উৎসবের অপেক্ষায় মেটলাইফ

প্রকাশ : ১৮ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া ডেস্ক

নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপ ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে যখন সবুজ আঙিনায় নামবেন লিওনেল মেসি, ১০ বছর আগের কোনো স্মৃতি কি মনে পড়বে আর্জেন্টিনা অধিনায়কের? পড়তে পারে, আবার নাও পারে। তবে খেলাটি যখন যুক্তরাষ্ট্রের এই মাঠে, এক দশক আগের প্রসঙ্গ তো আসছেই! ১০ বছর আগে এই মেটলাইফেই মঞ্চস্থ হয়েছিল মেসির জন্য বিষাদের এক গল্প। আর্জেন্টিনা প্রায় হারাতে বসেছিল তাদের ইতিহাসের সেরা ফুটবলারকে। ২০১৬ সালের ২৬ জুন, মেটলাইফে কোপা আমেরিকার শতবর্ষী আসরের ফাইনালে চিলির মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা দল, যাদের কাঁধে ছিল গোটা দেশের আশার ভার। সেই ভার সবচেয়ে বেশি ছিল মেসির কাঁধে।

লাখ লাখ ভক্ত-সমর্থকের চাওয়া ছিল একটাই: ২০১৫ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে চিলির বিপক্ষে টাইব্রেকারে হারের প্রতিশোধ নিয়ে আর্জেন্টিনার ২২ বছরের শিরোপা খরা কাটাবেন মেসি। যদিও আর্জেন্টিনাকে তার নেতৃত্ব দেওয়ার সামর্থ্য নিয়ে তখনও ছিল অনেক প্রশ্ন। খোদ আর্জেন্টাইনরাই সংশয় প্রকাশ করত তার নেতৃত্ব নিয়ে। শৈশবে স্পেনে চলে যাওয়ায় দেশের প্রতি তার নিবেদন নিয়েও প্রশ্ন উঠত নিয়মিত। এমনও বলা হতো- মেসি বার্সেলোনার, আর্জেন্টিনার আকাশী-নীল ও সাদা ডোরাকাটা জার্সিতে তাকে মানায় না।

বার্সেলোনার জার্সিতে গোলের পর গোল করে, ততদিনে মেসির নামের পাশে আটটি লা লিগা ও চারটি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ শিরোপা। আর্জেন্টিনার হয়েও অনেক ম্যাচে জাদুকরি পারফরম্যান্স মেলে ধরলেও, কোনো বড় শিরোপা তখনও তিনি জিততে পারেননি। অসাধারণ পারফরম্যান্সে আর্জেন্টিনাকে ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে নিয়ে যান মেসি। কিন্তু মারাকানার ফাইনালে জার্মানির কাছে অতিরিক্ত সময়ের গোলে হেরে স্বপ্ন ভাঙে তার ও আর্জেন্টিনার। পরের বছর কোপা আমেরিকা ফাইনালে চিলির বিপক্ষেও হারের কারণে অনেকে তাকে জাতীয় দলের হয়ে ব্যর্থ হিসেবেই ভাবত তখন।

বিশেষ করে, দিয়েগো মারাদোনার সঙ্গে মেসির তুলনা করার প্রবণতা দেশের মানুষের অসন্তোষকে আরও উস্কে দিয়েছিল। তবু আর্জেন্টাইনরা নতুন করে আশায় বুক বেঁধেছিল, ২০১৬ সালের ফাইনাল জিতে দেশের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটাবেন মেসি। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে উপস্থিত হয় প্রায় ৮২ হাজার দর্শক, এই মাঠে কোনো ফুটবল ম্যাচে সর্বোচ্চ। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ম্যাচে প্রথমার্ধে দুই দলই পরিণত হয় ১০ জনের দলে। লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন চিলির মার্সেলো দিয়াস, এরপর আর্জেন্টিনার মার্কোস রোহো। এতে রক্ষণাত্মক হয়ে পড়ে দুই দল। ১২০ মিনিটের লড়াইয়েও মেলেনি গোলের দেখা। টানা দ্বিতীয় বছরের মতো দুই দলের ফাইনাল গড়ায় টাইব্রেকারে।

আর্তুরো ভিদালের নেওয়া চিলির প্রথম শট ঠেকিয়ে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে রাখেন সের্হিও রোমেরো। দলের প্রথম শটটি নিতে এগিয়ে আসেন মেসি, কিন্তু কয়েক পা এগিয়ে নেওয়া তার শট ক্রসবারের ওপর দিয়ে উড়ে যায় গ্যালারিতে! চরম হতাশায় মাঝমাঠের বৃত্তে ফিরে আসেন তিনি। পরে গোল করতে ব্যর্থ হন তার সতীর্থ লুকাস বিলিয়াও এবং আর্জেন্টিনা হেরে যায় ৪-২ গোলে। কিন্তু পুরো দোষের ভাগীদার হন শুধু মেসি। গ্যালারির স্তব্ধ আর্জেন্টাইন সমর্থকদের দিকে ঘুরে ক্যামেরা চলে যায় মাঠে বিধ্বস্ত মেসির দিকে। ম্যাচ শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরই আবেগাপ্লুত মেসি এক অভূতপূর্ব ঘোষণায় বিশ্বকে হতবাক করে দেন, ‘জাতীয় দলের হয়ে আমার শেষ।’

