আজ ব্রাজিলের সামনে জাপান

প্রকাশ : ২৯ জুন ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া ডেস্ক

নবাগত, বর্তমান ও সাবেক চ্যাম্পিয়নদের দুর্দান্ত লড়াইয়ে ঘটন-অঘটনের মধ্যে দিয়ে শেষ হয়েছে উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বের খেলা। প্রথমবার ৪৮ দলের টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় নিয়েছে ১৬টি দল। আর ১২ গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন ও রানার্সআপ ২৪ দলের সঙ্গে সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দল জায়গা করে নিয়েছে শেষ বত্রিশে। আজ মাঠে গড়াচ্ছে নকআউট পর্বের বাঁচা-মরার লড়াই। শেষ বত্রিশের প্রথম ম্যাচে জাপানের বিপক্ষে মাঠে নামছে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল। বাংলাদেশ সময় রাত ১১টায় হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে শুরু হবে হাইভোল্টেজ এই ম্যাচ। গুরুত্বপূর্ণ এই ম্যাচে কার্লো আনচেলত্তির দল পাচ্ছে না তাদের অন্যতম প্রধান তারকা রাফিনিয়াকে। উরুর চোটের কারণে দলের সঙ্গে হিউস্টনে যাননি বার্সেলোনার এই ফরোয়ার্ড; পুনর্বাসনের জন্য তিনি থেকে গেছেন নিউজার্সির বেস ক্যাম্পে। গ্রুপ পর্বে হাইতির বিপক্ষে ৩-০ গোলে জয়ের ম্যাচে প্রথমার্ধেই চোট পেয়েছিলেন রাফিনিয়া।

জাপানের বিপক্ষে ম্যাচের দিন তার চোটের ঠিক ১০ দিন পূর্ণ হবে। শুরুতে দলের চিকিৎসকদের ধারণা ছিল ১০ দিনের মধ্যেই তিনি সেরে উঠবেন। তবে চোটাক্রান্ত স্থানটি দ্রুত সারিয়ে তোলার লক্ষ্যে তিনি এখনও জিমনেসিয়ামে কোনো ধরনের অনুশীলন শুরু করতে পারেননি। ফলে মাঠে ফেরার জন্য তার ফিট হতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। মূলত সম্ভাব্য শেষ ষোলোর ম্যাচের জন্য তাকে পুরোপুরি সুস্থ করে তোলার লক্ষ্যেই চিকিৎসা চালিয়ে যাচ্ছে দলের মেডিকেল ইউনিট। জাপানও ছেড়ে কথা বলার দল নয়। যোগ্যতার প্রমাণ দিয়ে বিশ্বকাপের পরের রাউন্ডে জায়গা করে নিয়েছে সূর্যদয়ের দেশ জাপানও। এরইমধ্যে ব্রাজিলকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়েছেন জাপানের কোচ হাজেমি মোরিয়াসু। ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের গতি, ম্যাথেউস কুনিয়ার তীক্ষ্ণ আক্রমণ আর নেইমারের সৃজনশীলতা থামানোর নতুন ছক কসেছেন তিনি।

জাপানের ফুটবল দর্শন অন্যদের থেকে আলাদা। তারা অযথা বলের দখল ধরে রাখতে চায় না। বরং প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল কেড়ে নিয়ে মুহূর্তের মধ্যেই পাল্টা আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়াই তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি।

দাইচি কামাদা, ওয়াতারু এন্দো কিংবা কেইতো নাকামুরারা ব্যক্তিগত নৈপুণ্যে ডিফেন্ডারদের কাটিয়ে এগোনোর চেয়ে দ্রুত ওয়ান টাচ পাস আর নিখুঁত টাইমিংয়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণে ফাঁক তৈরি করতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। আর সামনে ফেনুর্ডের স্ট্রাইকার আয়াসে উয়েদার বুদ্ধিদীপ্ত অফ দ্য বল রান ডিফেন্ডারদের অবস্থান ভেঙে দিয়ে তৈরি করছে গোলের সুযোগ। শুধু পরিকল্পনাই নয়, ম্যাচের গতিপ্রকৃতি বদলালে মুহূর্তেই নিজের কৌশলও বদলে ফেলেন মোরিয়াসু। এই বিশ্বকাপে জাপান বেশিরভাগ সময় ৩-৪-২-১ ফর্মেশনে খেললেও বলের নিয়ন্ত্রণ পেলে সেটি খুব দ্রুত ৩-৪-৩ রূপ নেয়। প্রতিপক্ষ বুঝে ওঠার আগেই বদলে যায় পুরো আক্রমণ কাঠামো। এক পাশ দিয়ে একাধিক খেলোয়াড়কে নিয়ে প্রতিপক্ষকে টেনে আনে জাপান। এরপর হঠাৎ করেই খেলা ঘুরে যায় বিপরীত উইংয়ে। সেই মুহূর্তেই তৈরি হয় নতুন আক্রমণের রাস্তা। দ্রুত ট্রানজিশন, নিখুঁত ওয়ান টাচ পাসিং এবং অসাধারণ অফ দ্য বল মুভমেন্টই এখন সামুরাই ব্লুদের সবচেয়ে বড় পরিচয়।

