ইংলিশ ক্রিকেটে শৈশবের স্বপ্ন পূরণ খালেদের

প্রকাশ : ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ

  ক্রীড়া প্রতিবেদক

একসময় ইংলিশ ক্রিকেট ছিল দূরের এক স্বপ্ন। টেলিভিশনের পর্দায় দেখা সেই ক্রিকেট, সেই মাঠ, সেই পরিবেশ-সবকিছুই ছিল বাংলাদেশের এক তরুণ পেসারের কল্পনার জগৎ। সময়ের সঙ্গে সেই স্বপ্নই বাস্তব হয়েছে। প্রথমবার বিদেশের কোনো লিগে খেলার সুযোগ পেয়েছেন খালেদ আহমেদ। আর সেই সুযোগ যখন এসেছে ইংল্যান্ডের ঐতিহ্যবাহী কাউন্টি ক্রিকেটে, তখন সেটি হাতছাড়া করার প্রশ্নই ওঠেনি। কেন্টের হয়ে মাঠে নেমেই অবশ্য খালেদ শুধু অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেননি, নিজের সামর্থ্যেরও জানান দিয়েছেন। অল্প কয়েকটি ম্যাচের সুযোগ পেয়েও তার পারফরম্যান্স নজর কেড়েছে। সবচেয়ে বড় ব্যাপার, সেকেন্ড ডিভিশন থেকে ডিভিশন ওয়ানে কেন্টের ওঠার অভিযানে বাংলাদেশের এই পেসারের অবদানও ছিল উল্লেখযোগ্য।

তবে মাঠের সাফল্যের আড়ালে খালেদের জন্য এই যাত্রার আরেকটি গল্প আছে-শৈশবের স্বপ্ন পূরণের গল্প! নিজের সেই সময়ের কথা মনে করে খালেদ বলেন, 'আমি ছোটবেলায় যখন ক্রিকেট খেলা শুরু করি, যখন বুঝতে শুরু করি ক্রিকেট, তখন একটা স্বপ্ন ছিল যে, কোনোদিন কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি ৪-ডে বা ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি লিগ খেলার স্বপ্ন ছিল। আমার কাছে ইংলিশ ক্রিকেটটা খুবই ওপরে ছিল। চেষ্টা করছি, সুযোগ পেয়েছি যখন তখন মনে মনে অনেক খুশি ছিলাম।'

ইংল্যান্ডে যাওয়ার পর অবশ্য স্বপ্নের সঙ্গে বাস্তবতারও দেখা হয়েছে। বাংলাদেশের তুলনায় সম্পূর্ণ ভিন্ন আবহাওয়া, ভিন্ন কন্ডিশন, ভিন্ন ক্রিকেট সংস্কৃতি-সবকিছুর সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার চ্যালেঞ্জ ছিল। দীর্ঘদিন ম্যাচের বাইরে থাকা খালেদের জন্য সেই চ্যালেঞ্জ আরও বড় ছিল। কিন্তু সুযোগটা এসেছিল এমন সময়ে, যখন মাঠে ফেরাটাই ছিল সবচেয়ে জরুরি। তাই দ্বিতীয়বার ভাবেননি তিনি! কাউন্টিতে খেলার অভিজ্ঞতা নিয়ে খালেদ বলেন, 'এক্সপেরিয়েন্স ওয়াজ আলহামদুলিল্লাহ, খুবই ভালো ছিল। যে আমি অনেকদিন ধরে ম্যাচের বাইরে ছিলাম। তখন একটা অপরচুনিটি আসছিল। আমি রাজি হই, তাড়াতাড়ি করে যাই। ওইখানে যাওয়ার পর আলহামদুলিল্লাহ, প্রথম দিকে ওদের ঠান্ডার সাথে একটু কষ্ট হয়েছে এডজাস্ট হতে। বাট যখন আমি খেলা শুরু করছিলাম, তখন আলহামদুলিল্লাহ ভালো স্টার্ট হয়েছে।' এই 'ভালো স্টার্ট'ই পরে খালেদের কাউন্টি অধ্যায়ের সবচেয়ে বড় গল্প হয়ে ওঠে! শুরুতেই অবশ্য তাকে মাঠে নামানো হয়নি। নতুন পরিবেশে নিজেকে মানিয়ে নেওয়ার জন্য সময় পেয়েছিলেন তিনি। বরং দলের অধিনায়ক ও কোচের কাছ থেকেই এসেছিল অপেক্ষা করার বার্তা। সেই অপেক্ষার পর মাঠে নেমে সুযোগটা কাজে লাগিয়েছেন খালেদ।

