১৬ বছর পর মোহামেডানের ঘরে শিরোপা

প্রকাশ : ১৩ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া প্রতিবেদক

শিরোপার লড়াই এমন নাটকীয় রূপ খুব কমই দেখেছে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশন ক্রিকেট লিগ (ডিপিএল)! শেষ রাউন্ড শুরুর আগে তিন দলের সামনে ছিল চ্যাম্পিয়ন হওয়ার সুযোগ। সমান ১৬ পয়েন্ট নিয়ে শিরোপা স্বপ্ন দেখছিল মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব, আবাহনী লিমিটেড ও প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাব। কিন্তু দিন শেষে সব হিসাব-নিকাশ, সমীকরণ আর অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ট্রফি উঁচিয়ে ধরেছে মোহামেডান। দীর্ঘ ১৬ বছর পর দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ লিস্ট ‘এ’ টুর্নামেন্টের শিরোপা ফিরে গেছে মতিঝিলের ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটির ঘরে।

মোহামেডানের সামনে সমীকরণটা সহজ ছিল না। নিজেদের ম্যাচ জিতলেই হতো না, একই সঙ্গে প্রাইম ব্যাংকের হারেরও প্রয়োজন ছিল। তাই আবাহনীর বিপক্ষে মাঠে নামার পাশাপাশি তাদের চোখ ছিল পাশের মাঠের দিকেও। শেষ পর্যন্ত দুই ম্যাচের ফলই হাসি ফুটিয়েছে সাদা-কালো শিবিরে। গতকাল শুক্রবার বিকেএসপির ৩ নম্বর মাঠে ব্যাট হাতে শুরু থেকেই আগ্রাসী ছিল মোহামেডান। তবে দলীয় ৩৬ রানে নাঈম শেখ ফিরে গেলে কিছুটা চাপে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এরপরই ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে তুলে নেন পারভেজ হোসেন ইমন ও এনামুল হক বিজয়। দ্বিতীয় উইকেটে ২৪৮ রানের বিশাল জুটি গড়ে তারা আবাহনীর বোলিং আক্রমণকে কার্যত ধ্বংস করে দেন। তিন নম্বরে নেমে ইমন খেলেন ক্যারিয়ারের অন্যতম সেরা ইনিংস। ১১৬ বলে ১৫০ রান করতে তিনি মারেন ১০টি চার ও ১২টি ছক্কা। অন্য প্রান্তে সমান তালে রান তুলতে থাকেন বিজয়। ১১৫ বলে ১৪১ রানের ইনিংসে ছিল ১১টি চার ও ৯টি ছক্কা। এই সেঞ্চুরির মাধ্যমে লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে নিজের ২৫তম শতক পূর্ণ করেন তিনি। একই সঙ্গে তামিম ইকবালকে ছাড়িয়ে বাংলাদেশের লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির মালিকও হয়ে যান এই ওপেনার। ইমন-বিজয়ের বিদায়ের পরও থামেনি রান উৎসব। আফিফ হোসেন মাত্র ৩৩ বলে ৬১ রান করে শেষ দিকে ঝড় তোলেন। আনিসুল ইসলাম ১৬ বলে ৩০ রান যোগ করেন। ফলে নির্ধারিত ওভারে ৪০৬ রানের বিশাল সংগ্রহ দাঁড় করায় মোহামেডান। বাংলাদেশের লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে এটি দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দলীয় স্কোর। এই তালিকায় তাদের ওপরে আছে কেবল প্রাইম ব্যাংক, যারা আগের মৌসুমে ৪২২ রান করেছিল। এত বড় লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই চাপে পড়ে আবাহনী। প্রথম ১০ ওভারেই ৭৯ রান তুললেও হারায় তিন উইকেট। পরে মেহেরব হোসেন ফিরে গেলে ১৩৪ রানে চতুর্থ উইকেট হারায় দলটি। তবে ম্যাচে আশা জিইয়ে রেখেছিলেন অনিক সরকার ও সাব্বির রহমান। বিশেষ করে অনিকের ব্যাটে দেখা যায় দুর্দান্ত আগ্রাসন। একের পর এক বাউন্ডারি আর ছক্কায় তিনি ম্যাচে নতুন উত্তেজনা ছড়ান। ৬৪ বলে ৮৫ রানে অপরাজিত ছিলেন এই ব্যাটার। সাব্বির রহমান অপরাজিত ছিলেন ২৪ রানে।

