বিশ্বকাপ শেষে বিদায় নিলেন যেসব তারকার
প্রকাশ : ২৫ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রীড়া ডেস্ক

আন্তর্জাতিক ফুটবল ক্যারিয়ারের ইতি টানা তারকাদের তালিকায় যুক্ত হলেন মানুয়েল নয়্যার, নেইমার জুনিয়র, রিয়াদ মাহরেজ, গিলেরমো ওচোয়া এবং প্যাট্রিক শিক। ফিফা বিশ্বকাপের শেষ বাঁশি বাজা মানে শুধু একটি টুর্নামেন্টের সমাপ্তি নয়। কিছু দলের কাছে এটি শিরোপা জয়ের স্বপ্নভঙ্গের বেদনা; আবার অন্যদের জন্য এটি নতুন দিগন্তের সূচনা। তবে এবার বিশ্ব ফুটবলের বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী ও কালজয়ী তারকার আন্তর্জাতিক মঞ্চকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানানোর ক্ষণ হিসেবেই চিহ্নিত হয়ে থাকবে। মানুয়েল নয়্যার, নেইমার, রিয়াদ মাহরেজ, গিলেরমো ওচোয়া এবং প্যাট্রিক শিকের বিদায়ের মধ্য দিয়ে আমরা এমন পাঁচ ফুটবলারকে বিদায় জানাচ্ছি, যারা বহু বছর ধরে নিজ নিজ জাতীয় দলে গভীর ছাপ রেখে গেছেন। একইসঙ্গে ফ্রান্সের জাতীয় কোচ দিদিয়ের দেশঁও ‘লে ব্লুস’দের হয়ে শেষবারের মতো ডাগআউটে দাঁড়ালেন, যার মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটল তাঁর ১৪ বছরের অবিশ্বাস্য ও সফল এক কোচিং অধ্যায়ের। তারা সবাই মিলে আন্তর্জাতিক ফুটবলের সর্বোচ্চ পর্যায়ে বহু দশকের অভিজ্ঞতা, বিশ্বকাপ শিরোপা, মহাদেশীয় শ্রেষ্ঠত্ব এবং খেলার সবচেয়ে বড় মঞ্চে তৈরি করে গেছেন অসংখ্য অবিস্মরণীয় মুহূর্ত। মানুয়েল নয়্যার: গোল পোস্টের রূপরেখা বদলে দেওয়া গোলরক্ষক ২০০৯ সালের ২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিরুদ্ধে যখন প্রথমবার জার্মানির জাতীয় দলের জার্সি গায়ে চাপিয়েছিলেন মানুয়েল নয়্যার, তখন কেউই ভাবতে পারেনি যে এই ছেলেই একদিন গোলরক্ষকের সংজ্ঞাটাই পুরো বদলে দেবেন। বক্স ছেড়ে সাহসের সঙ্গে বাইরে বেরিয়ে আসা, পায়ে বলের চমকপ্রদ নিয়ন্ত্রণ এবং খেলার পরিস্থিতি বোঝার অবিশ্বাস্য ক্ষমতার কারণে ২০১৪ বিশ্বকাপজয়ী এই তারকা হয়ে ওঠেন আধুনিক ‘স্যুইপার-কিপার’-এর পথপ্রদর্শক। জার্মানির সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে তার এই প্রভাব। ২০১০ সালে নিজের প্রথম বিশ্বকাপেই জার্মানিকে সেমিফাইনাল পর্যন্ত নিয়ে যান নয়্যার। চার বছর পর ব্রাজিলের মাটিতে জার্মানির চতুর্থ বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম প্রধান নায়ক ছিলেন তিনি এবং টুর্নামেন্টের সেরা গোলরক্ষক হিসেবে জেতেন অ্যাডিডাস গোল্ডেন গ্লাভস। আলজেরিয়ার বিপক্ষে বিশ্বকাপের শেষ ষোলোর ম্যাচটি আজও তার বিপ্লবাত্মক খেলার শৈলীর সেরা উদাহরণ হয়ে আছে। পূর্বে অবসরের ঘোষণা দিলেও ২০২৬ ফিফা বিশ্বকাপের জন্য আবার জাতীয় দলে ফিরেছিলেন নয়্যার। তবে টুর্নামেন্টের আগেই তিনি পরিষ্কার করেছিলেন যে এটি শুধু একটি বিশেষ প্রত্যাবর্তন। টুর্নামেন্ট থেকে জার্মানির বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে ১২৮টি ম্যাচ, ৫টি বিশ্বকাপ এবং ১৭ বছরেরও বেশি সময়ের এক দীর্ঘ ও গৌরবময় আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের পর্দা টানলেন তিনি।
