোই কাম্য নয়। ‘গত নির্বাচন যখন হয়েছে, আমি অনেক কথা বলেছি। তবে যদি ভুল না করে থাকি, আমি কাউকে ব্যক্তিগত আক্রমণ করিনি। আমি প্রক্রিয়া নিয়ে, নির্বাচন কীভাবে হয়েছে, এসব নিয়েই কথা বলেছি বেশির ভাগ সময়। আমার মনে হয় না, ব্যক্তিগতভাবে কাউকে কোনো সময় আক্রমণ করেছি। আমার মনে হয়, এই সম্মানটা আমাদের সবারই রাখতে হবে। যদি প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগ থাকে, অন্য কোনো বিষয় নিয়ে কোনো কথা বলার থাকে, বলতে পারেন। কিন্তু আমরা প্রতিটি মানুষের সম্মান মেইনটেইন করে চলি। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অনেক ক্ষেত্রে অনেক মানুষ এটা করছে না। যখন ক্রিকেট খেলোয়াড়দের ব্যাপারে কথা বলা হচ্ছে, কীভাবে কথা বলা হচ্ছে, আপনারা সবাই শুনছেন ও খেয়াল করছেন। আমি এতটুকুই বলব, আপনাদের মতামত অবশ্যই দিতে পারেন, যে কোনো কিছুই বলতে পারেন। ব্যক্তিগত আক্রমণে না গেলে আমাদের সবার জন্যই ভালো। তিনটি ক্যাটেগরি থেকে বিসিবি পরিচালক হবেন ২৩ জন। জাতীয় ক্রীড়া পরিষদের সরাসরি মনোনয়নে পরিচালক হবেন দুজন। পরে এই ২৫ পরিচালকের ভোটে নির্বাচিত হবেন সভাপতি। তামিম সভাপতি নির্বাচিত হলে কোন কোন দিকে বেশি গুরুত্ব দেবেন, জানিয়ে রাখলেন আগেই। ‘আমাদের মূল ব্যাপার হলো ফ্যাসিলিটিজ।
আমাদের অনেক জায়গায় অনেক কিছু দরকার। এই জায়গাটায় আমাদের অনেক ফোকাস থাকবে। আরেকটি জায়গা আমি মনে করি, অনূর্ধ্ব-১৯ থেকে জাতীয় দল পর্যন্ত যে গ্যাপ, এখানে কেন আমরা ভালো ক্রিকেটার গড়ে তুলতে পারছি না, এই জায়গা নিয়ে আমি কাজ করতে চাই। কারণ, আমি সফল হব নাকি হব না, এটা সময়ই বলবে। তবে কাজ তো করতে হবে। ওই চেষ্টা করার জন্যই এইচপিকে (হাই পারফরম্যান্স) এত ফোকাস দিচ্ছি। এসব নিয়ে কিছু পরিকল্পনা আছে। টাইম টু টাইম আপনারা জানতে পারবেন আমার পরিকল্পনা।’
নির্বাচনে ক্যাটেগরি-০১ থেকে ৯ পরিচালকের ৭ জন ও ক্যাটেগরি-০৩ থেকে একমাত্র পরিচালক নির্বাচিত হয়ে গেছেন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।
