এমবাপ্পের নৈপুণ্যে ‘বাধা’ পেরিয়ে নকআউটে ফ্রান্স
প্রকাশ : ২৪ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রীড়া ডেস্ক

ফুটবল বিশ্বকাপ দেখল এক ঐতিহাসিক ও রূপকথার ম্যাচ। ফিলাডেলফিয়ার লিংকন ফিনান্সিয়াল ফিল্ডে ফ্রান্স ও ইরাকের মধ্যকার লড়াইটি শুধুই একটি ম্যাচ হয়ে রইল না, ঠাঁই করে নিল ইতিহাসে। সব মিলিয়ে প্রায় চার ঘণ্টা স্থায়ী হওয়া এই ম্যাচটি রূপ নিয়েছে ফুটবল বিশ্বকাপের ইতিহাসের দীর্ঘতম ম্যাচে। ম্যাচের প্রথমার্ধ শেষ হতেই শুরু হয় আসল নাটক। ফ্রান্স তখন ১-০ গোলে এগিয়ে, ঠিক তখনই আকাশ ভেঙে নামে মুষলধারে বৃষ্টি। যুক্তরাষ্ট্রের কড়া নিয়ম অনুযায়ী, স্টেডিয়ামের আট মাইলের মধ্যে বজ্রপাত বা বজ্রধ্বনি শনাক্ত হলে খেলা বন্ধ করতে হয় এবং পরবর্তী ৩০ মিনিট আর কোনো বজ্রপাত না হলে তবেই মাঠ উন্মুক্ত করা যায়। ফিলাডেলফিয়ায় সেই বজ্রঝড় ও তীব্র বাতাসের কারণে খেলা দীর্ঘ ১৩১ মিনিট বন্ধ রাখতে হয়। গ্যালারি ছেড়ে দর্শকেরা নিরাপদ আশ্রয়ে ছোটেন। মাঠে ইরাকি কোচ গ্রাহাম আর্নল্ড নিজের নোট বাঁচাতে কভারের নিচে আশ্রয় নিলেও শেষ পর্যন্ত স্যুট ভিজিয়েই দাঁড়িয়ে থাকেন। প্রকৃতির এই চরম প্রতিকূলতার কারণেই ম্যাচটি বিশ্বকাপ ইতিহাসের দীর্ঘতম ম্যাচের তকমা পায়।
স্থানীয় সময় বিকাল পাঁচটায় শুরু ম্যাচ শেষ হলো রাত প্রায় ৯টায়! বৈরি আবহাওয়ায় প্রথমার্ধের পর খেলা বন্ধ ছিল দুই ঘন্টার বেশি সময়। তার আগে-পরে আলো ছড়ালেন কিলিয়ান এমবাপে। ফ্রান্সের জার্সিতে শততম ম্যাচ খেলার উপলক্ষ জোড়া গোল করে রাঙালেন এই তারকা। ইরাককে অনায়াসে হারিয়ে বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠল দিদিয়ে দেশমের দল। ম্যাচটি ৩-০ গোলে জিতেছে দুইবারের বিশ্বকাপ জয়ীরা। তাদের অন্য গোলদাতা উসমান দেম্বেলে।
বাংলাদেশ সময় গত সোমবার রাত তিনটায় শুরু ম্যাচটি শেষ হয় গতকাল মঙ্গলবার সকাল সাতটার কাছাকাছি সময়ে। এবারের বিশ্বকাপে এই প্রথম কোনো ম্যাচে বিরূপ আবহাওয়ার প্রভাব পড়ল। চোখধাঁধানো এক গোলে দলকে এগিয়ে নেওয়া এমবাপে বিরতির পর করেন দ্বিতীয় গোল। আসরে দুই ম্যাচে তার গোল হলো চারটি। বিশ্বকাপে সব মিলিয়ে ১৬ ম্যাচে এমবাপের গোল এখন ১৬টি। এবারের আসর শুরুর আগে সর্বোচ্চ গোলদাতা ছিলেন যিনি, সেই মিরোস্লাভ ক্লোসার পাশে বসলেন তিনি। সোমবার ক্লোসাকে ছাড়িয়ে এককভাবে চূড়ায় ওঠেন লিওনেল মেসি (১৮)।
