এশিয়ান গেমসে কী পেল বাংলাদেশ

প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া প্রতিবেদক

জাপান এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ গিয়েছিল বেশ বড় আয়োজন করেই! ২২ ডিসিপ্লিনে ১৮৭ ক্রীড়াবিদ। সঙ্গে কোচ, কর্মকর্তা-সব মিলিয়ে ছোটখাটো বহর নয়। প্রত্যাশার তালিকাও কম ছিল না। ক্রিকেট, কাবাডি, আর্চারি, শুটিং-চারটি ডিসিপ্লিনকে সামনে রেখে পদকের স্বপ্ন দেখানো হয়েছিল! তারপর পর্দা নামল! বাংলাদেশের হাতে একটি ব্রোঞ্জ! একজন জিন্নাত আক্তার যেন পুরো বহরের হয়ে পদকটি তুলে আনলেন। বাকিরা ফিরলেন অভিজ্ঞতা, অংশগ্রহণ আর স্মৃতি নিয়ে। এখন প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিক— এত বড় বহর নিয়ে বাংলাদেশ এশিয়ান গেমসে আসলে গেল কেন?

অবশ্যই শুধু পদক দিয়ে একজন ক্রীড়াবিদের মূল্যায়ন করা যায় না। এশিয়ার অন্যতম বড় ক্রীড়া আসরে অংশ নেওয়া নিজেই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সমস্যা হলো, বাংলাদেশ যখন একটি বড় দল পাঠায়, তখন তার সঙ্গে বড় অঙ্কের অর্থও যায়। আর সেই অর্থের সঙ্গে যুক্ত থাকে রাষ্ট্রের প্রত্যাশা, ক্রীড়া প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি এবং সাধারণ মানুষের করের টাকা। সেই জায়গা থেকেই প্রশ্ন উঠছে। বাংলাদেশের ক্রীড়া প্রশাসনের কাছে কি এশিয়ান গেমস এখনও মূলত অংশগ্রহণের জায়গা?

 

নাকি সত্যিই পদক জয়ের পরিকল্পনা থাকে?

এবারের আসরে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ভরসা ছিল ক্রিকেট। হাংঝুতে পুরুষ ও নারী-দুই দলই ব্রোঞ্জ জিতেছিল। ফলে এবার প্রত্যাশা আরও বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু দুই দলই ফিরেছে পদকহীন হয়ে। পুরুষ দল সেমিফাইনালে পাকিস্তানের কাছে হারের পর ব্রোঞ্জের ম্যাচে শ্রীলঙ্কার কাছে ৬৩ রানে হেরে গেছে। এখানেই শেষ নয়! যে ম্যাচে ব্রোঞ্জ জেতার কথা, সেই ম্যাচে বাংলাদেশের শীর্ষ তিন ব্যাটারই শূন্য রানে ফিরে গেলেন। শ্রীলঙ্কার ১৬৫ রানের জবাবে বাংলাদেশ থামল ১০২ রানে। ক্রিকেটের মতো তুলনামূলকভাবে প্রতিষ্ঠিত একটি খেলায় যদি এশিয়ান গেমসের ব্রোঞ্জও ধরে রাখা না যায়, তাহলে প্রস্তুতির মান নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। কাবাডির গল্পটা আরও হতাশার!

দক্ষিণ কোরিয়া ও চায়নিজ তাইপেকে হারিয়ে বাংলাদেশ যখন এগোচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল বহুদিন পর কাবাডিতে পদকের দেখা মিলবে। কিন্তু জাপানের কাছে হেরেই সব শেষ। অদ্ভুত ব্যাপার, চায়নিজ তাইপেকে হারানোর পর এমন উদ্?যাপন হয়েছিল যেন পদক নিশ্চিত হয়ে গেছে। পরে কোচ আব্দুল জলিল নিজেই বলেছেন, এমন উদ্?যাপন করা উচিত হয়নি। এই ছোট ঘটনাটির মধ্যেই যেন বড় সমস্যাটির ছবি আছে— বাংলাদেশ অনেক সময় সাফল্যের পথটাকে শেষ গন্তব্য ভেবে বসে। এশিয়ান গেমসে একটি ম্যাচ জেতা সাফল্য নয়। পদক জিততে হলে শেষ ম্যাচ পর্যন্ত জিততে হয়। আর্চারিতেও ছিল একই গল্প।

