অভিষেকেই মিরাজের বাজিমাত
প্রকাশ : ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রীড়া প্রতিবেদক

ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগে (সিপিএল) এত দিন মাঠে নামার সুযোগ হয়নি তার। এবার সুযোগ মিলতেই যেন অপেক্ষার জবাবটা এক ম্যাচেই দিয়ে দিলেন মেহেদী হাসান মিরাজ। সিপিএলে নিজের অভিষেক ম্যাচে বল হাতে তিন উইকেট নিয়ে সেন্ট লুসিয়া কিংসের ব্যাটিংয়ের ভিত নাড়িয়ে দিয়েছেন বাংলাদেশের এই অলরাউন্ডার। আর অন্য প্রান্তে ইমরান তাহিরের রেকর্ড গড়া পাঁচ উইকেট। দুই স্পিনারের ঘূর্ণিতে মাত্র ১১৯ রানেই গুটিয়ে গেল সেন্ট লুসিয়া কিংস। পরে শেষ দিকে কুয়েন্টিন স্যাম্পসনের ঝড়ো ব্যাটিংয়ে ৯ বল হাতে রেখে ৪ উইকেটের জয় তুলে নিল গায়ানা অ্যামাজন ওয়ারিয়র্স।
প্রভিডেন্সে টস জিতে সেন্ট লুসিয়াকে ব্যাটিংয়ে পাঠায় গায়ানা। শুরুটা অবশ্য খারাপ ছিল না সফরকারীদের। পাওয়ার প্লেতে এক উইকেট হারিয়ে ৫১ রান তুলে ফেলেছিল তারা। কামিল পুরানের ব্যাটে তখন বেশ স্বচ্ছন্দেই এগোচ্ছিল সেন্ট লুসিয়া। তারপরই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন মিরাজ! পাওয়ার প্লে শেষ হতেই হাতে বল তুলে দেওয়া হয় বাংলাদেশের অফ স্পিনারকে। আর নিজের প্রথম ওভারেই দলকে এনে দেন কাঙ্ক্ষিত ব্রেকথ্রু। জন ক্যাম্পবেলকে ১২ রানে ফেরানোর মধ্য দিয়ে সিপিএলে নিজের উইকেটের খাতা খোলেন মিরাজ। এরপর একে একে কেমল স্যাভরি ও চারিত আসালাঙ্কাকেও ফিরিয়ে দেন তিনি।
বিশেষ করে নিজের তৃতীয় ওভারটিই ছিল মিরাজের জন্য সবচেয়ে কার্যকর। ওই ওভারে দুটি উইকেট নিয়ে সেন্ট লুসিয়ার ব্যাটিংয়ে বড় ধাক্কা দেন তিনি। একসময় ৭২ রান তুলতেই ছয় উইকেট হারিয়ে বসে সেন্ট লুসিয়া। মিরাজের সঙ্গে তখন যোগ দেন আরেক স্পিনার ইমরান তাহির। পুরানকে ৪৩ রানে ফিরিয়ে দিয়ে সেন্ট লুসিয়ার বড় স্কোরের স্বপ্নে প্রথম আঘাতটা করেন তাহির। এরপর একে একে আরও চারটি উইকেট তুলে নিয়ে পূর্ণ করেন পাঁচ উইকেট। চার ওভারে মাত্র ১৭ রান দিয়ে পাঁচ উইকেট-আর তাতেই ৪৭ বছর ১৬৬ দিন বয়সে টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি বয়সে পাঁচ উইকেট নেওয়ার বিশ্বরেকর্ড গড়েন দক্ষিণ আফ্রিকার এই লেগস্পিনার।
সেন্ট লুসিয়ার ইনিংসের শেষটাও আসে নাটকীয়ভাবে। ৮১ রানে নয় উইকেট হারানো দলটিকে ১১৯ পর্যন্ত টেনে নেন ওবাস পিনার। যুক্তরাষ্ট্রের এই অলরাউন্ডার ২৮ বলে করেন ৩৫ রান। তবু ১৮.৫ ওভারের বেশি টিকতে পারেনি সেন্ট লুসিয়া। গায়ানার হয়ে মিরাজের হিসাবটা তখন বেশ ঈর্ষণীয়-চার ওভারে মাত্র ১৩ রান, তিন উইকেট। অভিষেক ম্যাচেই এমন পারফরম্যান্স নিশ্চয়ই বাংলাদেশের অলরাউন্ডারের জন্য স্বস্তিরও! কারণ বিদেশি ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে মিরাজের আগের অভিজ্ঞতা খুব একটা সুখকর ছিল না। এ বছর লঙ্কা প্রিমিয়ার লিগে চার ম্যাচ খেলেও কোনো উইকেট পাননি। ২০২৫ সালে পাকিস্তান সুপার লিগে লাহোর কালান্দার্স তাকে দলে নিলেও কোনো ম্যাচ খেলার সুযোগ মেলেনি। এমনকি ২০১৭ সালে ত্রিনবাগো নাইট রাইডার্স তাকে দলে নিয়েছিল, সেবারও মাঠে নামা হয়নি।