প্রথমার্ধে ফ্রান্সের খেলায় দাপট ছিল না খুব একটা। গোলের জন্য সাতটি শট নিয়ে কেবল একটি লক্ষ্যে রাখতে পারে তারা। দ্বিতীয়ার্ধে আরও ১২টি শট নিয়ে তারা চারটি লক্ষ্যে রাখতে পারে। পুরো ম্যাচে ইরাকের চার শটই ছিল লক্ষ্যভ্রষ্ট। বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম এশিয়ান দল হিসেবে নিজেদের প্রথম পাঁচ ম্যাচের সবকটি হারের তেতো স্বাদ পেল ইরাক। দুই ম্যাচে শতভাগ সাফল্যে ৬ পয়েন্ট নিয়ে গ্রুপের শীর্ষে ফ্রান্স। সমান ম্যাচে শূন্য পয়েন্ট নিয়ে চারে ইরাক। শুরু থেকে ইরাককে চাপ দিতে থাকে ফ্রান্স। চতুর্দশ মিনিটে দর্শনীয় এক গোলে দলকে এগিয়ে নেন প্রথম ম্যাচেও জোড়া গোল করা এমবাপে। তার পাস প্রতিপক্ষের ডিফেন্ডার আটকে দেওয়ার পর তাকেই খুঁজে নেন মাইকেল ওলিসে। বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের বুলেট গতির নিখুঁত শটে দূরের পোস্ট দিয়ে ঠিকানা খুঁজে নেন রেয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড। প্রথমার্ধে আর উল্লেখযোগ্য কিছু করতে পারেনি গতবারের রানার্সআপরা।
ম্যাচের আগে থেকেই ভারী বৃষ্টি ও বজ্রপাতের পূর্বাভাস ছিল। প্রথমার্ধে খেলার মাঝেই নামে তুমুল বৃষ্টি। এই বিশ্বকাপে নিয়ম অনুযায়ী, স্টেডিয়ামের আট মাইলের মধ্যে বজ্রপাত শনাক্ত হলে, খেলা ৩০ মিনিটের জন্য স্থগিত থাকবে এবং দর্শকদের নিরাপদ স্থানে যেতে বলা হবে। সেটিই কার্যকর করা হয় প্রথমার্ধের বিরতিতে। স্টেডিয়ামের বড় পর্দায় দর্শকদের গ্যালারি ছেড়ে নিরাপদ স্থানে যাওয়ার অনুরোধ করা হয়। গ্যালারিও প্রায় ফাঁকা হয়ে যায়। বৃষ্টি কমলে আবার ফিরতে শুরু করে দর্শক। কিন্তু পরিস্থিতি অনুকূল না হওয়ায় খেলা শুরু করা যাচ্ছিল না। অবশেষে বাংলাদেশ সময় মঙ্গলবার সকাল ৬টায় শুরু হয় দ্বিতীয়ার্ধের খেলা।
প্রতিপক্ষের উপহার পেয়ে ৫৪তম মিনিটে ব্যবধান বাড়ান এমবাপে। বক্সে ইরাকের ডিফেন্ডার আহমেদ কাসেম পাস দেন গোলরক্ষকের উদ্দেশ্যে, বল একটু বেশি জোরে চলে যাওয়ায় নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেননি আহমেদ বাসিল।
উসমান দেম্বেলে নিঃস্বার্থভাবে বল বাড়িয়ে দেন এমবাপ্পের দিকে, সহজেই জালে পাঠান ফ্রান্সের রেকর্ড স্কোরার। সেনেগালের বিপক্ষে জোড়া গোল করে সাবেক স্ট্রাইকার অলিভিয়ে জিঁরুকে ছাড়িয়ে ফ্রান্সের সফলতম গোলস্কোরার হন এমবাপ্পে। জাতীয় দলের হয়ে তার মোট গোল হলো ৬০টি। চার মিনিট পর দারুণ একটি গোল পেতে পারতেন মাইকেল ওলিসে। তার শট ক্রসবারে লেগে ফিরে আসে। ৬৬তম মিনিটে পরের গোলে অবদান রাখেন ওলিসে। তার পাস বক্সে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে জালে পাঠান দেম্বেলে। ক্যারিয়ারের তৃতীয় বিশ্বকাপে এসে প্রথম গোলের দেখা পেলেন পিএসজি ফরোয়ার্ড! বাকি সময়ে ব্যবধান আরও বাড়ানোর সুযোগ পেলেও কাজে লাগাতে পারেননি কেউ।
