নাহিদ রানার চোট নিয়ে বিতর্ক, নির্বাচকের যুক্তি
প্রকাশ : ২৮ জুলাই ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রীড়া প্রতিবেদক

অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজ শুরুর আগেই সবচেয়ে বড় ধাক্কা খেয়েছে বাংলাদেশ। দলের সবচেয়ে গতিময় পেসার নাহিদ রানা চোটের কারণে পুরো সিরিজ থেকেই ছিটকে গেছেন। তবে এই চোটের পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছে, অস্ট্রেলিয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ সফরের আগে কেন জিম্বাবুয়ে সফরে এত বেশি খেলানো হয়েছিল তাকে? সেই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন প্রধান নির্বাচক হাবিবুল বাশার।
অস্ট্রেলিয়ায় সফরে প্রথম টেস্টের দল ঘোষণার পরদিন গতকাল সোমবার সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আমরা যখনই কোনো ক্রিকেটারকে নির্বাচন করি, শুধু নাহিদ রানা নয়, যে কোনো ক্রিকেটার, একটা মূল্যায়ন আমরা চাই মেডিকেল বিভাগ থেকে এবং সংশ্লিষ্ট ম্যানেজমেন্ট যারা আছেন, যারা ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট করেন ক্রিকেটারদের, তাদের কাছ থেকে। আমরা রিপোর্ট নেই, কাকে পাওয়া যাবে, কাকে নয়। এখন কিন্তু ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট মুখে মুখে হয় না। জিপিএস ট্র্যাকার থাকে, তারা সবকিছু ট্র্যাক করে। কে কোন ম্যাচটা খেলবে, কে কয়টা ম্যাচ খেলবে, কোন সিরিজে কোনটা খেলতে পারবে, কোনটা পারবে না, এভাবে কিন্তু সবারটা করা হয়। শুধু নাহিদ রানা নয়, সবারটাই করা হয়।’
হাবিবুলের দাবি, নাহিদের ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্টে কোনো সমস্যা ছিল না। বরং অস্ট্রেলিয়া সফরকে ভাবনায় রেখে বাড়তি সতর্কতাও ছিল। ‘নাহিদ রানাকে যদি দেখেন, আমরা অস্ট্রেলিয়ার সাথে (দেশের মাঠে সীমিত ওভারের সিরিজে) সব ম্যাচ খেলাইনি। সেখানে প্রথম দুটি ওয়ানডে খেলেছে, তারপর এক সপ্তাহ বিরতি পেয়েছে, এরপর দুটি টি-টোয়েন্টি খেলেছে। ওয়ার্কলোড ম্যানেজমেন্ট অনুযায়ী, (জিম্বাবুয়েতে) টেস্ট ম্যাচে সে অ্যাভেইলঅ্যাবল ছিল, তার পরও তাকে আমরা খেলাইনি বাড়তি সতর্কতার জন্য, যেহেতু অস্ট্রেলিয়ায় আমাদের গুরুত্বপূর্ণ সিরিজ আছে। জিম্বাবুয়েতে ওয়ানডে সিরিজে দুটি ম্যাচ খেলেছে। টি-টোয়েন্টিতে প্রথম ম্যাচ খেলেছে, দ্বিতীয় ম্যাচে ব্যথা পেয়েছে। আমার মনে হয়, এটা দুর্ভাগ্যজনক। হ্যাঁ, টি-টোয়েন্টিতে না খেলালেও পারতাম। ওয়ানডে সিরিজটি বিশ্বকাপের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল (সরাসরি কোয়ালিফাই করার জন্য), টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ দুই বছর পর, সেখানে ওকে আমরা বিরতি দিতে পারতাম।’
তাহলে বিরতি কেন দেওয়া হলো না? নাহিদ রানার চোট নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন বা বিতর্ক এখানেই। পরের বিশ্বকাপে সরাসরি জায়গা করে নেওয়ার জন্য ওয়ানডে সিরিজটি গুরুত্বপূর্ণ ছিল। সেখানে তাকে খেলানো যেতেই পারে। টি-টোয়েন্টি সিরিজে খেলানো কেন এতটা জরুরি ছিল? হাবিবুল মানছেন, টি-টোয়েন্টিতে নাহিদকে না খেলালেও চলত। তবে সেখানেও ওয়ার্কলোড সংক্রান্ত ব্যাখ্যা আছে প্রধান নির্বাচকের। ‘এখানে একটা জিনিস আছে, যেটা আমাদের ওয়ার্কলোড যারা ম্যানেজ করেন, তারা বলে থাকেন, দুটো ব্যাপার আছে ট্র্যাক করার, একজন ফাস্ট বোলারের ‘রেড’, ‘ইয়োলো’, ‘গ্রিন’ জোন বলে থাকি। অনেক সময় ওভারলোড হয়ে গেলে রেড জোনে চলে যায়, আবার কম বোলিং করলে কিন্তু রেড জোনে চলে যায়। গ্রিন জোনে থাকার জন্য কিন্তু তাকে যথেষ্ট পরিমাণে বোলিংও