অর্জনে অমলিন এক অধ্যায়
ফুটবল জাদুকরের 'মহাকাব্যিক যাত্রার' সমাপ্তি
প্রকাশ : ০৮ অক্টোবর ২০২৬, ০০:০০ | প্রিন্ট সংস্করণ
ক্রীড়া ডেস্ক

'আমি যেতে চাই না। এই মাঠ ছেড়ে যেতে চাই না।' বুয়েনস আইরেসের মনুমেন্টালে লিওনেল মেসির এই কথাগুলোতে ছিল বিদায়ের যন্ত্রণা, যার জন্য প্রস্তুত হওয়া কঠিন। ২১ বছর আর্জেন্টিনার স্বপ্ন বহন করা অধিনায়ক শেষবারও দলকে জেতালেন। তারপর জানালেন, এবার তার জায়গা সমর্থকদের পাশে। আকাশী-সাদায় শেষ হলো তার ক্যারিয়ার; শুরু হলো সেই অর্জন ধরে রাখার নতুন পরীক্ষা। বাংলাদেশ সময় গতকাল বুধবার ভোরে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারায় লিওনেল স্কালোনির দল। ৩৯ বছরের মেসি করেন এক গোল, অন্য দুই গোলে দেন অ্যাসিস্ট। নিকোলাস ওতামেন্দি ও নিকো পাজের গোলের পর ৭১ মিনিটে পেনাল্টি থেকে নিজেও জাল খুঁজে নেন। রয়টার্স ও এএফপির ম্যাচ-পরবর্তী হিসাবে, ২০৮ ম্যাচে ১২৬ গোল নিয়ে থামলেন দেশের সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলা ফুটবলার।
৮৫ হাজারের বেশি দর্শকের সামনে তিন ছেলেকে নিয়ে মাঠে আসেন মেসি। দশম মিনিটে খেলা থামিয়ে জানানো হয় সম্মান। জাতীয়সংগীতে চোখ ভিজে যায় তার। উদ্যাপনের মধ্যে অবশ্য ছিল ব্যক্তিগত শোক। আগস্টে মারা যাওয়া বাবা হোর্হে মেসিকে স্মরণ করে বলেন, 'সবার আগে আমার বাবার কথাই মনে পড়ছে।' শেষ বাঁশির পর ড্রোনের আলোয় ফুটে ওঠে শ্রদ্ধা, গান গেয়ে তাকে বিদায় জানান সোলেদাদ পাস্তোরুত্তি। তার জন্মশহর রোসারিওর জাতীয় পতাকা স্মৃতিসৌধেও উন্মোচিত হয় বিশাল ১০ নম্বর জার্সি। তাতে লেখা ছিল 'গ্রাসিয়াস', ধন্যবাদ। মাঠের আয়োজনের বাইরেও এই শ্রদ্ধা জাতীয় দলের সঙ্গে তার দীর্ঘ সম্পর্কের সাক্ষ্য বহন করে।
সিনিয়র দলে শুরুটা হয়েছিল এর সম্পূর্ণ বিপরীত দৃশ্য দিয়ে। ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট হাঙ্গেরির বিপক্ষে অভিষেকের কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই লাল কার্ড। তবে প্রতিভার পরিচয় মিলেছিল আগেই। সে বছর অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি সেরা খেলোয়াড় ও সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন। ২০০৮ সালে আসে বেইজিং অলিম্পিকের সোনা। যুব ও অলিম্পিক পর্যায়ের সাফল্য বড়দের দলে দ্রুত শিরোপার নিশ্চয়তা দেয়নি; সেখানে অপেক্ষা দীর্ঘ হয়। ২০০৭, ২০১৫ ও ২০১৬ সালের কোপা আমেরিকার ফাইনালে হার, ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে জার্মানির কাছে পরাজয়— জাতীয় দলের গল্পে হতাশা জমেছিল। ২০১৬ সালে অবসরও ঘোষণা করেন, কয়েক সপ্তাহ পর সিদ্ধান্ত বদলে ফেরেন। অধ্যায়টি জরুরি, কারণ মেসির উত্তরাধিকার শুধু জয়ের ধারাবাহিকতা দিয়ে বোঝা যায় না। বারবার ব্যর্থতার পর ফিরে আসা এবং শেষ পর্যন্ত দলকে সাফল্যে নেতৃত্ব দেওয়াও সেই ইতিহাসের অংশ।
মোড় ঘোরে ২০২১ সালে। মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে কোপা আমেরিকা জয় আর্জেন্টিনার ২৮ বছরের শিরোপা-অপেক্ষার অবসান ঘটায়। এরপর ২০২২ সালের ফিনালিসিমা এবং কাতার বিশ্বকাপ। ২০২৪ সালে আবার কোপা আমেরিকা। সিনিয়র দলে চার শিরোপা; যুব বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক সোনা ধরলে আর্জেন্টিনার হয়ে ছয় সাফল্য। কিন্তু এসব জয়কে একজনের একক কীর্তি বললে দলের অবদান আড়াল হয়। মেসি নিজেই বলেছেন, সতীর্থরাই তার শৈশবের স্বপ্ন পূরণ করতে সাহায্য করেছেন। ২০২৪ সালের কোপা ফাইনাল সেই পরিবর্তনের উদাহরণ। চোট নিয়ে মেসি মাঠ ছাড়লেও সতীর্থরা কলম্বিয়াকে হারিয়ে শিরোপা নিশ্চিত করেন। দলের শক্তি তখন অধিনায়কের উপস্থিতির বাইরেও কাজ করেছে। মেসির অসাধারণ প্রতিভার সঙ্গে একটি কার্যকর দলের সম্পর্ক তৈরি হওয়ার পরই সাফল্য নিয়মিত হয়েছে। তার বিদায়ের পর আর্জেন্টিনার জন্য সবচেয়ে মূল্যবান উত্তরাধিকার হতে পারে, এই সম্মিলিত দায়িত্ববোধ, শুধু ১০ নম্বর জার্সির আবেগ নয়।
