জাতীয় স্টেডিয়ামের দরজা খুলছে
প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রীড়া প্রতিবেদক

শেষবার যখন ঘরোয়া ফুটবলের বল গড়িয়েছিল জাতীয় স্টেডিয়ামে, তখন কেউ হয়তো ভাবেনি এরপর এত দীর্ঘ অপেক্ষা করতে হবে। ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বর আবাহনী ও বসুন্ধরা কিংসের ম্যাচের পর সংস্কারের জন্য বন্ধ হয়ে যায় দেশের ফুটবলের ঐতিহাসিক এই ঠিকানা। তারপর কেটে গেছে প্রায় পাঁচ বছর! এই দীর্ঘ সময়ে বদলে গেছে ফুটবলের অনেক হিসাব। বদলেছে খেলোয়াড়, বদলেছে দল, বদলেছে মাঠের চেহারা। কিন্তু জাতীয় স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে আর শোনা যায়নি ঘরোয়া ফুটবলের সেই চেনা গর্জন।
এবার সেই নীরবতা ভাঙার অপেক্ষা! আন্তর্জাতিক ফুটবল ফিরে এসেছে জাতীয় স্টেডিয়ামে। এবার বাফুফের পরিকল্পনা আরও এক ধাপ এগিয়ে-সাফ চ্যাম্পিয়নশিপের পর দেশের সবচেয়ে ঐতিহ্যবাহী এই ফুটবল ভেন্যুতে ফেরানো হবে ঘরোয়া ফুটবলের বড় ম্যাচ। অদীর্ঘ নির্বাসন শেষে আবারও সেখানে দেখা যেতে পারে লিগ কিংবা ফেডারেশন কাপের উত্তেজনাপূর্ণ লড়াই! বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) ভবনে কমপিটিশন, প্রকিউরমেন্ট ও গ্রাউন্ডস কমিটির যৌথ সভায় ভেন্যুগুলোর বর্তমান অবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। সভা শেষে গ্রাউন্ডস কমিটির চেয়ারম্যান ইকবাল হোসেনই জানালেন সেই প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনার কথা।
ইকবাল হোসেন বলেন, 'সাফের পর ঘরোয়া ফুটবলের গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচগুলো আমরা ঢাকা স্টেডিয়ামে আয়োজনের চিন্তাভাবনা করছি। সেটা হতে পারে ফেডারেশন কাপ ফাইনাল বা লিগের কিছু বড় ম্যাচ।' কথাটা শুধু একটি মাঠে ম্যাচ আয়োজনের পরিকল্পনা নয়। বাংলাদেশের ফুটবলে জাতীয় স্টেডিয়ামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কয়েক দশকের আবেগ, ইতিহাস আর অসংখ্য স্মৃতি। একসময় বড় ম্যাচ মানেই ছিল এই মাঠ। গ্যালারিভর্তি দর্শক, পতাকার ঢেউ, চিৎকার আর প্রতিদ্বন্দ্বিতার উত্তাপ-সব মিলিয়ে ঢাকার ফুটবলের সবচেয়ে বড় মঞ্চ ছিল এই স্টেডিয়াম। সংস্কারের কারণে সেই দৃশ্য হারিয়ে যায়। দীর্ঘ সংস্কারের পর অবশ্য জাতীয় স্টেডিয়াম আন্তর্জাতিক ফুটবলের জন্য আবার খুলেছে। কিন্তু ঘরোয়া ফুটবল সেখানে ফিরতে পারেনি। ২০২৫ সালে সংস্কার শেষে আন্তর্জাতিক ম্যাচের আয়োজন শুরু হলেও শীর্ষ ঘরোয়া ফুটবলকে সেখানে ফেরানোর বিষয়টি এতদিন অনিশ্চিতই ছিল। এবার সেই অনিশ্চয়তার মেঘ কাটতে শুরু করেছে! তবে