মিশরের ৯২ বছরের অপেক্ষার অবসান

প্রকাশ : ২৩ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া ডেস্ক

সেই ১৯৩৪ সালে প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলেছিল মিশর। বিশ্ব আসরে খেলা প্রথম আরব ও আফ্রিকান দেশ তারাই। কিন্তু বিশ্বকাপে একটি জয় ছিল অধরা। প্রায় এক শতাব্দীর সেই আক্ষেপ অবশেষে ঘুচে গেল। প্রথমার্ধে পিছিয়ে থেকেও দ্বিতীয়ার্ধে দারুণ উজ্জীবিত পারফরম্যান্সে স্মরণীয় জয়ের স্বাদ পেল মোহামেদ সালাহর দল। গতকাল সোমবার বিশ্বকাপের ‘জি’ গ্রুপের ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারিয়েছে মিশর।

ভ্যানকুভারে ম্যাচের পঞ্চদশ মিনিটে নিউজিল্যান্ডকে এগিয়ে দেন ফিন সারম্যান। ৫৮তম মিনিটে মিশরকে সমতায় ফেরান মোস্তাফা জিকো। ৬৭ মিনিটে দলকে এগিয়ে নেন অধিনায়ক সালাহ। বদলি নামার একটু পর ব্যবধান বাড়ান মাহমুদ আহমেদ ইব্রাহিম হাসান, যিনি পরিচিত ত্রেজেগে নামে।

এই জয়ে দারুণ উজ্জ্বল ছিলেন মিশর ফুটবলের পোস্টার বয় ও সেরা তারকা সালাহ। একটি গোল করা ও আরেকটিতে সহায়তা ছাড়াও ম্যাচজুড়ে অসাধারণ খেলেছেন ৩৪ বছর বয়সী তারকা। তার জনপ্রিয়তাও আরেকবার বোঝা গেছে এ দিন।

প্রতিবার তিনি বলে স্পর্শ করা মাত্রই গর্জে উঠেছে গ্যালারি। বিশ্বকাপের প্রথম জয়ের পথে ৯২ বছর আগের আরেকটি স্মৃতিও ফেরাল মিশর। সেই ১৯৩৪ সালে বিশ্বকাপে অভিষেক ম্যাচে হাঙ্গেরির কাছে হারের পথে দুটি গোল করেছিল তারা। এরপর এবারই প্রথম এক ম্যাচে একাধিক গোল করতে পারল ‘ফারাও’ নামে পরিচিত দলটি।

এই জয়ে দুই ম্যাচে চার পয়েন্ট নিয়ে সালাহরা এখন গ্রুপের শীর্ষে। আগের ম্যাচে ইরানের সঙ্গে ২-২ গোলে ড্র করেছিল নিউজিল্যান্ড, বেলজিয়ামের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করেছিল মিশর। ফেভারিট হিসেবেই ম্যাচটি শুরু করে মিশর। ভ্যানকুভারের বিসি প্লেসের গ্যালারিতেও ছিল তাদের সমর্থনে দর্শকের জোয়ার। লালের সেই সমুদ্র শান্ত হয়ে যায় দলের রক্ষণের এক অসতর্কতায়। টিম পেইনের কর্নারে হেড থেকে গোল করেন নিউজিল্যান্ডের ডিফেন্ডার সারম্যান। তাকে মার্ক করছিল না কেউ। ওই গোলের আগেও ম্যাচে দাপট বেশি ছিল নিউজিল্যান্ডের। গোলের মিনিট দুয়েক আগেও সম্ভাবনা জাগিয়েছিল তারা। বাঁ দিক দিয়ে দ্রুতগতিতে এগিয়ে গিয়ে রক্ষণভাগ ভেদ করে মার্কো স্টামেনিচ বল দেন ইলাইজা জাস্টকে। আগের ম্যাচে দুই গোল করা উইঙ্গার নিচু শটে গোল করার চেষ্টা করলেও কাছের পোস্টের পাশ দিয়ে বলটি বাইরে পাঠিয়ে দেন গোলকিপার মোস্তাফা শুবির।

২৭তম মিনিটে বিদ্যুৎগতির আক্রমণে বক্সের বাইরে বল ধরে শরীর ঘুরিয়ে বাঁকানো শট নেন ওমার মার্মুশ। নিউজিল্যান্ডের গোলকিপার ম্যাক্স ক্রোকোম্ব বাঁদিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে তা রুখে দেন এবং দ্বিতীয় প্রচেষ্টায় আলগা বলটি ধরতে গিয়েও ব্যর্থ হন। তবে বিপদ হয়নি।

ক্রমে ছন্দে ফিরতে থাকে মিশর। ৩২তম মিনিটে মার্মুশ শরীর বাঁকিয়ে বক্সে ঢুকে শট নেওয়ার মতো জায়গা প্রায় তৈরি করেই ফেলেছিলেন, কিন্তু এর আগেই সারম্যান সজোরে তার পায়ের আঙুল ছুঁয়ে বলটি বাইরে পাঠিয়ে দেন।

