বিপিএল ফিক্সিং কাণ্ডে নিষিদ্ধ ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্ণধার-ম্যানেজার
প্রকাশ : ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রীড়া প্রতিবেদক

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) মাঠে ব্যাট-বলের লড়াই শেষ হলেও মাঠের বাইরের তদন্ত যেন শেষ হচ্ছে না। একের পর এক নতুন তথ্য সামনে আসছে, আর সেই ধারাবাহিকতায় এবার বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) দুর্নীতি দমন ইউনিটের তদন্তে অভিযুক্ত হয়েছেন আরও দুজন। অভিযোগের তালিকায় শুধু ম্যাচের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টাই নেই, আছে দুর্নীতির প্রস্তাবের কথা সময়মতো না জানানো, তদন্তে সহযোগিতা না করা, এমনকি তদন্তের প্রয়োজনে মোবাইল ডিভাইস জমা না দেওয়ার মতো গুরুতর বিষয়ও!
গতকাল বৃহস্পতিবার বিপিএলের ১১তম ও ১২তম আসর ঘিরে দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আনার কথা জানিয়েছে বিসিবির অ্যান্টি করাপশন ইউনিট (এসিইউ)। অভিযুক্ত দুজন হলেন মো. আবদুল কাইয়ুম রাশেদ এবং মো. আমিন খান। বিসিবি জানিয়েছে, অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এইতো চলতি মাসের শুরুতে শাস্তি পেয়েছিলেন আমিনুল ইসলাম বুলবুলের বোর্ডের সাবেক পরিচালক মোখলেছুর রহমানসহ তিনজন। রাশেদ ১২তম আসরে চট্টগ্রাম রয়্যালসের সাবেক মালিক হিসেবে দায়িত্বে ছিলেন। অন্যদিকে আমিন খান ছিলেন বিপিএলের ১১তম আসরে দুর্বার রাজশাহীর সাবেক টিম অপারেশনস ম্যানেজার। পরের আসরে তিনি চট্টগ্রাম রয়্যালসের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠেছে বিপিএলের দুটি আলাদা আসরের সঙ্গে সম্পৃক্ততার সময়ে। বিসিবি জানিয়েছে, তাদের তদন্তে অভিযোগগুলোর পক্ষে নির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেছে। তবে তদন্তে অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া এবং কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। এখনো এটি শাস্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়; বরং আইসিসির অ্যান্টি করাপশন কোড অনুযায়ী চলমান একটি শৃঙ্খলাজনিত প্রক্রিয়ার অংশ।
রাশেদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের তালিকাটি বেশ দীর্ঘ। আইসিসির অ্যান্টি করাপশন কোডের ২.১.১ ধারায় ম্যাচের ফল প্রভাবিত করা বা ম্যাচ ফিক্সিংয়ে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। একই সঙ্গে ২.৪.৪ ধারায় কোনো দুর্নীতির প্রস্তাব বা যোগাযোগ পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে না জানানোর অভিযোগও রয়েছে। এর বাইরেও তদন্তের সময় সহযোগিতা না করার অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। আইসিসি কোডের ২.৪.৫ ও ২.৪.৬ ধারায় তদন্তে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা না করা এবং ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য নিজের প্রাথমিক মোবাইল ডিভাইস জমা দিতে অস্বীকৃতি জানানোর বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ এসেছে ২.৪.৭ ধারায়। সেখানে তদন্তের প্রয়োজনে মোবাইল ডিভাইস গোপন করা বা সরবরাহ না করা এবং তদন্তে বাধা দেওয়া বা তদন্ত বিলম্বিত করার অভিযোগ রয়েছে। রাশেদের বিরুদ্ধে অভিযোগের পরিধি শুধু মাঠের কোনো সম্ভাব্য অনিয়মে সীমাবদ্ধ নেই; তদন্ত প্রক্রিয়ায় তার আচরণ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে বিসিবির দুর্নীতি দমন ইউনিট। আমিন খানের বিরুদ্ধেও উঠেছে ম্যাচ ফিক্সিং-সংক্রান্ত অভিযোগ। তার বিরুদ্ধে আইসিসি অ্যান্টি করাপশন কোডের ২.১.১ ধারায় ম্যাচের ফল প্রভাবিত করা বা এ ধরনের কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে তার বিরুদ্ধে আরও একটি নির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে-অন্য অংশগ্রহণকারীদের দুর্নীতিতে প্ররোচিত করা বা সহযোগিতা করা। আইসিসি কোডের ২.১.৪ ধারায় সেই অভিযোগ আনা হয়েছে।
তদন্তে সহযোগিতা না করার অভিযোগও রয়েছে আমিনের বিরুদ্ধে। এ ক্ষেত্রে ২.৪.৬ ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। পাশাপাশি ২.৪.৭ ধারায় তদন্তের সঙ্গে সম্পর্কিত যোগাযোগ বা তথ্য গোপন, নষ্ট করা কিংবা তদন্তে বাধা দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভিযোগ ওঠার পর দুজনকেই আপাতত সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইসিসির অ্যান্টি করাপশন কোড অনুসারে তাদের বিরুদ্ধে এই প্রভিশনাল সাসপেনশন দেওয়া হয়েছে। তবে এখানেই শেষ নয়। বিসিবির দেওয়া নোটিশের জবাব দেওয়ার জন্য দুজনের হাতে রয়েছে ১৪ দিন সময়! এই ১৪ দিনের সময়টিই এখন গুরুত্বপূর্ণ। কারণ অভিযুক্তরা তাদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের জবাব দেওয়ার সুযোগ পাবেন। এরপরই তদন্ত ও শৃঙ্খলাজনিত প্রক্রিয়া সামনে এগোবে। তাই বৃহস্পতিবারের ঘোষণাকে চূড়ান্ত শাস্তি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
বিপিএলকে ঘিরে দুর্নীতির অভিযোগ অবশ্য নতুন নয়। এর আগেও টুর্নামেন্টের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তদন্ত হয়েছে এবং একাধিক ব্যক্তির নাম প্রকাশ্যে এসেছে।
এবার সেই তদন্তের ধারাবাহিকতায় নতুন করে সামনে এলেন একজন সাবেক ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিক এবং একজন টিম অপারেশনস ম্যানেজার। একজনের বিরুদ্ধে ম্যাচের ফল প্রভাবিত করার পাশাপাশি দুর্নীতির প্রস্তাব না জানানোর অভিযোগ, অন্যজনের বিরুদ্ধে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও অন্যদের প্ররোচিত করার অভিযোগ-সব মিলিয়ে তদন্তের পরিধি যে বেশ গভীরে পৌঁছেছে, সেটিই স্পষ্ট! তবে বিসিবি আপাতত এ বিষয়ে আর বিস্তারিত মন্তব্য করতে চাইছে না। বোর্ড জানিয়েছে, বিষয়টি এখনো শৃঙ্খলাজনিত প্রক্রিয়ার মধ্যে রয়েছে। ফলে তদন্তের এই পর্যায়ে অতিরিক্ত মন্তব্য না করাই তাদের অবস্থান!