প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ প্রস্তুত করতে হবে আরও কয়েকটি মাঠকেও। চাঁদপুর স্টেডিয়ামে পিচ সরিয়ে ফুটবলের জন্য ঘাস লাগানোর কাজ চলছে। ১৫ সেপ্টেম্বরের মধ্যে বাফুফের প্রতিনিধিদল মাঠটি আবার পরিদর্শন করবে। গাজীপুর, বসুন্ধরা কিংস অ্যারেনা, কুমিল্লা ও মুন্সিগঞ্জের ভেন্যুগুলোকেও ঘরোয়া ম্যাচ আয়োজনের উপযোগী বলে মনে করছে ফেডারেশন।
অন্যদিকে সময়ও কিন্তু থেমে নেই। ১৮ ও ২২ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী লিগ ও ফেডারেশন কাপের ম্যাচ আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। যদিও দশটি ক্লাব ছয় দফা দাবি জানিয়ে বাফুফেকে চিঠি দিয়েছে। ক্লাবগুলোর দাবিতে লিগ পেছানোর সরাসরি কথা না থাকলেও সূচি নিয়ে তাদের আপত্তির বিষয়টি স্পষ্ট। ঘরোয়া ফুটবল ফেরার গল্পে মাঠের পাশাপাশি আছে আরেকটি অনিশ্চয়তাও। লিগের সূচি ঠিক থাকবে, নাকি ক্লাবগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে পরিবর্তন আসবে-সেটিও এখন দেখার বিষয়। বাফুফে লিগ কমিটির ডেপুটি চেয়ারম্যান জাকির হোসেন অবশ্য আপাতত পুরোনো সূচিতেই অটল। তিনি বলেন, 'ক্লাব এবং ফুটবল ফেডারেশন একে অপরের পরিপূরক। ক্লাবকে বাদ দিয়ে তো আমরা খেলতে পারব না। ক্লাব যদি না খেলতে চায়, আমাদের ইসি কমিটি বসে সিদ্ধান্ত নেব। আপাতত আগের সূচি অনুযায়ীই লিগ শুরু হবে।' এরই মধ্যে জাতীয় স্টেডিয়ামকে ঘিরে সামনে এসেছে আরও বড় একটি উপলক্ষ। ৪ থেকে ১৭ নভেম্বর ঢাকায় হবে সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ। সেই টুর্নামেন্ট সামনে রেখে স্টেডিয়ামকে প্রস্তুত করা হচ্ছে। সাফের আলো, আন্তর্জাতিক ফুটবলের উত্তেজনা-সব শেষ হওয়ার পরই যদি ঘরোয়া ফুটবলের বড় ম্যাচ সেখানে ফেরে, তাহলে প্রত্যাবর্তনটা হবে আরও অর্থবহ! ২০২১ সালের ২০ সেপ্টেম্বরের পর যে মাঠে ঘরোয়া ফুটবলের আর কোনো ম্যাচ হয়নি, সেই মাঠেই আবার কোনো এক সন্ধ্যায় গ্যালারি ভরে উঠেছে। মাঠে দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দল। গ্যালারিতে পতাকার ঢেউ। গর্জন করছে দর্শক। আর পাঁচ বছরের নীরবতার পর জাতীয় স্টেডিয়ামের সবুজে আবার গড়াচ্ছে ঘরোয়া ফুটবলের বল। সেই দৃশ্য এখনও ভবিষ্যৎ। কিন্তু বাফুফের পরিকল্পনা বলছে, অপেক্ষার শেষটা হয়তো আর খুব বেশি দূরে নয়! জাতীয় স্টেডিয়াম এতদিন অপেক্ষা করেছে। আন্তর্জাতিক ফুটবল দিয়ে তার প্রত্যাবর্তন হয়েছে। এবার ফুটবল ফিরে আসার পালা। আর সেই প্রত্যাবর্তন যদি ফেডারেশন কাপের ফাইনাল কিংবা বড় কোনো লিগ ম্যাচ দিয়ে হয়, তাহলে ৫ বছরের নীরবতার পর জাতীয় স্টেডিয়াম শুধু খুলবে না, জেগেও উঠবে!