কয়েক মাস আগে এশিয়া কাপে সাফল্য এসেছে। তাই এবারও আশার জায়গা ছিল। কিন্তু এশিয়ান গেমসে ব্যক্তিগত কিংবা দলগত কোনো ইভেন্টেই সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আর্চারি কোচ মার্টিন ফ্রেডরিখের কথাটি এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে মাত্র কয়েকশ আর্চার নিয়ে কাজ করা হচ্ছে, যেখানে ভারতের সংখ্যা হাজার হাজার। সমস্যা শুধু একজন তীরন্দাজের ফর্মে নয়; সমস্যাটি প্রতিযোগিতার গভীরতায়! একই কথা শুটিংয়েও প্রযোজ্য। পদকের সম্ভাবনা বলা হয়েছিল, কিন্তু কোনো শুটারই ফাইনালের ধারেকাছেও যেতে পারেননি। তাহলে পদকের সম্ভাবনার তালিকাটা তৈরি হয়েছিল কীসের ভিত্তিতে?

জিন্নাত এলেন, বাকিরা কোথায়? সব ব্যর্থতার মাঝেও জিন্নাত আক্তারের ব্রোঞ্জ অবশ্যই আলাদা করে বলতে হবে। উশুর নারী ৫২ কেজি বিভাগে সেমিফাইনালে উঠেই পদক নিশ্চিত করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত চীনের প্রতিপক্ষের কাছে হেরে ব্রোঞ্জ পান। হয়তো তার সেমিফাইনালে ওঠার পথটি ছিল কিছুটা অস্বাভাবিক। প্রথম রাউন্ডে বাই, কোয়ার্টার ফাইনালে ওয়াকওভার-দুটি ম্যাচ না খেলেই শেষ চারে পৌঁছেছিলেন তিনি। কিন্তু পদক তো আর 'ওয়াকওভার' দিয়ে লেখা হয় না। চার দশক পর ব্যক্তিগত ইভেন্টে বাংলাদেশের এশিয়ান গেমস পদক এসেছে তার হাত ধরে। এই অর্জনকে ছোট করার সুযোগ নেই।

বরং উল্টোটা করা উচিত। জিন্নাতের সাফল্য দেখিয়ে দিয়েছে-বাংলাদেশের পদক পাওয়ার সম্ভাবনা শুধু ক্রিকেট বা কাবাডিতে আটকে নেই। কিন্তু জিন্নাত পদক জেতার পরও যদি তার দাবি হয় নিজস্ব অনুশীলন ভেন্যু দরকার, বিদেশি কোচ দরকার, আরও ভালো প্রস্তুতি দরকার-তাহলে প্রশ্নটা আবার প্রশাসনের কাছেই ফিরে যায়। একজন ক্রীড়াবিদ পদক জিতে এসে যদি তার খেলাটির মৌলিক সুযোগ-সুবিধার কথা বলতে বাধ্য হন, তাহলে এতদিন আমরা কী করছিলাম?

২০ কোটির হিসাব কোথায়? এই সফরে প্রায় ২০ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে এসেছে। সরকারি বিস্তারিত ব্যয়ের হিসাব প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এই অঙ্ককে চূড়ান্ত ধরে নেওয়া ঠিক হবে না। কিন্তু অঙ্কটি সত্য হোক বা কিছুটা কম-বেশি হোক, প্রশ্নটি থেকেই যায়-এই অর্থের বিনিময়ে বাংলাদেশ কী পেল? একটি ব্রোঞ্জ। অবশ্য এই হিসাবও সরল অঙ্ক নয়। খেলোয়াড়দের প্রশিক্ষণ, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা, নতুনদের সুযোগ, অবকাঠামোগত প্রস্তুতি-এসবের মূল্যও আছে। একজন তরুণ ক্রীড়াবিদ বড় মঞ্চে খেলেছেন, সেটিও ভবিষ্যতের সম্পদ।