প্রথমার্ধে আক্রমণ, পাল্টা আক্রমণ চললেও খুব ভালো কোনো সুযোগ তৈরি হয়নি। দ্বিতীয়ার্ধের শুরু থেকেই দারুণ গতিতে খেলতে থাকে মিশর। ৪৭তম মিনিটে ডান দিক থেকে আসা একটি ক্রসে বল পেয়ে ঝলক দেখান সালাহ। বক্সের ভেতরে প্রথম স্পর্শেই তিনি বলটি নিয়ন্ত্রণে আনেন, কিন্তু দ্বিতীয় স্পর্শে সুবিধা করতে পারেননি, বল চলে যায় সরাসরি গোলকিপার ক্রোকোম্বের হাতে। এর পরপরই বক্সের বাঁ দিকে ফাউলের পর মিশরের আরও একটি চমৎকার ফ্রি কিক, কিন্তু মার্মুশ বলটি পোস্টের অনেক ওপর দিয়ে মেরে দেন।

ধারার অনেকটা বিপরীতেই ৫২তম মিনিটে আবার দারুণ এক সম্ভাবনা জাগায় নিউজিল্যান্ড।

ফ্রি কিক থেকে উড়ে আসা বলে চমৎকার হেড করেন ক্যালাম ম্যাককাওয়াট। দুর্দান্ত রিফ্লেক্সে ফিস্ট করে মিশরকে বিপদমুক্ত করেন গোলকিপার শুবির। ৫৫তম মিনিটে বক্সের ভেতর থেকে জিকোর শটে দারুণভাবে ব্লক করেন সারম্যান। তবে মিশর যেভাবে চেপে ধরছিল, তাতে গোলের আভাস মিলছিলই। সেই গোল ধরা দেয় ৫৮তম মিনিটে। মোহামেদ হেনির চমৎকার ক্রসে বক্সের ভেতর ফাঁকায় থাকা জিকো জোরাল হেড করেন। গোলকিপার ক্রোকোম্বের হাতে লেগে বল জড়ায় জালে। গোলকিপার হয়তো আরেকটু ভালো করতে পারতেন। তবে দায়টা বেশি নিউ জিল্যান্ডের রক্ষণভাগেরই। গোলের পর উজ্জীবিত মিশর আরও দাপটে খেলতে থাকে। নিউজিল্যান্ডকে মনে হচ্ছিল অবসন্ন। আরেকটি গোল ধরা দেয় দ্রুতই। নান্দনিক এক মুভ থেকে সেটি ছিল দর্শনীয় গোল। ডান প্রান্ত থেকে সালাহ দুজনের মধ্য দিয়ে বক্সে ঢুকে জিকোর সঙ্গে ওয়ান-টু খেলে তিনজনের মধ্য থেকে চমৎকার গড়ানো শটে পরাস্ত করেন গোলকিপারকে।

২০১৮ বিশ্বকাপে দুটি গোল করলেও দলের জয় দেখতে পাননি সালাহ। এবার তার গোলেই জয়ের পথে এগিয়ে গেল মিশর। ৭৬তম মিনিটে জিকো ও মার্মুশকে তুলে নিয়ে হামজা আব্দেলকারিম ও ত্রেজেগেকে নামান মিশর কোচ। ফল মিলতে খুব বেশি সময় লাগেনি। ৮২তম মিনিটে সালাহর কর্নার থেকে নিচু হয়ে হেডে গোল করেন ত্রেজেগে। তাকেও ফাঁকায় রেখেছিল নিউ জিল্যান্ডের রক্ষণভাগ।

যোগ করা সময়ে দুই দলেরই দারুণ কিছু আক্রমণে জমে ওঠে ম্যাচ।

আব্দেলকারিমের হেড শুয়ে পড়ে ঠেকিয়ে দেন ক্রোকোম্ব। চতুর্থ গোলের সুবর্ণ সুযোগ পায় মিশর। একজনকে কাটিয়ে বক্সে ঢুকে গোলকিপার ক্রোকোম্বকেও ডজ দিয়ে এগিয়ে যান জিজো। কিন্তু সময়মতো গোলে শট নিতে পারেননি। একটু সামলে দ্বিতীয় দফায় শট নেন। ততক্ষণে ক্রোকোম্ব ছুটে এসে শুয়ে পড়ে ব্লক করে দেন। একদম শেষ সময়ে স্টামেনিচের শট একজনের পায়ে লেগে গোলে ঢোকার মুখে ঠেকিয়ে দেন শুবির। এর পরপরই মিশরকে উল্লাসে ভাসায় রেফারির শেষ বাঁশি। হেরে গেলেও নিউজিল্যান্ডের সম্ভাবনা শেষ হয়ে যায়নি। গ্রুপের পরের ম্যাচে তাদের প্রতিপক্ষ বেলজিয়াম। প্রথমবার গ্রুপ পর্ব উতরানো অনেকটাই নিশ্চিত করে ফেলা মিশরের পরের প্রতিপক্ষ ইরান।