নেইমার: সর্বোচ্চ গোলদাতার বিদায় বার্তা
সেলেসাওদের হয়ে নেইমারের রূপকথা যে মাঠে শুরু হয়েছিল, ঠিক ১৬ বছর পর সেই একই মাঠে এসে তার সমাপ্তি ঘটল- নিউ ইয়র্ক নিউ জার্সি স্টেডিয়াম।
২০১০ সালের ১০ আগস্ট মাত্র ১৮ বছর বয়সে যুক্তরাষ্ট্রের বিপক্ষে ওই স্টেডিয়ামেই আন্তর্জাতিক অভিষেক ঘটে তার এবং অভিষেকেই গোল পান। সেখান থেকেই শুরু হয় সেই পথচলা, যার মাধ্যমে নেইমার হয়ে ওঠেন ব্রাজিলের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এবং বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে চেনা মুখগুলোর একজন। তার ক্যারিয়ারের অন্যতম বড় সাফল্য ছিল ২০১৩ ফিফা কনফেডারেশন কাপে ব্রাজিলকে শিরোপা জেতানো এবং ২০১৬ অলিম্পিক ফাইনালে জার্মানির বিরুদ্ধে টাইব্রেকারে জয়সূচক পেনাল্টি থেকে দলকে পুরুষ ফুটবলে দেশের প্রথম অলিম্পিক স্বর্ণ উপহার দেওয়া। দুর্ভাগ্যবশত, চোট, মর্মান্তিক পরাজয় এবং নকআউট পর্বের চরম হতাশার কারণে বিশ্বকাপ ট্রফি ছোঁয়ার স্বপ্নটি তার অধরাই থেকে যায়। নরওয়ের কাছে ব্রাজিলের শেষ ষোলোর পরাজয়ের পরপরই জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন নেইমার। ১৩০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ এবং ৮০টি গোল নিয়ে তিনি এমন এক উত্তরাধিকার রেখে যাচ্ছেন যা সেলেসাওদের ইতিহাসে তার স্থান চিরস্থায়ী করে রাখবে।
রিয়াদ মাহরেজ: এক সোনালী প্রজন্মের কাপ্তান
রিয়াদ মাহরেজ শুধু আলজেরিয়ার সবচেয়ে সৃজনশীল আক্রমণাত্মক খেলোয়াড়ই ছিলেন না; দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি হয়ে উঠেছিলেন নিজ দেশের ফুটবলকে পুনরুজ্জীবিত করা একটি দলের জীবন্ত প্রতীক। ২০১৪ সালে অভিষেকের মাত্র কয়েক সপ্তাহ পরেই ব্রাজিল বিশ্বকাপের দলে ডাক পান মাহরেজ। সেই টুর্নামেন্টে ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে পৌঁছায় আলজেরিয়া।
তবে অধিনায়ক হিসেবে মাহরেজের সবচেয়ে বড় সাফল্য আসে পাঁচ বছর পর। ২০১৯ আফ্রিকা কাপ অফ নেশনসে আলজেরিয়াকে শিরোপা এনে দেন তিনি। বিশেষ করে সেমিফাইনালে নাইজেরিয়ার বিপক্ষে ইনজুরি টাইমে নেওয়া তার চমৎকার ফ্রি-কিক গোলটি টুর্নামেন্টের সাম্প্রতিক ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। আলজেরিয়া বিশ্বকাপের যোগ্যতা অর্জন করার পরই মাহরেজ ঘোষণা দিয়েছিলেন ২০২৬ সংস্করণটিই হবে তার শেষ বিশ্বকাপ। অবশেষে সুইজারল্যান্ডের কাছে আলজেরিয়া হেরে যাওয়ার পর আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে নিজের বিদায়ের চূড়ান্ত ঘোষণা দেন তিনি।
গিলেরমো ওচোয়া: মেক্সিকোর ‘মিষ্টার বিশ্বকাপ’
খুব কম খেলোয়াড়ই গিলেরমো ওচোয়ার মতো ফিফা বিশ্বকাপের সাথে নিজেদের নাম এমনভাবে জড়িয়ে নিতে পেরেছেন। ২০০৫ সালে মেক্সিকোর হয়ে এই গোলরক্ষকের যখন অভিষেক হয়, তখন কেউ কল্পনাও করতে পারেনি যে তার এই যাত্রা টানা ছয়টি বিশ্বকাপে গিয়ে ঠেকবে— যা এর আগে কোনো মেক্সিকান ফুটবলার স্পর্শ করতে পারেননি। ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চেই ওচোয়ার সেরা রূপটি দেখা যেত। ২০১৪ সালে আয়োজক দেশ ব্রাজিলের একের পর এক আক্রমণ একা হাতে রুখে দিয়ে বিশ্বকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। চার বছর পর জার্মানির বিপক্ষে মেক্সিকোর ঐতিহাসিক জয়েও তিনি বড় ভূমিকা রাখেন। ২০২২ বিশ্বকাপে রবার্ট লেভানডফস্কির পেনাল্টি আটকে দিয়ে আবারও বিশ্বজুড়ে শিরোনাম হয়েছিলেন এই স্পাইডারম্যান। অবশেষে ২০২৬ সালের ঘরের মাঠের বিশ্বকাপেই একটি বর্ণাঢ্য যুগের অবসান ঘটল। গ্যালারিতে দাঁড়িয়ে করতালি ও করতালি দিয়ে তাকে বিদায় জানান ভক্তরা— দুই দশক ধরে বিশ্বকাপের ইতিহাসের সঙ্গে মিশে থাকা এক মহানায়কের জন্য যা ছিল একদম উপযুক্ত বিদায় সংবর্ধনা।
প্যাট্রিক শিক: ইতিহাস গড়ে বিদায় নেওয়া চেক আইকন একটিমাত্র দুর্দান্ত শটে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছেন- এমন ফুটবলারের সংখ্যা হাতে গোনা, যার মধ্যে চেক ফরোয়ার্ড প্যাট্রিক শিক নিশ্চিতভাবেই একজন। ইউরো ২০২০-এ স্কটল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রায় ৫০ গজ দূর থেকে এক অবিশ্বাস্য দূরপাল্লার শটে গোল করে বিশ্বজুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিলেন শিক, যা পরবর্তীতে টুর্নামেন্টের সেরা গোল হিসেবে স্বীকৃতি পায়। ২০১৬ সালে মাল্টার বিরুদ্ধে অভিষেকেই গোল করে তার আন্তর্জাতিক যাত্রা শুরু হয়েছিল। ঠিক ১০ বছর পর বিশ্বকাপের মঞ্চ থেকে দেশের বিদায়ের পর নিজের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টানলেন তিনি। বিদায়ী বার্তায় শিক জানান যে এই সিদ্ধান্তটি হুট করে নেওয়া নয়, বরং বেশ কিছুদিন ধরেই তার মনে ছিল। একই সঙ্গে তিনি আশা প্রকাশ করেন যে চেক ফুটবলের অগ্রগতি বজায় রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণা যোগাতে তিনি ভবিষ্যতেও অবদান রেখে যাবেন। দিদিয়ে দেশঁ: মাঠ ও ডাগআউটের বিশ্বজয়ী বীর দিদিয়ে দেশঁর মতো ফরাসি ফুটবলে এত গভীর ও স্থায়ী প্রভাব খুব কম মানুষই ফেলতে পেরেছেন। অধিনায়ক হিসেবে ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সকে তাদের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দিয়েছিলেন তিনি। দুই দশক পর মারিও জাগালো এবং ফ্রাঞ্জ বেকেনবাউয়ারের পর ইতিহাসের মাত্র তৃতীয় ব্যক্তি হিসেবে খেলোয়াড় এবং কোচ- উভয় ভূমিকাতেই বিশ্বকাপ জয়ের অসামান্য কীর্তি গড়েন দেশঁ। ২০১২ সালে কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে ফ্রান্সকে আন্তর্জাতিক ফুটবলের শীর্ষ স্তরে ধারাবাহিকভাবে টিকিয়ে রেখেছিলেন দেশঁ। তার অধীনে ‘লে ব্লুস’রা ২০১৬ ইউরো ফাইনালে ওঠে, ২০১৮ বিশ্বকাপ জেতে, ২০২১ উয়েফা নেশনস লিগ জয় করে এবং ২০২২ বিশ্বকাপের ফাইনালে পৌঁছায়। ২০২৬ বিশ্বকাপ শুরু হওয়ার আগেই দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোর ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন ৫৭ বছর বয়সী এই কোচ। ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তৃতীয় স্থান নির্ধারণী ম্যাচটির মধ্য দিয়েই শেষ হলো একটি মহাকাব্যিক ১৪ বছরের ‘দেশঁ অধ্যায়’, যার অধীনে ফ্রান্স বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি হিসেবে নিজেদের আধিপত্য বজায় রেখেছিল।