দীর্ঘায়ু ও প্রভাবের পরিমাপেও মেসি ব্যতিক্রম। ছয় বিশ্বকাপে ৩৪ ম্যাচ খেলার রেকর্ড তার; তিনবার ফাইনালে উঠেছেন, জিতেছেন একবার। বিশ্বকাপে ২১ গোল নিয়ে তালিকায় দ্বিতীয়, ২২ গোলের কিলিয়ান এমবাপ্পের পেছনে। ২০১৪ ও ২০২২ সালে পেয়েছেন বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল। কোপা আমেরিকায় রেকর্ড ৩৯ ম্যাচে ১৪ গোল। ব্যক্তিগত স্বীকৃতিতে আট ব্যালন ডি'অর ও ছয় ইউরোপীয় গোল্ডেন শু তার বিশ্বব্যাপী মর্যাদার আরেক পরিমাপ। বিদায়ের সিদ্ধান্তও শুধু একটি আবেগঘন রাতের ঘটনা নয়। ৩১ আগস্ট অবসর ঘোষণার চিঠিতে মেসি জানান, কথাগুলো লিখেছিলেন ২১ জুলাই, বিশ্বকাপ ফাইনালের দুই দিন পর। অর্থাৎ বাবার মৃত্যুর আগেই সিদ্ধান্তটি লিখিত হয়েছিল; ব্যক্তিগত শোক পরে সেটিকে আরও দৃঢ় করেছে। শেষ বক্তব্যে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচের শারীরিক ও মানসিক ধকলের কথাও বলেন। ২০২৬ সালে স্পেনের কাছে ফাইনাল হারলেও আট গোল করা মেসির বিদায়কে শুধু পারফরম্যান্সের পতন দিয়ে ব্যাখ্যা করা তাই যথেষ্ট নয়। ফুটবলের বাইরেও তার প্রভাবের স্বীকৃতি এসেছে। বিদায়ী ম্যাচের কয়েক ঘণ্টা আগে বুয়েনস আইরেস বিশ্ববিদ্যালয় তাকে সম্মানসূচক ডক্টরেট দেয়। এজেইজায় এএফএর স্থাপনায় অনুষ্ঠিত আয়োজনে বিশ্ববিদ্যালয় তার উৎকর্ষ, অধ্যবসায় ও জাতীয় প্রতিনিধিত্বের অবদান তুলে ধরে। আর্জেন্টিনায় মেসির পরিচয় স্কোরকার্ডের চেয়ে বড়। তিনি দেশের সংস্কৃতি ও পরিচয়ের অংশ। তবে আন্তর্জাতিক অবসরই তার এই বিদায়ের পরিধি; ইন্টার মায়ামির সঙ্গে চুক্তি রয়েছে ২০২৮ পর্যন্ত।
স্কালোনির সামনে এখন গোল, সুযোগ তৈরি ও নেতৃত্বের দায়িত্ব নতুনভাবে বণ্টনের পরীক্ষা। বিদায়ী ম্যাচে নিকো পাজের গোল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা দেখিয়েছে, কিন্তু একটি প্রীতি ম্যাচ কাউকে মেসির উত্তরসূরি প্রমাণ করে না। উত্তর খুঁজতে হবে নিয়মিত প্রতিযোগিতায়, কঠিন প্রতিপক্ষের সামনে। মেসিও সমর্থকদের সতর্ক করেছেন, সামনে কঠিন সময় আসবে এবং তখন দলের পাশে আরও বেশি থাকতে হবে। এ বক্তব্য বিদায়ের আবেগের পাশাপাশি পরবর্তী অধ্যায়ের বাস্তব নির্দেশনা। অবসরের চিঠিতেও তিনি তরুণদের সুযোগ পাওয়ার প্রয়োজনের কথা বলেছেন। ফলে নতুন দল গঠনের তাগিদটি বিদায়ী অধিনায়কের নিজের উপলব্ধিতেও রয়েছে; তিনি ভবিষ্যতের জন্য জায়গা ছেড়ে দেওয়াকে সিদ্ধান্তের অংশ করেছেন।
যে মনুমেন্টালে বিশ্বকাপজয়ের পর ফেরার দিনটিকে তিনি ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আনন্দের স্মৃতিগুলোর একটি বলেছেন, সেখানেই বিদায়কে বলেছেন সবচেয়ে কষ্টের দিন। এখন থেকে দলকে সমর্থন দেবেন মাঠের বাইরে দাঁড়িয়ে। রেখে যাচ্ছেন জয়ের স্মৃতি, ব্যর্থতা পেরোনোর অভিজ্ঞতা এবং ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা। আকাশি-সাদায় তার শেষ গোলটি ইতিহাসের অংশ হয়ে গেল। সেই ইতিহাস থেকে পরবর্তী আর্জেন্টিনা কতটা শক্তি নিতে পারে, সেটিই হবে মেসির বিদায়ের পর গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা।