করতে হয়। যথেষ্ট বোলিং করে গ্রিন জোনে গিয়ে টেস্ট ম্যাচ খেলতে হয়। কাজেই তাকে কিছু একটা খেলতেই হতো। ফাস্ট বোলারকে না খেলিয়ে যদি বসিয়ে রাখেন, সেটাও কিন্তু ভালো নয় বোলারের জন্য। একটা যেকোনো ম্যাচ খেলার আগে নির্দিষ্ট পরিমাণে বল করে প্রস্তুত হতে হয়। বেশি বল করাটা যেমন ঝুঁকির, তেমনি কম বল করলেও রেড জোনে যেতে হয়। এই চিন্তাভাবনা থেকেই খেলানো হয়েছে (জিম্বাবুয়েতে টি-টোয়েন্টি সিরিজে)। না খেলালেও কিছু হতো না, কিন্তু তাকে কিছু একটা খেলতেই হতো।’
ফাস্ট বোলারদের চোট যেকোনো সময়ই হানা দিতে পারে, সেই বাস্তবতাও মনে করিয়ে দিলেন হাবিবুল। ‘দুর্ভাগ্যজনক যে, এখানে লেগেছে (চোট)। এই লাগাটা হয়তো অস্ট্রেলিয়া গিয়েও লাগতে পারত। কারণ একজন ফাস্ট বোলারকে কখনোই পুরো চোটমুক্ত রাখা যাবে না, যতই চেষ্টা করেন। ফাস্ট বোলারদের যদি ইতিহাস দেখেন, কাজটা কঠিন। হয়তো যতটা সম্ভব (চোট) কমিয়ে রাখার চেষ্টা করা যায়। কিন্তু বোলিং করবে, অথচ চোট হবে না, এটা কঠিন। আমরা কিন্তু অনেক অনেক মেইনটেইন করছি, প্রতিটা মুহূর্ত বাড়তি যত্নও নেওয়া হচ্ছে। তার পরও কেউ যখন চোট পায়, এটা দুঃখজনক আমাদের সবার জন্য।’
নাহিদ নেই গোটা সিরিজে, চোটের কারণে প্রথম টেস্টে নেই শরিফুল ইসলামও। বলার অপেক্ষা রাখে না, পেস আক্রমণের ধার তাতে কমে গেছে অনেকটাই। প্রধান নির্বাচকের চাওয়া, বাকিরা পুষিয়ে দেবেন এই ঘাটতি। ‘কাউকে না কাউকে তো দায়িত্ব নিতে হবেই। আমরা যখন টেস্ট ম্যাচ জিতেছি পাকিস্তানের সঙ্গে, হাসান মাহমুদ ছিল আমাদের মূল বোলার। হাসান এবারও আছে, তাসকিন আছে। যদি বিশ্ব ক্রিকেটে বোলারদের দিকে তাকিয়ে দেখেন, নাহিদ রানার সঙ্গে সবার কিন্তু একটা গ্যাপ আছে। নাহিদ, মিচেল স্টার্ক, তারা সবসময় উঁচু পেসে বল করে থাকে। সে (নাহিদ) রোমাঞ্চকর বোলার, শুধু আমাদের জন্য নয়, বিশ্ব ক্রিকেটেই সে রোমাঞ্চকর বোলার। তাকে না পাওয়া আমাদেরর জন্য কঠিন তো বটেই, বিশ্ব ক্রিকেটেও সবাই আশা করে তার বোলিং দেখতে। তবে এটাও মানতে হবে, সে সব ম্যাচ খেলতে পারবে না। এটা মেনে নিয়েই এগোতে হবে। নাহিদ রানার না থাকাটা অবশ্যই অনেক বড় ধাক্কা। অস্ট্রেলিয়া দলটা যদি আপনারা দেখেন, ওরা আমাদেরকে যেভাবে নিয়েছে, ওর (নাহিদ) না থাকাটা অবশ্যই বড় ব্যাপার। তবে সেরা খেলোয়াড়কে পাব না, সেটা নিয়ে আসলে বসে থাকতে চাই না। আমার হাতে যেটা আছে, আমি মনে করি আমার এটাই সেরা দল, এটা নিয়েই আমাদের চেষ্টা করতে হবে।’
অস্ট্রেলিয়া দলকে দিয়েই উদাহরণ দিলেন হাবিবুল। গত অ্যাশেজে চোটের কারণে স্রেফ একটি টেস্ট খেলতে পেরেছিলেন অধিনায়ক প্যাট কামিন্স, এক ম্যাচও খেলতে পারেননি জশ হেইজেলউড। বাংলাদেশ দলকেও হাহুতাশ না করে বিকল্প পথ খুঁজে নিতে বললেন দেশের সাবেক এই অধিনায়ক। ‘নাহিদ রানার আক্ষেপ তো আপনি ঘোচাতে পারবেন না। সে স্পেশাল বোলার। যে কোনো টেস্ট দলের কথা চিন্তা করলে সে সেনসেশনাল বোলার, স্পেশাল বোলার। তার না থাকার আক্ষেপটা তো থাকবেই। তবে গত অ্যাশেজে কিন্তু প্যাট কামিন্স খেলেনি, তাকে ছাড়া অস্ট্রেলিয়াকে খেলতে হয়েছে। তারা তো একবারও বলেনি যে আমাদের মূল বোলার ও অধিনায়ক নেই! কাজেই আপনার যখন মূল বোলার না থাকবে, সেটা নিয়ে আক্ষেপ করে তো আসলে এগোতে পারবেন না। আমাদের যারা আছেন, তাসকিন দুর্দান্ত বোলার, যদি ফিট থাকে, হাসান মাহমুদকে আপনারা সবাই দেখেছেন। যদি এই দুজন মানে ফিট থাকে ভালো করেৃ পাশাপাশি খালেদও খারাপ করেনি, এবাদতও কিন্তু অতীতে ভালো করেছে। এই কজনকে নিয়েই আসলে আমাদের এগোতে হবে। আক্ষেপ তো থাকবেই, তবে সেটা নিয়ে আসলে আমরা এখন আর পড়ে থাকতে চাই, সামনের দিকে তাকাতে চাই।’