সিপিএলে এবার সেই অপেক্ষার অবসান। আর মাঠে নেমেই মিরাজ বুঝিয়ে দিলেন, সুযোগ পেলে তিনি কী করতে পারেন। রান তাড়ায় গায়ানার শুরুটা অবশ্য খুব একটা বিধ্বংসী ছিল না। মাভেন্দ্রা ডিন্ডাল ৫ রান করে ফেরার পর গ্লেন ফিলিপস ও শেই হোপ মিলে ইনিংস গড়ার চেষ্টা করেন। ৪০ বলে ৩৭ রান করে ফিলিপস ফেরার সময় ১৩ ওভার শেষে গায়ানার সংগ্রহ ছিল ২ উইকেটে ৬৬।
এরপর হোপ, শিমরন হেটমায়ার ও মিরাজ দ্রুত ফিরে গেলে ম্যাচে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়। বিশেষ করে পাঁচ নম্বরে নেমে মিরাজের ব্যাটিংটা ছিল হতাশাজনক। রিস্টন চেজের বলে মাত্র ১ রান করে ফেরেন তিনি। একপর্যায়ে গায়ানার জয়ের জন্য প্রয়োজন ছিল ১৫ বলে ২১ রান। তারপর যা ঘটল, সেটাকে বলা যায় নিখাদ স্যাম্পসন-শো!
মাত্র ১১ বলে পাঁচটি ছক্কা হাঁকিয়ে ৩৭ রানে অপরাজিত থাকেন কুয়েন্টিন স্যাম্পসন। তার বিধ্বংসী ক্যামিওতেই ম্যাচের সব হিসাব মুহূর্তে বদলে যায়। ১৮.৩ ওভারে ৬ উইকেটে ১২২ রান তুলে ৯ বল হাতে রেখেই জয় নিশ্চিত করে গায়ানা। ম্যাচ শেষে মিরাজের প্রশংসায় পঞ্চমুখ গায়ানা অধিনায়ক ইমরান তাহির। মোহাম্মদ নবির জায়গায় দলে আসা মিরাজকে নিয়ে তার মুখে শোনা গেল বড় প্রশংসা, 'আমাদের সঙ্গে নাবি ছিল। তার মান অনেক অনেক উঁচুতে। আমাদের সেরা বোলার ছিল। তবে মিরাজ এলো, সত্যি বলতে, আমরা কিছুই ভাবিনি। এরপর সে খুবই ভালো বোলিং করব, ঠিক যেভাবে আমরা চেয়েছিলাম। তার মতো একজনকে দলে পাওয়া দারুণ ব্যাপার। বিশ্বমানের স্পিনার সে, আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্বজুড়ে পারফর্ম করছে। তার সঙ্গে ও অন্য সবার সঙ্গে বোলিং করতে পেরে আমি রোমাঞ্চিত।'
মিরাজ মূলত নবির শূন্যস্থান পূরণ করতেই গায়ানায় এসেছেন। জাতীয় দলের ডাকে ভারতের বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলতে যাওয়ায় সিপিএল থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন নাবি। যাওয়ার আগে সাত ম্যাচে ১৩ উইকেট নিয়ে গায়ানার বোলিং আক্রমণের অন্যতম সেরা অস্ত্র ছিলেন আফগান অলরাউন্ডার। সেই জায়গায় মিরাজের অভিষেক। আর প্রথম ম্যাচেই তিন উইকেট। সঙ্গে তাহিরের পাঁচ উইকেট। দুই স্পিনারের যৌথ আক্রমণে গায়ানা যেন সেন্ট লুসিয়ার ব্যাটারদের জন্য তৈরি করেছিল এক অদৃশ্য ফাঁদ।
এই জয়ের পর ৮ ম্যাচে ৭ জয় ও ১ হার নিয়ে ১৪ পয়েন্টে সিপিএলের পয়েন্ট তালিকার শীর্ষে গায়ানা। প্লে-অফও নিশ্চিত করেছে তাহিরের দল। এখন মিরাজের সামনে আরও একটি বিশেষ ম্যাচ। ১২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সময় ভোর পাঁচটায় প্রভিডেন্সে গায়ানার প্রতিপক্ষ ত্রিনবাগো নাইট রাইডার্স-যে দলটি ২০১৭ সালে মিরাজকে দলে নিয়েও একটি ম্যাচে মাঠে নামার সুযোগ দেয়নি!