তবে আবাহনীর প্রতিরোধ আর বেশি দূর এগোয়নি। ২৪.৪ ওভারে ৪ উইকেটে ১৭৮ রান করার পর বজ্রপাত ও বৃষ্টির কারণে খেলা বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর ম্যাচ আর শুরু করা সম্ভব হয়নি। পরে ডাকওয়ার্থ-লুইস-স্টার্ন (ডিএলএস) পদ্ধতিতে মোহামেডানকে ৬৩ রানে জয়ী ঘোষণা করা হয়। কিন্তু তখনও শিরোপা নিশ্চিত হয়নি। কারণ সমানতালে চলছিল প্রাইম ব্যাংক ও ঢাকা লেপার্ডসের ম্যাচ। আগে ব্যাট করে ৮ উইকেটে ২৬৬ রান তোলে প্রাইম ব্যাংক। জবাবে ২৯.১ ওভারে ৩ উইকেটে ১৪২ রান সংগ্রহ করে লেপার্ডস। এরপর বৃষ্টিতে খেলা বন্ধ হয়ে যায়। প্রায় দেড় ঘণ্টা অপেক্ষার পর ডিএলএস পদ্ধতিতে লেপার্ডসকে ৮ রানে জয়ী ঘোষণা করা হলে উল্লাসে ফেটে পড়ে মোহামেডান শিবির। সেই ফলই নিশ্চিত করে তাদের শিরোপা। ১১ ম্যাচ শেষে ৯ জয় ও ১৮ পয়েন্ট নিয়ে লিগের শীর্ষে থেকে চ্যাম্পিয়ন হয় মোহামেডান। সমান ১৬ পয়েন্ট পাওয়া আবাহনী ও প্রাইম ব্যাংকের মধ্যে হেড-টু-হেড ব্যবধানে এগিয়ে থেকে রানার্স-আপ হয় আবাহনী।

শিরোপা জয়ের মুহূর্তে দলের সঙ্গে থাকতে পারেননি অধিনায়ক তাওহীদ হৃদয়। জাতীয় দলের ক্যাম্পে থাকায় দূর থেকেই সতীর্থদের সাফল্য উপভোগ করতে হয়েছে তাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগঘন বার্তায় হৃদয় লিখেছেন, ‘১৬ বছর পর! হ্যাঁ, দীর্ঘ ১৬ বছর পর আবার চ্যাম্পিয়ন হলো মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব।

আমার খুব ইচ্ছে ছিল এখন দলের সঙ্গে থাকার। আমি ওদের খুব মিস করছি, মিস করছি চ্যাম্পিয়ন হওয়ার উদযাপন আর অবশ্যই মিস করছি ট্রফিটা। দলের অধিনায়ক হিসেবে আমি ওদের জন্য অত্যন্ত গর্বিত, ওদের জন্য অনেক আনন্দিত এবং আনন্দের এই মুহূর্তে আমিও দূর থেকে ওদের সাথেই চোখে জল ফেলছি। মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের সকল ভক্ত-সমর্থকদের অনেক অনেক অভিনন্দন!’

শিরোপা জয়ের পর উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছে ক্লাব কর্তৃপক্ষও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তারা এই সাফল্যের কৃতিত্ব খেলোয়াড়, কোচিং স্টাফ, কর্মকর্তা, সমর্থক ও সদস্যদের উৎসর্গ করেছে। একসময় ডিপিএলকে প্রায় নিজেদের একচ্ছত্র আধিপত্যে পরিণত করেছিল আবাহনী। অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে শিরোপাহীন ছিল মোহামেডান। সেই অপেক্ষা, হতাশা আর আক্ষেপের অবসান ঘটিয়ে অবশেষে আবারও দেশের ক্লাব ক্রিকেটের সিংহাসনে ফিরল সাদা-কালোরা।