তিনি যোগ করেন, 'আমি যাওয়ার পরে আমি কিন্তু একটা ম্যাচ খেলি নাই। তখন আমাকে ক্যাপ্টেন প্লাস কোচরা বলছে যে, তুমি আসছো, আসার পরে এখানে এডজাস্ট হওয়ার একটা ব্যাপার আছে। তো তুমি চেষ্টা করো এখানে এডজাস্ট হওয়ার। নেক্সট ম্যাচ থেকে তুমি কন্টিনিউ খেলবা। শুধু খেলা না, খেলার বাইরেও ড্রেসিংরুমে ওদের সাথে অনেক মজা করছি। ওরা অনেক ফ্রেন্ডলি ছিল।' কাউন্টি ক্রিকেটে শুধু বল হাতে পারফর্ম করাই নয়, নতুন ড্রেসিংরুমে নিজেকে মানিয়ে নেওয়াটাও ছিল খালেদের জন্য বড় পরীক্ষা। সেই জায়গাতেও স্বস্তি পেয়েছেন তিনি। সতীর্থদের বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ নতুন পরিবেশের অচেনাভাব অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছে। আর মাঠের কন্ডিশন? সেখানেও ছিল বাংলাদেশের সঙ্গে বিস্তর পার্থক্য!

বাংলাদেশের গরম আবহাওয়া থেকে ইংল্যান্ডের ঠান্ডা পরিবেশে গিয়ে প্রথম দিকে অস্বস্তি হওয়াটা স্বাভাবিক। তার ওপর ইংল্যান্ডের কন্ডিশনে পেসারদের জন্য থাকে ভিন্ন ধরনের চ্যালেঞ্জ ও সুযোগ। বলের আচরণ, আবহাওয়া কিংবা ম্যাচের পরিবেশ-সবকিছুতেই নতুনত্ব ছিল খালেদের সামনে। তবে পেশাদার ক্রিকেটারের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তো এখানেই-অপরিচিত পরিবেশকে কত দ্রুত নিজের করে নেওয়া যায়। খালেদ সেটিই করেছেন। এবারের কাউন্টি চ্যাম্পিয়নশিপে কেন্টের হয়ে খালেদ ৩ ম্যাচে ১৬ উইকেট নিয়েছেন। এর মধ্যে ল্যাঙ্কাশায়ারের বিপক্ষে এক ম্যাচে প্রথম ইনিংসে ৫/৪২ এবং দ্বিতীয় ইনিংসে ৩/৫২-ম্যাচে মোট ৮ উইকেট। শেষ ম্যাচে গ্লস্টারশায়ারের বিপক্ষে দুই ইনিংস মিলিয়ে নেন আরও ৫ উইকেট।

কেন্টের হয়ে মাঠে নেমে পারফরম্যান্স দিয়ে নিজের জায়গা তৈরি করেছেন ৩৪ বছর বয়সী খালেদ। দলের প্রমোশন এসেছে, আর সেই সাফল্যের অংশ হয়ে নিজের কাউন্টি অভিজ্ঞতাকেও স্মরণীয় করে তুলেছেন বাংলাদেশের এই পেসার। খালেদের জন্য তাই ইংল্যান্ড সফরটা কেবল বিদেশের একটি লিগে খেলার সুযোগ নয়। এটি তার ক্রিকেটজীবনের একটি দরজা খুলে দিয়েছে-যে দরজার ওপাশে একসময় দাঁড়িয়ে ছিল শৈশবের স্বপ্ন!