ইমরান খানের মুক্তি চেয়ে কাঁদলেন মিয়াদাদ

প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া ডেস্ক

একসঙ্গে কেটেছে ক্যারিয়ারের সোনালি সময়। একই দলের হয়ে খেলেছেন, একই স্বপ্নের পেছনে ছুটেছেন। ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটে একসঙ্গে থেকেছেন ছয় মাস। একসঙ্গে খেয়েছেন, সময় কাটিয়েছেন। পরে পাকিস্তানের জার্সিতে নেমেছেন মাঠে। আর ১৯৯২ সালে একই সঙ্গে গড়েছেন পাকিস্তান ক্রিকেটের সবচেয়ে গর্বের অধ্যায়-বিশ্বকাপ জয়! সেই সতীর্থই আজ কারাগারে। রাওয়ালপিন্ডির আদিয়ালা কারাগারে বন্দী পাকিস্তানের বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। তার বর্তমান পরিস্থিতির কথা বলতে গিয়ে আবেগ ধরে রাখতে পারেননি আরেক কিংবদন্তি জাভেদ মিয়াদাদ। কথা বলতে বলতে চোখে পানি চলে আসে তার। সাবেক সতীর্থের মুক্তির জন্য পাকিস্তানের ক্ষমতাসীনদের কাছে আকুতি জানিয়েছেন তিনি। ইমরানের সঙ্গে নিজের দীর্ঘ সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে মিয়াদাদ যেন ফিরে গিয়েছিলেন সেই পুরোনো দিনে। ক্রিকেট মাঠের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ড্রেসিংরুমের সময় আর একসঙ্গে কাটানো অসংখ্য মুহূর্তের স্মৃতি তখন তার কথায়।

মিয়াদাদ বলেন, ‘ইমরান আর আমি একসঙ্গে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছি। ইংল্যান্ডে ছয় মাস একসঙ্গে থেকেছি। একসঙ্গে খেয়েছি, সময় কাটিয়েছি। পরে পাকিস্তান দলেও একসঙ্গে খেলেছি। আমার কাছ থেকে তাকে অধিনায়কত্বও দিয়েছিলাম। আমাদের সম্পর্ক খুব ভালো ছিল।’ ক্রিকেট তাদের সম্পর্ককে শুধু সতীর্থের গণ্ডিতে আটকে রাখেনি। ১৯৯২ বিশ্বকাপেও দুজনের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ফাইনালে তৃতীয় উইকেটে ইমরান ও মিয়াদাদ মিলে গড়েছিলেন ১৩৯ রানের জুটি। সেই ম্যাচ জিতে প্রথমবারের মতো ওয়ানডে বিশ্বকাপের শিরোপা ঘরে তুলেছিল পাকিস্তান।

সময়ের সঙ্গে অবশ্য দুজনের সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। ক্রিকেট থেকে অবসর নেওয়ার পর ইমরানের রাজনৈতিক নেতৃত্ব এবং পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ডের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রকাশ্যেই সমালোচনা করেছিলেন মিয়াদাদ। কিন্তু মতপার্থক্যের সেই অধ্যায় এখন যেন তার কাছে তুচ্ছ। পুরোনো সতীর্থের বন্দিদশা তাকে নাড়া দিয়েছে অন্যভাবে। ইমরানকে মুক্তি দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে মিয়াদাদ প্রশ্ন তুলেছেন, এত ভয় কেন?

ন্যারেটিভস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ‘কেউ আমাকে এটা বুঝিয়ে বলুন। ইমরান কি পাকিস্তানকে গিলে খাবে?’ শুধু আবেগ নয়, সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের পথও দেখিয়েছেন মিয়াদাদ। তার মতে, ইমরানকে ঘিরে চলমান পরিস্থিতি আর দীর্ঘায়িত না করে সংশ্লিষ্ট সবার আলোচনায় বসা উচিত। মিয়াদাদ বলেন, ‘সবাইকে বসতে হবে এবং বিষয়টির সমাধান করতে হবে। সমস্যা যা-ই থাকুক, পাকিস্তানের জন্য সেটিই এখন দরকার। বিষয়টি অযথা দীর্ঘায়িত করা হচ্ছে। এটা ঠিক নয়।’

এরপরই তার কণ্ঠে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে ব্যক্তিগত কষ্ট। ইমরানকে শুধু সাবেক অধিনায়ক বা জাতীয় বীর হিসেবে নয়, নিজের খুব কাছের একজন মানুষ হিসেবেই দেখেন তিনি, ‘সে তো কারও সন্তান। প্রায়ই আমার মনে হয়, মানুষটা কী অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে! আমরা খুব কাছের ছিলাম। একসঙ্গে কাউন্টি ক্রিকেট খেলেছি, সময় কাটিয়েছি, একে অপরকে খুব ভালোভাবে বুঝতাম। একসঙ্গে আমরা পাকিস্তানকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছি।’ ইমরানের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগ ও তার কারাবাস নিয়ে মিয়াদাদ শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছেন। এবারও তিনি ইমরানকে সৎ মানুষ হিসেবে তুলে ধরে তার মুক্তির দাবি জানিয়েছেন, ‘যা ভুল, তা ভুলই। সে অবশ্যই একজন জাতীয় বীর। আমি প্রার্থনা করি, এই সমস্যার সমাধান হোক। পাকিস্তান সরকারের কাছে আমার আবেদন।’

এরপর আরও দৃঢ়ভাবে ইমরানের চরিত্রের পক্ষে কথা বলেন তিনি, ‘আমি ইমরানকে সবদিক থেকেই চিনি। সে একজন সৎ মানুষ।’ সাক্ষাৎকারের একপর্যায়ে আবেগ আর ধরে রাখতে পারেননি মিয়াদাদ। চোখে পানি চলে আসে তার। তখন তার কথাগুলো আর শুধু একজন সাবেক ক্রিকেটারের বক্তব্য ছিল না; হয়ে ওঠে দীর্ঘদিনের এক সতীর্থের জন্য আরেক সতীর্থের ব্যক্তিগত আর্তি, ‘আমার প্রার্থনা, ন্যায়সংগত বিষয়টির জয় হোক। আমি যা বলছি, হৃদয় থেকেই বলছি।’ ইমরানকে ঘিরে রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে পাকিস্তানের স্বার্থে সবাইকে এক হওয়ার আহ্বানও জানিয়েছেন মিয়াদাদ। তার কাছে ইমরানের পরিচয় এখন কোনো রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে নয়, পাকিস্তানের হয়ে বিশ্বকাপ জেতা একজন ক্রিকেটার এবং দেশের একজন নাগরিক হিসেবে, ‘আমরা সবাই পাকিস্তানি। আমরা সবাই পাকিস্তানের পতাকা বহন করেছি। অন্য সব পার্থক্য এখন শেষ হওয়া উচিত। দেশপ্রেমের দিক থেকে সে কারও চেয়ে কম নয়।’

ইমরানের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগের কথাও জানিয়েছেন তিনি। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর কিছু হলে পাকিস্তানে বড় ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন মিয়াদাদ, ‘সৃষ্টিকর্তা না করুন, তার কিছু হলে দেশে কী ঘটবে, তা কি কল্পনা করতে পারেন? পুরো পাকিস্তান কাঁদবে।’