বিশ্বের সেরা ফুটবলারদের একজন, ক্লাবের হয়ে দলীয় ও ব্যক্তিগত এত এত সাফল্য, কিন্তু কোনো বড় শিরোপা না জিতেই আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় বলে দেন মেসি, তাও আবার বয়স ৩০ ছোঁয়ার আগেই! ‘আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি আমি। সম্ভাব্য সবকিছুই চেষ্টা করেছি। এটা আমাকে অন্য সবার চেয়ে বেশি কষ্ট দেয়, কিন্তু এটা পরিষ্কার যে, এটা আমার জন্য নয়। জাতীয় দলের হয়ে একটি শিরোপা জিততে চেয়েছি অন্য সবার চেয়ে বেশি করে, কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, তা হয়নি।’

আর্জেন্টিনা ও বিশ্বজুড়ে ভক্তদের জন্য সৌভাগ্যই বলতে হয়, মেসির সেই সিদ্ধান্তটি শুধু অগাস্টের মাঝামাঝি পর্যন্তই স্থায়ী হয়েছিল। তিনি ফিরে আসেন জাতীয় দলের জার্সিতে, আবার। আর্জেন্টিনার হাহাকার যদিও বাড়তেই থাকে। ২০১৮ সালের রাশিয়া বিশ্বকাপে শেষ ষোলোয় ফ্রান্সের বিপক্ষে হেরে বিদায়ের পর, ২০১৯ সালের কোপা আমেরিকার সেমি-ফাইনালে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী ব্রাজিলের বিপক্ষে হেরে যায় আর্জেন্টিনা। তবে এর পরের গল্পটা ভিন্ন, যেখানে শুধুই প্রাপ্তির আনন্দ। মেসির নেতৃত্বেই ২৮ বছরের শিরোপা খরা ঘুচিয়ে ২০২১ সালের কোপা আমেরিকা জয় করে আর্জেন্টিনা। সেই পথ ধরে ২০২২ সালে তখনকার ইউরোপ চ্যাম্পিয়ন ইতালিকে হারিয়ে তারা জিতে নেয় ফিনালিস্সিমা ট্রফি।

একই বছরে ধরা দেয় সবচেয়ে বড় সাফল্যটি। মেসির কাঁধে ভর করে ৩৬ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে তৃতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ জয় করে আর্জেন্টিনা। ২০২৪ সালে তারা ঘরে তোলে আরেকটি কোপা আমেরিকা শিরোপা। মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্বের ওই আসর আট বছর পর মেসিকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। সামনে সেই চিলি। গ্রুপ পর্বের ম্যাচটি লাউতারো মার্তিনেসের ৮৮তম মিনিটের গোলে জিতে ২০১৫ ও ২০১৬ সালের ফাইনালের ভূত তাড়ায় আর্জেন্টিনা। এবার আর মেসির নেতৃত্বের সামর্থ্য কিংবা নিবেদন নিয়ে প্রশ্ন তোলেনি কেউ। বরং পতাকা, ব্যানার ও ছবির মাধ্যমে মহাতারকার পায়ে তৈরি হওয়া আনন্দের মুহূর্তগুলোর জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন আর্জেন্টাইনরা। ২০১৬ সালের সব সমালোচনা ২০২৪ সালে এসে উল্লাস আর ‘মেসি! মেসি! মেসি!’ ধ্বনিতে পরিণত হয়।

সপ্তাহ দুয়েক পর আবার মেটলাইফে ফেরেন মেসি ও তার আর্জেন্টিনা। সেখানেই সেমি-ফাইনালে কানাডাকে ২-০ গোলে হারিয়ে ফাইনালে জায়গা করে নেয় তারা। মেসি করেন দলের দ্বিতীয় গোলটি। মায়ামির ফাইনালে কলম্বিয়াকে হারিয়ে তারা ধরে রাখে কোপা আমেরিকার শিরোপা। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে সব মিলিয়ে পাঁচ ম্যাচ খেলেছেন মেসি। গোল করেছেন চারটি। মেটলাইফের সবুজ আঙিনা আগেও একবার মেসির জাদুর সাক্ষী হয়েছিল; ২০১২ সালে ব্রাজিলের বিপক্ষে প্রীতি ম্যাচে তিনি উপহার দিয়েছিলেন হ্যাটট্রিক, ৪-৩ গোলের রোমাঞ্চকর জয় পেয়েছিল আর্জেন্টিনা।

এই মাঠ মেসিকে যেমন বিষাদে ভুগিয়েছে, তেমনি উচ্ছ্বাসেও ভাসিয়েছে বারবার। আগামী রোববারের ফাইনালই হতে পারে বিশ্বকাপে রেকর্ড আটবারের ব্যালন দ’র জয়ীর শেষ ম্যাচ। আন্তর্জাতিক ফুটবলে মেটলাইফে শেষবারের মতো দেখা যেতে পারে ৩৯ বছর বয়সী ফরোয়ার্ডকে। সোনালি ট্রফিটায় আবার চুমু এঁকে উপলক্ষটা রাঙিয়ে রাখতে পারবেন বিশ্বকাপ ইতিহাসের রেকর্ড গোলস্কোরার?