কাগজে কলমে ব্রাজিলই হয়তো এগিয়ে। ইতিহাস, তারকা আর অভিজ্ঞতায়ও সেলেসাওদের পাল্লা ভারী। কিন্তু আধুনিক ফুটবল বারবার দেখিয়েছে, শুধু বড় নাম দিয়ে ম্যাচ জেতা যায় না। সঠিক পরিকল্পনা, নিখুঁত বাস্তবায়ন আর শৃঙ্খলাবদ্ধ ফুটবল দিয়ে যেকোনো পরাশক্তিকেই চাপে ফেলা সম্ভব।

এদিকে দুই জয় ও এক ড্রয়ে ‘সি’ গ্রুপের সেরা হয়ে, উত্তর আমেরিকা বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে উঠেছে ব্রাজিল। সেরা ষোলোয় ওঠার লড়াইয়ে তাদের মুখোমুখি হতে হবে এশিয়ার দল জাপানের। হাইতির বিপক্ষে বদলি নেমে, বিশ্বকাপে অভিষিক্ত হওয়া হায়ান মনে করেন, এখন আর কোনো ভুলের সুযোগ নেই। ‘গ্রুপ পর্বে, আমরা জানতাম, আমাদের ভুলগুলো শুধরে নিতে পারব। কিন্তু এখন আর সেই সুযোগ নেই। হয় মারতে হয়, নয় মরতে হবে।’

বিশ্বকাপের রেকর্ড পাঁচবারের চ্যাম্পিয়নদের ষষ্ঠ শিরোপার অপেক্ষা চলছে সেই ২০০২ সাল থেকে। ইতালিয়ান কোচ কার্লো আনচেলত্তির হাত ধরে, স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্য নিয়ে এবার এসেছে তারা। মরক্কোর বিপক্ষে ড্রয়ের ধাক্কা সামলে, প্রত্যাশিতভাবে পেরিয়েছে গ্রুপের বাধা। আসরের ‘ফেভারিট’দের একটি হলেও, ব্রাজিলের আক্রমণভাগ নিয়ে কিছুটা প্রশ্ন রয়েই গেছে। চোট কাটিয়ে মাঠে ফেরা নেইমার এখনও হয়ে আছেন নিজের ছায়া। ভিনিসউস ও কুইয়া এখন পর্যন্ত মেটাচ্ছেন দলের গোলের দাবি। ১৯ বছর বয়সী হায়ান অবশ্য উইংয়ে নিজের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন স্কটল্যান্ড ম্যাচে। প্রথমবার শুরুর একাদশে জায়গা পেয়ে, সপ্তম মিনিটে দলকে এগিয়ে নেওয়া ভিনিসিউসের গোলে অবদান রাখেন তিনি। পেলের পর ব্রাজিলের হয়ে সবচেয়ে কম বয়সে বিশ্বকাপে অ্যাসিস্ট করার কীর্তি এখন তার। ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপে ১৭ বছর বয়সে সতীর্থের গোলে অবদান রেখেছিলেন পেলে।

সামনের পথচলায় দল নিয়ে আশাবাদী হায়ান। বললেন, মাঠে যেই নামুক, ব্রাজিলের মানের হেরফের হবে না একটুও। ‘মানসম্পন্ন খেলোয়াড়দের নিয়ে আমাদের দলটা খুবই শক্তিশালী। কেউ যদি মাঠে নামে এবং কেউ যদি উঠে যায়, আমি মনে করি, আমরা একই মানের দল থাকব। যদি আমি মাঠ থেকে উঠে যাই, এন্দ্রিক নামবে কিংবা নেইমার নামবে। ম্যাচের নির্দিষ্ট মুহূর্ত অনুযায়ী আনচেলত্তি সেরা খেলোয়াড় বেছে নিচ্ছেন খেলানোর জন্য এবং আমি মনে করি, এটা ভালোভাবে কাজ করছে। যে পথটা আমরা ভালোভাবে অনুসরণ করে আসছি, সে পথেই ছুটব।’