এশিয়ান গেমস শেষ হওয়ার পর কি প্রতিটি ডিসিপ্লিনের পারফরম্যান্স নিয়ে বসা হবে? কেন শুটাররা ফাইনালে উঠতে পারলেন না? কেন আর্চারির সাম্প্রতিক সাফল্য এশিয়ান গেমসে কাজে লাগল না? কেন কাবাডি শেষ মুহূর্তে ভেঙে পড়ল? কেন ক্রিকেটের দুই দলই আগের আসরের পদক ধরে রাখতে পারল না?

এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না থাকলে ২০ কোটি টাকা হোক বা ১০ কোটি-খরচের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।

বাংলাদেশের বড় ক্রীড়া আসরগুলোর আরেকটি চেনা দৃশ্য আছে। খেলা শুরু হলে ফলাফল নিয়ে আলোচনা হয়। ফল খারাপ হলে কয়েক দিন সমালোচনা হয়। তারপর সবাই ভুলে যায়। কিছুদিন পর নতুন আসর আসে। আবার দল ঘোষণা হয়। আবার ক্যাম্প হয়। আবার বলা হয়-'আমাদের পদকের সম্ভাবনা আছে।' তারপর আবার একই গল্প। ক্রীড়া প্রশাসনে যেন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার চেয়ে বড় টুর্নামেন্টের তারিখটাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এশিয়ান গেমস চার বছর পরপর আসে। অলিম্পিকও চার বছর পরপর। অথচ বাংলাদেশের প্রস্তুতি অনেক সময় এমন, যেন পরীক্ষা আগামীকাল-বই কেনা হচ্ছে আজ।

এই সংস্কৃতি বদলানো ছাড়া শুধু বড় বহর পাঠিয়ে কোনো লাভ নেই। ভারতের ৮৫, বাংলাদেশের ১। আঞ্চলিক ব্যবধানটিও এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। ২০২৬ এশিয়ান গেমসে ভারত জিতেছে ৮৫টি পদক। পাকিস্তানের ঘরে গেছে ১০টি। শ্রীলঙ্কা ও নেপালও একাধিক পদক পেয়েছে। অবশ্য ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি তুলনা করা ঠিক নয়। ভারতের অর্থনীতি, জনসংখ্যা, ক্রীড়া অবকাঠামো ও প্রতিযোগিতার পরিধি অনেক বড়। কিন্তু বাংলাদেশকে অন্তত নিজের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন করতে হবে। কেন এত বছর পরও আমাদের পদক কয়েকটি খেলার মধ্যে আটকে আছে? কেন নতুন ডিসিপ্লিনে ধারাবাহিক সাফল্য তৈরি হচ্ছে না?

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-বাংলাদেশ কি খেলোয়াড় তৈরি করছে, নাকি শুধু বড় আসরের জন্য দল তৈরি করছে? এশিয়ান গেমস বাংলাদেশের কাছে শুধু পদকের মঞ্চ নয়। এটি বাংলাদেশের ক্রীড়া ব্যবস্থার আয়না। আইচি-নাগোয়ায় সেই আয়নায় যা দেখা গেল, তা খুব স্বস্তিদায়ক নয়। বহর ছিল বড়। প্রত্যাশা ছিল বড়। আয়োজনও ছিল বড়। শুধু ফলাফলটাই বড় হয়নি। একটি ব্রোঞ্জ পদক নিয়ে ফিরেছেন জিন্নাত আক্তার। আর তার সঙ্গে ফিরেছে আরও বড় একটি প্রশ্ন— বাংলাদেশ কি সত্যিই এশিয়ান গেমসে পদক জিততে যায়, নাকি শুধু সেখানে উপস্থিত থাকতে যায়?